আবরারের মৃত্যু দুর্ঘটনা নয়, হত্যাকাণ্ড

আবরারের মৃত্যু দুর্ঘটনা নয়, হত্যাকাণ্ড

উত্তরদক্ষিণ মুদ্রতি সংস্করন । ০৭ নভেম্বর ২০১৯ । প্রকাশ ০০:০১। আপডেট ১০:৩৫

সুষ্ঠু তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি

ঢাকা রেসিডেন্সিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণির ছাত্র নাঈমুল আবরারের মৃত্যুর ঘটনাটি মেনেনিতে পারেননি কেউ-ই। মৃত্যু ঘটনাটি প্রথমে ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা হলেও শেষ পর্যন্ত তা গোপন থাকেনি। ঘটনার প্রতিবাদে ফুঁসে উঠেছেন আবরারের পরিবার, সহপাঠীসহ বিভিন্ন মহল। শুরু থেকেই প্রশ্ন- কেন ঘটনার পর কাছের হাসপাতালে না নিয়ে দূরের হাসপাতালে নেয়া হয়েছিল আবরারকে? অভিযোগ আছে, সেখানে নেয়ার পর তার দ্রুত চিকিত্সা দেয়া হয়নি। জীবিত অবস্থায় হাসপাতালে নেয়া হলেও সময় নষ্টের কারণে বিনা চিকিত্সায় আবরারের মৃত্যু হয়েছে। দুর্ঘটনার পেছনে অনুষ্ঠান আয়োজক কমিটির অবস্থাপনা বড় দায়ী বলে অনেকে মনে করেন। তাছাড়া, আবরার বিদ্যুত্স্পৃষ্ট হওয়ার পর কেন পরিবারকে জানানো হয়নি? কেন স্কুল কর্তৃপক্ষকেও বিষয়টি তাত্ক্ষণিক জানানো হয়নি? এত বড় ঘটনার পর কীভাবে প্রথম আলো কর্তৃপক্ষ তথা কিশোর আলো আনন্দ উত্সব চালিয়ে গেল? তাদের কাছে একজন স্কুলছাত্রের জীবনের চেয়ে আনন্দটাই তাহলে বড়? এমন অসংখ্য প্রশ্ন তুলেছেন আবরারের পরিবার, কলেজ কর্তৃপক্ষ, বিশ্লেষক ও তার সহপাঠীরা।

এদিকে ঘটনার পর তাত্ক্ষণিক জিডি করতে মোহাম্মদপুর থানায় গেলেও আবরারের বাবার সেই জিডি গ্রহণ করা হয়নি বলে অভিযোগ আছে। বরং তার কাছ থেকে কিশোর আলো কর্তৃপক্ষ কৌশলে মুসলেকা নিয়ে পুলিশকে দিয়ে একটি অপমৃত্যুর মামলা করিয়ে আবরের লাশ পরিবারের কাছে বুঝিয়ে দিয়েছিল বলেও জানা গেছে। তবে গতকাল বুধবার আবারের বাবা আদালতে হাজির হয়ে মামলা দায়ের করার পর নড়েচড়ে বসেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। আদালত মামলাটি গ্রহণ করে মৃত নাঈমুল আবরারের লাশ তুলে ময়নাতদন্তের ব্যবস্থা করার নির্দেশ দিয়েছেন। এদিকে, স্কুল কর্তৃপক্ষ এই মৃত্যুর জন্য প্রথম আলো কর্তৃপক্ষকেই দায়ী করেছেন। ‘এটি দুর্ঘটনায় মৃত্যু নয়, হত্যাকাণ্ড’ মন্তব্য করে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও হত্যাকাণ্ডের পেছনে দায়ীদের উপযুক্ত শাস্তির দাবি করেছেন আবরারের সহপাঠীসহ সচেতন শিক্ষার্থীরা। এমন দাবিতে রেসিডেন্সিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের সাবেক শিক্ষার্থীরাও আন্দোলনে নেমেছেন। তাদের অভিযোগ, আবরারের মৃত্যু দুর্ঘটনা নয়, হত্যাকাণ্ড। তাই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে বিচার চান তারা।

