ইমরান খানের মসনদ হুমকির মুখে!

ইমরান খানের মসনদ হুমকির মুখে!

উত্তরদক্ষিণ মুদ্রতি সংস্করন । ০৫ নভেম্বর ২০১৯ । প্রকাশ ০০:০১। আপডেট ১০:৩৬

মোহাম্মদ শিহাব : পাকিস্তানের রাজনীতি বড় কঠিন। ১৯৭৪ সালে দেশটির জন্মের পর অর্ধের বেশি সময় ধরে পাকিস্তান শাসন করেছে সামরিক বাহিনী। ইতিহাস বলছে, এ পর্যন্ত কোনো নির্বাচিত সরকারই পূর্ণ মেয়াদে সরকার পরিচালনার সুযোগ পায়নি পাকিস্তানে। ফলে দেশটির বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের মেয়াদ পূর্ণ করার প্রশ্নে বিশ্লেষকদের মধ্যে সংশয় রয়েছে। যদিও এখন পর্যন্ত দেশটির সেনাবাহিনী ইমরানের পক্ষেই আছে। পাকিস্তানে সরকার বিরোধী চলমান আন্দোলনের মধ্যে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে গত শনিবার ‘সংবিধান রক্ষায়’ ইমরান খানের সরকারের পাশে থাকার ঘোষণাও দেয়া হয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত এই নীতিতে পাক সেনারা অনঢ় থাকবে তো- সেই প্রশ্ন তুলেছেন কেউ কেউ। অবশ্য সে বিষয়টি এখনই নিশ্চিত করে বিশ্লেষকরা কিছু বলতে পারছেন না। কারণ, পাক সেনাদের বিগত ইতিহাস ভিন্ন কথা বলে। তবে তারা বলছেন, যেহেতু সেনাবাহিনীর সমর্থন ও পৃষ্ঠপোষকতা নিয়েই ২০১৮ সালে ক্ষমতায় এসেছেন এক সময়ের ক্রিকেটার ইমরান খান। এখন পর্যন্ত সেনাবাহিনী তার পক্ষে আছে। হয়তো বিরোধীদের আন্দোলনের মধ্যে শেষ পর্যন্ত সরকারের পক্ষেই থাকবে সেনারা। যদি সেটি হয়, তাহলেই কেবল মসনদ টিকিয়ে রাখতে পারবেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। কিন্তু সেনাবাহিনী যদি সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে তবে ইমরানের এমন কোনও রাজনৈতিক শক্তি নেই যে, তিনি ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারবেন। এদিকে, ইরমান খানের পদত্যাগের দাবিতে গত মাসের শেষ দিকে শুরু হওয়া আন্দোলন ও বিক্ষোভ এখনও অব্যাহত রয়েছে দেশটিতে।

ইসলামাবাদে জমিয়তে উলামা-ই-ইসলামের নেতৃত্বে লাখ লাখ লোক জড়ো হয়ে দুর্নীতির অভিযোগে ইমরান খান সরকারের পদত্যাগের দাবিতে স্লোগান দিয়ে যাচ্ছেন। এমনকি ইমরান খানের সরকারের পতন ছাড়া তারা ঘরে ফিরে যাবেন না বলেও হুশিয়ারি দিয়েছেন। ইসলামপন্থীদের এই আন্দোলনে এরই মধ্যে দেশটির অন্য বিরোধী দলগুলোও যুক্ত হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। আন্দেলন প্রসঙ্গে কট্টরপন্থী ইসলামপন্থী দলটির নেতা, ৬৬ বছরের মাওলানা ফজলুর রহমান ফজল বলেছেন, আমাদের অবস্থান সঠিক। পিছু হটে যাওয়া ‘পাপ’ হবে এবং পিছু হটার উপায় নেই। এটিই আমাদের প্রথম পরিকল্পনা, আমাদের দ্বিতীয় ও তৃতীয় পরিকল্পনা রয়েছে। জমিয়ত নেতা বলেন, আমাদের দাবি মেনে না নেওয়া পর্যন্ত আমরা সরব না। এই জনসমুদ্র এখানেই থেমে যাবে না। আগামীতে ‘আমরা পুরো দেশ অচল করে দেব’। সরকারের পদত্যাগ ছাড়া আমরা কিছুতেই ফিরে যাব না। তবে মাওলানা বিক্ষোভ শান্তিপূর্ণ রাখার ঘোষণা দিয়েছেন এবং রাজধানীর ডি-চক এলাকায় প্রবেশের চেষ্টার কোনও ইঙ্গিত দেননি। গত শুক্রবার তিনি বলেন, ডি-চক এলাকায় জায়গা বেশি নেই। এমনকি এই উন্মুক্ত স্থানেও সবার স্থান সংকুলানে কষ্ট হচ্ছে। তবে আমরা যদি সিদ্ধান্ত নেই প্রধানমন্ত্রীর বাস ভবনে প্রবেশ করবো তাহলে কেউ ঠেকাতে পারবে না। আমরা এখানে করতে বা মরতে এসেছি। 

সর্ব বিরোধী দলীয় বৈঠক: ‘আজাদি মার্চের’ ভবিষ্যত্ ঠিক করতে সর্ব বিরোধী দলীয় বৈঠক ডাকা হয় গতকাল সোমবার (৪ নভেম্বর) স্থানীয় সময় সন্ধ্যায়। ইমরানের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনের নেতা ও জমিয়তে উলামা-ই-ইসলামের প্রধান মাওলানা ফজলুর রহমান ওই বৈঠক ডাকেন। এআরওয়াই নিউজ জানিয়েছে, সর্ব বিরোধীদলীয় বৈঠকের পর গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা দেবেন মাওলানা ফজল। আন্তর্জাতিক একাধিক গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, গত বৃহস্পতিবার (৩১ অক্টোবর) রাত থেকে কয়েক লাখ জমিয়ত কর্মী- সমর্থক পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে উপস্থিত হন। পরের দিন শুক্রবার সন্ধ্যায় মাওলানা ফজলুর রহমান ফজল আজাদি মার্চ নিয়ে সেখানে উপস্থিত হয়ে অবস্থান ধর্মঘট শুরু করেন।

পাকিস্তানের পাঞ্জাবের প্রাদেশিক পরিষদের স্পিকার পারভেজ এলাহি আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি মাওলানা ফজলুর রহমানের সঙ্গে বৈঠকে বসার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। এদিকে, যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। রাজধানীর বাণিজ্যিক এলাকা ও বিশেষ নিরাপত্তা জোন পাহারা দিতে বিশেষ বাহিনী ও আধাসামরিক বাহিনীকে ডাকা হয়েছে। আন্দোলনের মধ্য গত শুক্রবার এক অনুষ্ঠানে ইমরান খান বলেছেন, আন্দোলনকারীরা তার পতন ঘটাতে পারবেন না। শুক্রবার ইসলামবাদে বিশাল জনসভায় মাওলানা ফজল বলেন, ‘২০১৮ সালের ২৫ জুলাই পাকিস্তানে অবৈধ নির্বাচন হয়েছে। আমরা এই সরকারকে এক বছর সময় দিয়েছি। আর সময় দেওয়া সম্ভব নয়।’ ইমরানকে ‘পাকিস্তানের গর্বাচেভ’ অ্যাখ্যা দিয়ে মাওলানা ফজল বলেন, ‘ওঁকে দু’দিনের মধ্যে পদত্যাগ করতে হবে।’ সেইসঙ্গে হুমকির সুরে বলেন, ‘বিক্ষোভকারীরা এখনও শান্ত আছেন। কিন্তু পরে সমস্যা হতে পারে।’ খবরে বলা হয়, ইসলামাবাদে ফজলুরের বাড়িতে তার সঙ্গে আলোচনায় বসেন পাকিস্তান পিপলস পার্টির বিলাবল ভুট্টো জারদারি, পাকিস্তান মুসলিম লিগ-নওয়াজের আহসান ইকবাল, খাজা আসিফ, পাখতুনখোয়া মিল্লি আওয়ামি পার্টির মেহমুদ খান আছাকজড়াইয়ের মতো বিরোধী নেতারা। এসময় দেশটির ‘শক্তিশালী’ প্রতিষ্ঠানগুলিকে নিরপেক্ষ থাকতে অনুরোধ করেন মাওলানা ফজল। ‘শক্তিশালী’ প্রতিষ্ঠান বলতে তিনি যে সেনাকে বুঝিয়েছেন, তা নিয়ে পাক রাজনীতিকদের সন্দেহ ছিল না। পিপিপি প্রধান বিলাবল ভুট্টো জারদারি বলেন, ‘ইমরান খান একটা পুতুল। দেশবাসী এই নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী এবং তাকে যারা নির্বাচিত করেছেন তাদের সামনে মাথা ঝোঁকাবে না।’ এর পরের দিন পাক সেনাদের মুখপাত্র আসিফ গফুর বলেন, ‘ফজলুর রহমান প্রবীণ রাজনীতিক। তিনি কোন প্রতিষ্ঠানের কথা বলতে চাইছেন, তা স্পষ্ট করা উচিত। সেনারা নির্বাচিত সরকারের পাশেই আছে।’ পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে সতর্ক প্রশাসনকে সতর্ক থাকতে নির্দেশ দিয়েছেন পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ মন্ত্রী ইজাজ শাহ। তিনি বলেন, ‘আশা করি বিক্ষোভকারীরা সরকারের সঙ্গে হওয়া চুক্তি মেনে শান্তি বজায় রাখবে।’ শাসক দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই)-এর অভিযোগ, পিএমএল-এন এবং পিপিপি এই বিক্ষোভকারীদের উস্কানি দিচ্ছে। কারণ তাদের ধৃত নেতাদের জেল থেকে মুক্ত করতে এই আন্দোলনের মাধ্যমে সরকারের ওপর একটা চাপ সৃষ্টি করছে।

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading