সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যাকাণ্ডের ধারাবাহিকতায় জেল হত্যা ‘নিষ্ঠুর বর্বরতা’
উত্তরদক্ষিণ মুদ্রতি সংস্করন । ০৩ নভেম্বর ২০১৯ । প্রকাশ ০০:০১। আপডেট ১২:৩০
মিলন গাজী : ১৫ আগস্টের পর ৩ নভেম্বর বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ইতিহাসে সবচেয়ে কলঙ্কিত দিন। ’৭৫ এর ১৫ আগস্টে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারের হত্যার পর একই বছরের ৩ নভেম্বর ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারে জাতীয় ৪ নেতাকে হত্যার মধ্যদিয়ে জাতির জন্য কলঙ্কিত ইতিহাস সৃষ্টি করা হয়। বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে তার ঘনিষ্ঠ সহচর হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী- সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী এবং এএইচএম কামারুজ্জামানকে এদিন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। কারাগারের অভ্যন্তরে এ ধরনের বর্বর হত্যাকাণ্ড শুধু দেশে নয়, পৃথিবীর ইতিহাসে নজিরবিহীন ঘটনা। কী অপরাধ ছিল তাদের? তাদের অপরাধ, তারা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর অনুসারী ছিলেন। তারা ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় নিবেদিত প্রাণ। তারা ছিলেন অসম্প্রদায়িক ও ধর্মনিরপেক্ষ, ক্ষুধা ও দারিদ্রমুক্ত বঙ্গবন্ধুর সোনা বাংলাদেশ গড়ার অন্যতম স্বপ্নদ্রষ্টা। এই অপরাধেই(!) তাদেরকে কারাগারে নির্মমভাবে জীবন দিতে হলো।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা একদিনে আসেনি। বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা স্বাধীনতার মহান স্থপতি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দু’দশকের অধিককাল ধরে জাতিকে বাঙালি জাতীয়তাবাদে উদ্বুদ্ধ করে নানা চড়াই-উত্রাই পেরিয়ে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। তার আহ্বানে শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। কিন্তু বঙ্গবন্ধু পাকিস্তান কারাগারে বন্দি থাকাবস্থায় তার অবর্তমানে ১৯৭১ সালে জাতীয় চার নেতা মুজিবনগর সরকার গঠন, রণনীতি ও রণকৌশল প্রণয়ন, প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড ও মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা, কূটনৈতিক তত্পরতা, শরণার্থীদের তদারকিসহ মুক্তিযুদ্ধকে জনযুদ্ধে পরিণত করতে অসামান্য অবদান রাখেন। সেই স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে বিপন্ন করার পাশাপাশি জাতিকে নেতৃত্বহীন করার লক্ষ্যে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর ৩ নভেম্বর স্বাধীনতাবিরোধী চক্র কারাবন্দি অবস্থায় জাতীয় চার নেতাকেও নির্মমভাবে হত্যা করে।
ঘাতকচক্রের উদ্দেশ্য ছিল- দেশে অগণতান্ত্রিক স্বৈরশাসনের উত্থানের পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের চেতনা থেকে বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের আদর্শকে মুছে ফেলা। কিন্তু ঘাতকচক্রের সেই উদ্দেশ্য সফল হয়নি। যতদিন বাংলাদেশ থাকবে ততদিন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার আদর্শ চির অম্লান থাকবে। বাঙালির ইতিহাসে এই নির্মমতা, নিষ্ঠুরতা ও লজ্জাস্কর ঘটনা পৃথিবীর বুকে জাতিকে লজ্জিত করে। এই ঘৃণ্য হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের বিচার হলেও অবশ্য তা আজও কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। এটিও আরেকটি লজ্জার বিষয়। তবে বর্তমান মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার জেল হত্যা দিবসের মামলার রায় কার্যকরে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এ জন্য সরকারের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশের ইতিহাসে এমন জঘন্য ও ঘৃণ্য