গতকাল বুধবার (৬ নভেম্বর) দুপুর ১২টার দিকে ঢাকা রেসিডেন্সিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের গেটের সামনে আবরারের মৃত্যুর ঘটনায় সুষ্ঠু বিচারের দাবিতে মানববন্ধনে অংশ নিয়ে এসব কথা বলেন সাবেক শিক্ষার্থীরা। এ সময় প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান শিক্ষার্থীরাও মানববন্ধনে অংশ নেন। মানববন্ধনে অংশ নিয়ে সাবেক শিক্ষার্থীদের পক্ষে ঢাকা রেসিডেন্সিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের অল্ড রেমিয়ান্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মশিউর রহমান বলেন, ‘শুক্রবার (১ নভেম্বর) ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজের মাঠে কী ঘটেছিল তা আপনারা সবাই জানেন। সেদিন বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে যখন প্রোগ্রাম শেষের দিকে তখন হঠাত্ চিত্কার শুনে দেখা গেল যে, আবরার মাটিতে পড়ে আছে। সে বলছে, আমার বুকে অনেক ব্যথা করছে। সবাই ওকে তুলে মাঠের এক পাশে ডাক্তার ছিল সেখানে নিয়ে গেল। চিকিত্সকরা আবরারের অবস্থা খারাপ দেখে মহাখালী ইউনিভার্সাল হসপিটালে নিয়ে গেলেন। অথচ রাস্তার উল্টোপাশেই শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। সেখানে আবরারকে নেয়া হলো না। কাছে হাসপাতাল থাকতে কেন তাকে দূরের হাসপাতালে নেয়া হলো- সেই প্রশ্নও তোলা হয় এসময়। মশিউর রহমান বলেন, ‘ওই সময় স্কুলে কর্তৃপক্ষ ছিল, পুলিশ উপস্থিত ছিল। চিকিত্সকরা (অনুষ্ঠান আয়োজকদের নিজস্ব ডাক্তার) কাউকেই কিছু জানাননি। তারা বাচ্চার গার্ডিয়ান, স্কুল কর্তৃপক্ষ কারও সাথে যোগাযোগ না করে আয়েশা মেমোরিয়াল নিয়ে গেলেন। উনারা যখন বুঝলেন বাচ্চার অবস্থা খারাপ, তখন পাশের সোহরাওয়ার্দী মেডিকেলে নিতে পারতেন। কিন্তু তা না করে নিয়ে গেলেন মহাখালীতে। ফলে বাচ্চাটি মারা গেল।’ তিনি বলেন, ‘আবরার মারা গেছে। কিন্তু আমাদের কথা হচ্ছে, তাকে তাত্ক্ষণিকভাবে যদি সোহরাওয়ার্দী মেডিকেলে নেওয়া হতো তবে এমন ঘটনা নাও ঘটতে পারত। কাউকে ইনফরমেশন না দিয়ে তারা নিজেদের ইচ্ছে মতো কাজ করেছে। কিন্তু এখানেই ঘটনা শেষ নয়। তারা বিষয়টি চেপে রেখে অনুষ্ঠান চালিয়ে গেছেন। স্কুলের অন্য এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক বিষয়টি স্কুলের প্রধান শিক্ষককে জানালে তা সামনে আসে।’ এ সময় ক্ষোভ প্রকাশ করে মশিউর বলেন, ‘ময়নাতদন্ত না করেই মৃতদেহ গ্রামের বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। আর এই কাজগুলো করা হয়েছে ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার জন্য।

