খালেদা জিয়া জামিন-চিকিত্সা বিতর্ক
উত্তরদক্ষিণ মূদ্রিত সংস্করন ২৯ অক্টোবর ২০১৯ প্রকাশ ০০:০১ আপডেট ১০:৩৫
পরিবার, দল ও চিকিত্সকদের ভিন্ন ভিন্ন কথা, চিকিত্সা প্রয়োজনে সাক্ষাত্ করতে চাইলে খালেদা জিয়া ডাক্তারদের ঘন্টারপর অপেক্ষায় রাখেন
মিলন গাজী : সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার অসুস্থতা, জামিনে মুক্তি, বিদেশে উন্নত চিকিত্সা নিতে যাওয়ার ইচ্ছা- এমন আলোচনা দেশের রাজনীতিতে ঘুরে ফিরে আসছে। এ নিয়ে তার পরিবারের সদস্য, বিএনপি নেতা আর চিকিত্সকদের বক্তব্যের মধ্যে ঢেড় তফাত্ রয়েছে। বলতে গেলে, এক পক্ষের বক্তব্যের সঙ্গে অন্য পক্ষের বক্তব্যের কোনো মিল নেই। এমন ক্ষেত্রে সরকারই বা কী করতে পারে- সে প্রশ্নও আছে।
দুর্নীতির দুই মামলায় ১৭ বছরের দণ্ডপ্রাপ্ত হয়ে গত বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে কারাবন্দী খালেদা জিয়া। ৭৪ বছরের একজন নারী বেগম জিয়া স্বাভাবিক কারণেই বয়সজনিত নানা রোগে আক্রান্ত। ফলে তাকে দেশের সবচেয়ে সেরা হাসপাতালে রেখে সর্বোচ্চ উন্নত চিকিত্সা দেয়ার ব্যবস্থা করেছে সরকার। একজন দণ্ডিত কারাবন্দী হলেও ভিআইপি হিসেবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের একটি উন্নতমানের কেবিনে রেখে তার চিকিত্সা চলছে সরকারি খরচে। কিন্তু এ চিকিত্সা নিয়ে বিএনপি বিভিন্ন সময় প্রশ্ন তুলেছে। দলটির শীর্ষনেতারা অভিযোগ করে আসছেন, তাকে সঠিক চিকিত্সা দেয়া হচ্ছে না। বেগম জিয়াকে মেরে ফেলার জন্য সরকার তাকে উন্নত চিকিত্সার জন্য বিদেশে নিতে দিচ্ছে না, জামিন দিচ্ছে না। গণআন্দোলনের মধ্য দিয়ে তারা খালেদা জিয়াকে মুক্ত করার ঘোষণাও দিয়েছে একাধিক বার। কিন্তু সেই আন্দোলন করতে ব্যর্থ হওয়ায় রাজনৈতিকভাবে খালেদার জামিন আর বিদেশে নিয়ে চিকিত্সার সুযোগও হয়নি এ পর্যন্ত।
গত ২৫ অক্টোবর ছোট বোন সেলিমা ইসলামসহ পরিবারের সদস্যরা হাসপাতালে চিকিত্সাধীন খালেদা জিয়াকে দেখতে যান। সেখান থেকে বেরিয়ে এসে সেলিমা সাংবাদিকদের বলেন, খালেদা জিয়া জামিন পেলে তাকে উন্নত চিকিত্সার জন্য বিদেশে নিয়ে যাওয়া হবে। ছোট বোনের দাবি, খালেদা জিয়া হাত দিয়ে কিছু ধরতে পারেন না, হাঁটতে পারেন না, একা চলতে পারেন না। তার ডায়েবেটিস নিয়ন্ত্রণহীন। আরও অনেক সমস্যা বা রোগে ভুগছেন বেগম জিয়া। কিন্তু তিনি প্যারোলে মুক্তির বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেননি বলেও এসময় প্রশ্নের জবাবে সাংবাদিকদের জানান সেলিমা ইসলাম। কিন্তু প্যারোলে মুক্তির আবেদন না করলে সরকারের পক্ষেও এক্ষেত্রে কোনো উদ্যোগ নেয়া যে সম্ভব না, তা সরকারের পক্ষ থেকে আগেই একাধিক বার জানিয়ে দেয়া হয়েছে। কারণ, নিয়মিত মামলায় তারা আদালত থেকে জামিন করাতে না পারলে সেখানে সরকারের কী বা করার থাকে? জামিন দেয়া তো আদালতের বিষয়। বিষয়টি বিএনপি দলীয় আইনজীবীদের ব্যর্থতা হিসেবেও দেখছেন অনেকে। সর্বশেষ গতকাল সোমবার বঙ্গবন্ধু মেডিকেল কর্তৃপক্ষ ও খালেদা জিয়ার চিকিত্সরা সংবাদ সম্মেলন করে জানিয়েছেন, খালেদা জিয়ার শরীরের কোনো অবনতি হয়নি। তাকে হাসপাতাল থেকে ফেরত্ নেয়াও যেতে পারে। অবশ্য তাকে তিনটি ভ্যাকসিন দেয়া প্রয়োজন বলে চিকিত্সকরা তাকে জানালে তিনি তা গ্রহণে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন বলে তার চিকিত্সকের ভাষ্য। এর জবাবে বিএনপি নেতারা বলছেন, বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালকের বক্তব্য সঠিক নয়। খালেদা জিয়ার চিকিত্সা হলে ব্রিফিংয়ের প্রয়োজন হতো না। দলটির অপর এক নেতার মন্তব্য, হাসপাতালের পরিচালক ও চিকিত্সকের বক্তব্যের মধ্যে মিল নেই। খালেদা জিয়াকে ‘মেরে ফেলার ষড়যন্ত্র হচ্ছে’ বলেও বিএনপি নেতাদের অভিযোগ। কিন্তু প্যারোলে জামিনের আবেদন প্রসঙ্গ এলে দলটির নেতারা বলছেন, সেটি বেগম জিয়া ও তার পরিবারের সিদ্ধান্তের বিষয়। এখানে দলের কিছু করার নেই। আর পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, এ বিষয়ে খালেদা জিয়া কোনো কিছু বলেননি। কাজেই বিষয়টি নিয়ে যে রাজনীতি করা হচ্ছে- সেটি বলার অপেক্ষা রাখে না। সরকারের মন্ত্রীরাও সেকথাই বলছেন। এটি বিএনপির ঘোষণা পানিতে মাছ শিকারের অপকৌশল হিসেবেই দেখা হচ্ছে সরকারের পক্ষ থেকে।
তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদ বলেছেন, খালেদা জিয়ার চিকিত্সার বিষয়টি নিয়ে বিএনপি অপরাজনীতি করার চেষ্টা করছে। কিন্তু বিএনপির সেই কৌশল যে ব্যর্থ, এতে যে হালে পানি মিলবে না সেটিও স্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও এবিষয়ে বাকুতে প্রবাসীদের সঙ্গে মতবিনিময়ে সভায় বলেছেন, খালেদা জিয়া দুর্নীতির কারণে আদালতের মাধ্যমে দণ্ডিত হয়েছেন। তার জামিন পাওয়া না পাওয়া- এটি আদালতের বিষয়। এখানে সরকার কী করার আছে? তার চিকিত্সার জন্য সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে ব্যবস্থা করেছে বলেও জানিয়ে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
ফলে এ নিয়ে বিএনপির ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের কৌশল কাজে আসবে না বলেই মত রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের। বিশ্লেষকরা বলছেন, খালেদা জিয়া যদি সত্যিই শঙ্কটাপন্ন হবেন- তাহলে তো প্যারোলে হলেও মুক্তির উদ্যোগ নেয়া হতো পরিবার ও দল থেকে। কিন্তু তা না করে বক্তব্য দেয়া প্রমাণ করে- এটি রাজনীতি। আর বঙ্গবন্ধু মেডিকেল কর্তৃপক্ষ ও খালেদা জিয়ার চিকিত্সকদের বক্তব্যই এক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য।

