ছাত্রদের উচ্ছৃঙ্খলতার চরম বহিঃপ্রকাশ আবরার হত্যাকাণ্ড
উত্তরদক্ষিণ মুদ্রতি সংস্করন । ১৪ নভেম্বর ২০১৯ । প্রকাশ ০০:০১। আপডেট ১০:২৮
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ছাত্রদের উচ্ছৃঙ্খলতার চরম বহিঃপ্রকাশ আবরার হত্যাকাণ্ড। বুয়েট হল প্রশাসন ছাত্রদের বিষয়ে আরও একটু সতর্ক হলে উচ্ছৃঙ্খলতা এড়ানো বা কমানো যেত। ফলে এরকম হত্যাকাণ্ড ঘটতো না। আবরার হত্যাকাণ্ড তদন্ত করতে গিয়ে বুয়েট হল প্রশাসনের এসব ব্যর্থতা পাওয়া গেছে। গতকাল বুধবার (১৩ নভেম্বর) দুপুরে ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের প্রধান অতিরিক্ত কমিশনার মো. মনিরুল ইসলাম এসব তথ্য তুলে ধরেন। তিনি জানান, বুয়েটের ওই হলের ২০১১ নম্বর কক্ষে সরাসরি মারপিটে অংশ নিয়েছিল ১১ জন। বাকি ১৪ জন ঘটনাস্থলে না থেকেও ভূমিকা রেখেছে। তারা হত্যায় মদদ দিয়েছে, নির্দেশনা দিয়েছে এবং পরিকল্পনা করেছে। ভিডিও ফুটেজ, প্রযুক্তিগত সহায়তা, হলের স্টাফ, নাইটগার্ড ও অন্যান্য শিক্ষার্থীদের জিজ্ঞাসাবাদে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
মনিরুল ইসলাম জানান, গ্রেফতার হওয়া আসামিদের মধ্যে আদালত ৮ জন স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। আবার অনেকে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে না চাইলেও তারা পুলিশের কাছে স্বীকারোক্তি দিয়েছে। অর্থাত্ নিখুতভাবে এই মামলার চার্জশিট প্রস্তুত করে আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘একক কোনো কারণে আবরার হত্যাকাণ্ড ঘটেনি। হত্যাকারীরা বুয়েটের ছাত্র হলেও এরা র্যাগিং করত এবং উচ্ছৃঙ্খল হয়ে উঠেছিল। ছোট খাটো বিষয়ে কেউ দ্বিমত করলে, তাদের সালাম না দিলে, সমীহ করে না চললে, অকারণে হাসি ঠাট্টা করলে তারা অন্যান্য ছাত্রদের ভীত সন্ত্রস্ত করে রাখত। রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতাসহ নানা কারণে বহুদিন থেকে এরা উচ্ছৃঙ্খল চরম পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল। তারই বহিঃপ্রকাশ ঘটে আবরার হত্যার মধ্য দিয়ে। তারা কথিত শিক্ষা দেওয়ার নাম করে একজনের ওপর অত্যাচার করে। তারা মনে করে, একজনকে শায়েস্তা করতে পারলে বাকিরা এমনিতেই সোজা হয়ে চলবে। এজন্য অনেককে মাঝেমধ্যেই মারপিট করত।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ২০১১ নম্বর কক্ষে রাত ১০টার দিকে মারপিট শুরুর পর রাত আড়াইটার দিকে ডাক্তার গিয়ে আবরারকে মৃত ঘোষণা করে। তার আগে বাইরের কেউ জানত না। বিশ্বজিতকে প্রকাশ্যে কোপানোর পরও আসাামদের শাস্তি হয়নি, আবরারের হত্যাকারীদের ক্ষেত্রে কি আদৌ শাস্তি হবে বলে মনে করছেন এমন প্রশ্নের জবাবে মনিরুল বলেন, ‘বিশ্বজিতকে প্রকাশ্যে যারা কুপিয়েছে তাদের শাস্তি বহাল আছে। যারা সরাসরি জড়িত ছিল না তারা কেউ কেউ উচ্চ আদালতে গিয়ে শাস্তি কমিয়েছে। আবরারের বেলায় আশা করছি তেমনটি হবে না। কারণ, ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশও আগের চেয়ে তদন্তের দিক দিয়ে অনেক শক্তিশালী হয়েছে। নতুন নতুন প্রযুক্তিগত সহায়তা নিয়ে ঘটনা প্রমাণের চেষ্টা করা হয়েছে।’ আবরারকে কেন ডেকে নিয়ে গিয়েছিল, তদন্তে কি জানতে পেরেছেন? এর জবাবে মনিরুল ইসলাম জানান, তারা মনে করত, আবরারের আচরণগত সমস্যা ছিল, সালাম দিতো না, সব সময় তীর্যক মন্তব্য করত, হাসি ঠাট্টা করত, তার চলনে শিবির বা হিযবুত তাহরীর করে এমন সন্দেহ করত ভেবেই আবরারকে রাত ৮টার দিকে ডেকে নিয়ে যায় হত্যাকারীদের কয়েকজন। মূলত উচ্ছৃঙ্খলতার চরম মাত্রায় পৌঁছানোর কারণেই এরকম একটি মর্মান্তিক হত্যার ঘটনা ঘটেছে। পুলিশ আবরারের বিষয়ে কখন জানতে পেরেছে? জানতে চাইলে মনিরুল ইসলাম বলেন, রাত ৩টার দিকে ডিউটি অফিসারকে একজন ছাত্র ফোন করে বলেছিল, হলে একজন শিবির আটক হয়েছে। খবর পেয়ে পুলিশ হলের গেটে এসে সেরকম কিছু না পেয়ে চলে যায়। অমিত সাহার বিষয়ে জানতে চাইলে মনিরুল বলেন, অমিত সাহা ঘটনাস্থলে না থাকলেও ঘটনার আগে এবং ঘটনার দিন হত্যায় পরোক্ষভাবে সহায়তা করেছে। ঘটনার আগেও সে আবরারকে শায়েস্তা করতে চেয়েছে। এর আগে আরও একজনকে পিটিয়েছে অমিত সাহা। সে কারণে অমিত সাহাকে একজন অন্যতম আসামি হিসেবে যুক্ত করে চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। অমিত সাহা ধর্মীয় কারণে হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে এমন প্রচারণা থাকলেও তদন্তে তেমন কোনো তথ্য উঠে আসেনি। সেও ছিল চরম পর্যায়ের উচ্ছৃঙ্খল। এই হত্যাকাণ্ডের শিক্ষণীয় বিষয় তুলে ধরে মনিরুল ইসলাম বলেন, আইন অমান্য করলে, অপরাধ সংঘটিত করলে, তাকে আইনের আওতায় আনা হবে। কেউ যদি মনে করে অপরাধ ঘটানোর পরও পার পাওয়া যাবে তাহলে সেটি হবে মারাত্মক ভুল। এটি হচ্ছে সমাজের জন্য মেসেজ। গতকাল বুধবার (১৩ নভেম্বর) আবরার হত্যা মামলায় মোট ২৫ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দিয়েছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। এর মধ্যে ১৯ জন এজাহারের অন্তর্ভুক্ত আর অন্য ৬ জন এজাহার বহির্ভূত। ১৯ জনের মধ্যে ১৬ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে আর বাকি ৩ জন (জিসান, তানিম ও মোরশেদ) পলাতক রয়েছে। এজাহার বহির্ভূত ৬ জনের মধ্যে ৫ জন গ্রেফতার হয়েছে, বাকি একজন (মুজতবা রাফি) পলাতক রয়েছে। মামলায় ৩১ জনকে সাক্ষী করা হয়েছে। মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘আবরার হত্যাকাণ্ডের পর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম যে, হত্যার সঙ্গে জড়িত সকলকে আইনের আওতায় নিয়ে আসা হবে। সেই প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে আদালতে চার্জশিট জমা দেওয়া হয়েছে। সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সাক্ষীর সাক্ষ্য, বিভিন্ন আলামত প্রযুক্তিগত সাক্ষ্য ও অন্যান্য সাক্ষ্য প্রমাণের ভিত্তিতে এ চার্জশিট প্রস্তুত করা হয়েছে।’