পরের দিন একটি দৈনিক পত্রিকা নিউজ করেছে, এটি নিছক দুর্ঘটনা। কিন্তু আমরা এটিকে মোটেও দুর্ঘটনা মনে করি না। আমরা বলতে চাই, আবরারকে খুন করা হয়েছে। এটি একটি হত্যাকাণ্ড। আমরা চাই, ঘটনার সঠিক সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার হোক।’ তিনি আরও বলেন, ‘আবরার বিদ্যুতায়িত খাওয়ার আগে আরও কয়েকজন শিক্ষার্থী আয়োজকদের কাছে অভিযোগ করেছিল যে, তারা পায়ে কারেন্টের শক পেয়েছে। কিন্তু তাদের টিম তখন কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। তারা কোনো অবস্থায় দায়িত্বশীল ছিল না। আগে কয়েকজন অভিযোগ দিলেও তাদের টনক নড়ে নাই। তাই এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত সকলের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছি।’ মানববন্ধনে উপস্থিত হয়ে সরকারি বিদ্যালয়টির অধ্যক্ষ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল কাজী শামীম ফরহাদ বলেন, আবরারের মৃত্যুর দায় প্রথম আলো কর্তৃপক্ষ এড়াতে পারে না। ঘটনার পর আমাকে কিছুই জানানো হয়নি। বিকাল সাড়ে ৫টায় যখন আমি জেনেছি, তখন সব শেষ। 

এদিন নাঈমুল আবরার বাবা মো. মুজিবুর রহমান ছেলের মৃত্যুর ঘটনায় প্রথম আলো সম্পাদক ও প্রকাশক এবং কিশোর আলোর প্রকাশ মতিউর রহমানের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন আদালতে। ছেলের মৃত্যুর চার দিন পর গতকাল বুধবার ঢাকার আদালতে গিয়ে অবহেলায় মৃত্যুর অভিযোগ এনে মামলাটি করলেন তিনি। ঢাকার চতুর্থ অতিরিক্ত মহানগর হাকিম মো. আমিনুল হক বাদীর জবানবন্দি গ্রহণ করে রাহাতের লাশ কবর থেকে তুলে ময়নাতদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। সেই সঙ্গে রাহাতের মৃত্যুর পর যে অপমৃত্যু মামলাটি হয়েছে, তার সঙ্গে নতুন নালিশি মামলাটি একসঙ্গে তদন্ত করে আগামী ১ ডিসেম্বরের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে মোহাম্মদপুর থানার ওসিকে নির্দেশ দিয়েছে আদালত।  প্রসঙ্গত, গত শুক্রবার রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজে যে অনুষ্ঠানে রাহাত বিদ্যুত্স্পৃষ্ট হয়ে মারা যান, ওই অনুষ্ঠানের আয়োজক ছিল প্রথম আলোর কিশোর সাময়িকী কিশোর আলো। প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান কিশোর আলোরও প্রকাশক; কিশোর আলোর সম্পাদক হলেন আনিসুল হক, তিনি প্রথম আলোর নির্বাহী সম্পাদক। গত শুক্রবার বিকালে মোহাম্মদপুরের ওই কলেজ ক্যাম্পাসে কিশোর আলোর প্রতিষ্ঠাবাষির্কীর একটি অনুষ্ঠান চলাকালে বিদ্যুত্স্পৃষ্ট হয় নবম শ্রেণির ছাত্র আবরার (১৫)। তাকে মহাখালীর ইউনিভার্সাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পর তার মৃত্যু ঘোষণা করেন চিকিত্সকরা। সেদিন থানায় অপমৃত্যুর মামলার পর ময়নাতদন্ত ছাড়াই রাহাতের বাবা মুজিবুর ছেলের লাশ নিয়ে যান বলে মোহাম্মদপুর থানার ওসি জি জি বিশ্বাস জানিয়েছিলেন। পরে নোয়াখালীতে গ্রামের বাড়িতে নিয়ে দাফন করা হয় রাহাতকে। এদিকে বিদ্যুত্স্পষ্ট হওয়ার জন্য কিশোর আলো কর্তৃপক্ষের অব্যবস্থাপনাকে দায়ী করার পাশাপাশি কাছের এত হাসপাতাল থাকতে দূরের হাসপাতালে আবরারকে নেওয়া এবং মৃত্যুর পরও অনুষ্ঠান চালিয়ে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা ওঠে।