ঘটনা যাতে আর ফিরে আসতে না পারে সে ক্ষেত্রে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী প্রত্যেক বাঙালিকে সজাগ ও সচেতন থাকতে হবে। স্বাধীনতাবিরোধী ও খুনিদের দল এবং সাম্প্রদায়িক শক্তি যেন আর কোনোদিন রাষ্ট্রক্ষমতায় আসতে না পারে, সেজন্যও সবাইকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন বিশ্লেষকরা। যদিও স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তি সবসময়ই দেশের বিরুদ্ধে চক্রান্তে লিপ্ত রয়েছে। এমনটা উল্লেখ করে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা বলেন, ‘তারা দেশের গণতান্ত্রিক ধারা ব্যাহত করতে ও স্বাধীনতার স্বপক্ষ শক্তিকে নিশ্চিত করতে বারবার হামলা চালিয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০০৪ সালের ২১-এ আগস্ট আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলা চালিয়ে আমাকে হত্যা করতে চেয়েছিল। এ ঘটনায় আওয়ামী লীগ নেত্রী আইভি রহমানসহ ২২ জন নেতা-কর্মী নিহত হন।’ জেল হত্যা দিবস উপলক্ষে গতকাল শনিবার জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া এক বাণীতে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কারাগারের নির্জন প্রকোষ্ঠে জাতীয় চার নেতার হত্যাকাণ্ড ছিল জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যার ধারাবাহিকতা। ‘এ ঘৃণ্য হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে স্বাধীনতার পরাজিত শক্তি, দেশবিরোধীচক্র বাংলার মাটি থেকে আওয়ামী লীগের নাম চিরতরে মুছে ফেলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধ্বংস এবং বাঙালি জাতিকে নেতৃত্বশূন্য করার অপচেষ্টা চালিয়েছিল।’
৭৫ এর ১৫ আগস্ট ও ৩ নভেম্বরের ঘৃণ্য হত্যাকাণ্ডের পর দেশের শাসন ক্ষমতা হারায় আওয়ামী লীগ। দীর্ঘ ২১ বছর রাজপথে লড়াই সংগ্রামের পর ১৯৯৬ সালে সরকার পরিচালনার দায়িত্ব পান জাতির পিতার কন্যা শেখ হাসিনা। তিনি দায়িত্বগ্রহণের পর বঙ্গবন্ধুর খুনিদের পাশাপাশি জাতীয় চার নেতার হত্যাকারীদেরও বিচারের আওতায় আনেন। এই খুনিদের বিচার করার পাশাপাশি জনগণকে দেওয়া ওয়াদা অনুযায়ী আওয়ামী লীগ সরকার যুদ্ধাপরাধীদের বিচারও করতে সক্ষম হয়েছে। বিচারের রায় বেশির ভাগই কার্যকর করা হয়েছে, অন্যদের দণ্ড কার্যকরের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘৭৫-এর সেই ষড়যন্ত্রকারী ও হত্যাকারীদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদদাতারা পরবর্তী ২১ বছর ধরে দেশের ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখে। শাসকগোষ্ঠী কখনও সামরিক লেবাসে, কখনও গণতন্ত্রের মুখোশ পরে, অবৈধ ও অসাংবিধানিকভাবে ক্ষমতা ধরে রাখে। আত্মস্বীকৃত খুনিদের রক্ষা করতে ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স জারি করে। হত্যাকারীদের বিচারের মুখোমুখি করার বদলে বিদেশে চাকরি দিয়ে পুরস্কৃত করে এবং অনেককে রাজনীতি করার সুযোগ করে দেয়।’ তবে দেশ সেই জায়গা থেকে উত্তরণ হয়েছে। দেশ এখন জাতির পিতার কন্যার নেতৃত্বে উন্নত ও সমৃদ্ধির পথে দ্রুত এগিয়ে চলছে। দেশ থেকে সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, সাম্প্রদায়িক শক্তি ও উগ্রবাদসহ সব ধরনের অপরাধ নির্মূলে বর্তমান সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। জাতিও আজ ঐক্যবদ্ধ দুর্নীতিমুক্ত এই উন্নয়ন অগ্রযাত্রায়। ‘বাংলাদেশকে আর কেউ দাবায়ে রাখতে পারবে না’। এ বিশ্বাস আজ সাড়ে ১৬ কোটি বাঙালির। এক্ষেত্রে জাতির পিতার অসমাপ্ত কাজ বাস্তবায়নে সবাইকে অবদান রাখতে এগিয়ে আসার আহবান জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ। রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ গতকাল শনিবার এক বাণীতে এ আহবান জানিয়ে বলেন, এটাই হোক জেলহত্যা দিবসে জাতির অঙ্গীকার।