সমালোচনার মুখে কিশোর আলো কর্তৃপক্ষ জানায়, ওই অনুষ্ঠানের অংশীদার ছিল ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, অনুষ্ঠানে তাদের একটি মেডিকেল ক্যাম্প ছিল, ওই ক্যাম্পের চিকিত্সকের পরামর্শেই আবরারকে ইউনিভার্সেল হাসপাতালে পাঠানো হয়েছিল। আর তার মৃত্যুর খবর পাওয়ার আগেই অনুষ্ঠান শেষ হয়ে গিয়েছিল। তবে এরপরও সমালোচনার পাশাপাশি ক্ষোভ-বিক্ষোভ চলতে থাকে, প্রথম আলো কার্যালয়ের সামনে মানববন্ধনও হয়, বিষয়টি আলোচনায় ওঠে মন্ত্রিসভার বৈঠকেও। রেসিডেনসিয়াল কর্তৃপক্ষ এই ঘটনার তদন্তে একটি কমিটি করেছে; পুলিশও কিশোর আলো সম্পাদক আনিসুল হকসহ বেশ কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। তার মধ্যেই  ৩০৪ (ক) ধারা বা অবহেলার কারণে মৃত্যু সংঘটনের অভিযোগ এনে মামলা করলেন আবরারের বাবা; যে ধারায় অপরাধের সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। মামলায় প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমানের নাম উল্লেখ করে, সেই সঙ্গে নাম উল্লেখ না করে কিশোর আলোর প্রকাশক ও ওই অনুষ্ঠানের সঙ্গে জড়িত অজ্ঞাতনামাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনেন তিনি। অভিযোগে বলা হয়, সঠিকভাবে বিদ্যুতের ব্যবস্থাপনা না করে এরকম অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে এবং এতে নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা করা হয়নি। ঘটনা ঘটার পর রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজ ক্যাম্পাসের উল্টো পাশের সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে আবরারকে না নিয়ে উদ্দেশ্যমূলকভাবে মহাখালীর ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। বাদী বলেন, ‘কর্তৃপক্ষ আমাকে কিছু জানায়নি। তার বন্ধু ও সহপাঠীর মাধ্যমে ছেলের মৃত্যুর সংবাদ জেনেছি। অথচ আনুমানিক ৩টার সময় সে বিদ্যুত্স্পৃষ্ট হয়। ৪টা ১৫ মিনিটে ইউনিভার্সেলে ভর্তি করা হয়, ৪টা ৫১ মিনিটে ডাক্তার তাকে মৃত ঘোষণা করে।’ মুজিবুর অভিযোগ করেছেন, ‘এ মৃত্যু শুধু একটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনা হিসেবে মেনে নেওয়ার জন্য আমাকে চাপ প্রদান করা হয়। লাশের পোস্ট মর্টেম ছাড়া মোহাম্মদ থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।’ মুজিবুর দাবি করেছেন, তাকে ‘ভুল বুঝিয়ে’ ময়নাতদন্ত ছাড়া লাশ গ্রহণের জন্য মুচলেকা নেওয়া হয়েছিল। বাদীর আইনজীবী মোহাম্মদ ওমর ফারুক আসিফ বলেন, ‘গত ১ নভেম্বরের ওই মৃত্যুটি কোনো মর্মান্তিক দুর্ঘটনা বা অপমৃত্যু নয়। বরং আসামিদের চরম অবহেলা, অযত্ন, গাফিলাতি, অব্যবস্থাপনা ও চিকিত্সার অবহেলা এবং অসাবধনতার কারণে নাঈমুল আবরার রাহাতের মৃত্যু হয়।’

এ ঘটনায় পরিবারের পাশাপাশি অনেকেই মর্মহত হয়েছেন। সবার দাবি, ঘটনাটি সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে আবরারের মৃত্যুর পেছনে দায়ীদের যেন উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করা হয়। এক্ষেত্রে সরকারের সহযোগিতাও চেয়েছেন আবরারের পরিবারসহ বিদ্যালয়টি সাবেক ও বর্তমান বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা।

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading