বাবরি মসজিদ রায়ের প্রতিক্রিয়া
ইন্ডিয়ায় মুসলিমদের ক্ষোভ বাড়ছে
উত্তরদক্ষিণ মুদ্রতি সংস্করন । ১৭ নভেম্বর ২০১৯ । প্রকাশ ০০:০১। আপডেট ১০:৩০
বিবিসি ও আনন্দবাজার অবলম্বনে মিলন গাজী : ইন্ডিয়ার অযোধ্যার ‘বাবরি মসজিদ-রাম জন্মভূমি মামলা’ নিয়ে দেশটির সুপ্রিম কোর্টের দেওয়া রায়ে মুসলিম জনগোষ্ঠির মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। শুরুতে রায় পুনর্মূল্যায়নের ক্ষেত্রে আদালতে না যাওয়ার কথা শনা গেলেও এখন মত পাল্টাচ্ছেন দেশটির সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের নেতারা। অনেকেই রায় পুনঃবিবেচনার আবেদন করার দাবি তুলতে শুরু করেছেন। ব্রিটিশ গণমাধ্যম বিবিসির এক প্রতিবেদনে এমনটাই জানানো হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, রায় ঘোষণার ঠিক পরেই যদিও মুসলমানদের একটা অংশের নেতারা বলেছিলেন যে, সর্বোচ্চ আদালতের রায় মেনে নিতেই হবে। কিন্তু গত এক সপ্তাহে সেই মনোভাব পাল্টিয়েছেন মুসলিম সমাজের ধর্মীয়-সামাজিক নেতা এবং আইনজ্ঞদের অনেকেই। ওই রায় যে তাদের ভাবাবেগকে আহত, ব্যথিত করেছে, সেটা স্পষ্ট করেই বলা শুরু হয়েছিল রায় প্রকাশের পর থেকে। তবে রিভিউ বা পুনর্মূল্যায়নের আবেদন করা হবে কি না, তা ঠিক করতে আজ রবিবার বৈঠকে বসছে অল ইন্ডিয়া মুসলিম পার্সোনাল ল’ বোর্ড। ওই বোর্ডের সচিব ও অযোধ্যার জমি মামলায় মুসলিম পক্ষের অন্যতম প্রধান আইনজীবী জাফরইয়াব জিলানি অবশ্য বলেছেন, প্রথম থেকেই তার মনে হচ্ছিল যে, রিভিউ পিটিশন দাখিল করা উচিত।
বিবিসিকে দেয়া এক সাক্ষাত্কারে তিনি বলেন, ‘রায় বেরুনোর পরেই কয়েকটি বিষয়ে ত্রুটি আছে বলে আমার মনে হয়েছিল। সেজন্যই আমি মনে করছি যে, রিভিউ হওয়া উচিত। একটা কারণ হলো, এক নম্বর বাদী- ভগবান রামলালার মূর্তি, যেটি ১৯৪৯ সালে মসজিদের ভেতরে বসানো হয়েছিল, সেটি বেআইনি ছিল বলে জানিয়েছে কোর্ট। যে মূর্তিটি বেআইনিভাবে বসানো হয়েছিল বলে শীর্ষ আদালতই জানাল, সেটিকেই জমির অধিকার দেওয়া হলো!’ এই আইনজীবী আরও বলেন, ‘এছাড়া, আদালত তো এটাও স্বীকার করেছে যে, অন্তত ১৮৫৭ সাল থেকে ১৯৪৯ অবধি সেখানে নামাজ পড়া হত। তার অর্থ, ওই সময়কালে মুসলিমদের দখলে ছিল ওই জমিটি! এই দুটো বৈপরীত্য কিছুতেই বোধগম্য হচ্ছে না আমার।’ ‘ভারতের মুসলমানরা সুবিচার পায়নি’: অল ইন্ডিয়া মুসলিম পার্সোনাল ল বোর্ডের সদস্য জাফরিয়াব জিলানি বলেন, বাবরি মসজিদ মামলায় সুপ্রিম কোর্টের রায়ে ‘ভারতের মুসলমানরা সুবিচার পায়নি’। বিবিসি বলছে, রিভিউর আবেদন জানানোর দাবি মুসলিম সমাজের একটা বড় অংশ থেকেই উঠছে। কারণ গত এক সপ্তাহে রায়ের যা যা বিশ্লেষণ প্রকাশিত হয়েছে নানা সংবাদমাধ্যমে, তার পরে মুসলমান সমাজের অনেকেই এখন মনে করছেন যে, রায়ের মধ্যে বেশ কিছু প্রশ্ন থেকে গেছে। যে কারণে রিভিউর আবেদন দাখিল করাই উচিত। পশ্চিমবঙ্গ সংখ্যালঘু যুব ফেডারেশনের নেতা মুহম্মদ কামরুজ্জামানের কথায়, ‘গত কয়েকদিনে সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি থেকে শুরু করে আইন বিশেষজ্ঞরা রায়ের যেসব বিশ্লেষণ দিয়েছেন, তা থেকে দেশের ধর্মনিরপেক্ষ এবং ধর্মপ্রাণ মুসলিমদের মনে হতে শুরু করেছে যে, এই রায়ে মুসলমানরা সুবিচার পায়নি, বে-ইনসাফি হয়েছে তাদের সঙ্গে।’ তিনি আরও বলেন, ‘সেজন্যই ইন্ডিয়ার মহামান্য আদালতের কাছেই আবারও পুনর্মূল্যায়নের আবেদন জানানোর দাবি সমাজের ভেতর থেকে স্বাভাবিকভাবেই উঠছে।’ একদিকে যেমন রিভিউয়ের দাবি উঠছে, তেমনই মুসলমানদের অনেকেই বলছেন, বাবরি মসজিদ যেখানে ছিল, তারা সেই জমিটির অধিকার চেয়েছিলেন তারা, অন্য কোথাও জমি তো চাননি। তাই পাঁচ একর বিকল্প জমি দেওয়ার আদেশ নিয়েও মুসলমান সমাজের মধ্যে থেকেই প্রশ্ন উঠছে। ইন্ডিয়ান মুসলমানদের বৃহত্তম সংগঠন জামিয়তে উলেমা-এ-হিন্দ বলছে, অর্থ অথবা ‘বিকল্প জমি’ মসজিদের জমির বিকল্প হতে পারে না। জমিয়তের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও পশ্চিমবঙ্গের মন্ত্রী মওলানা সিদ্দিকুল্লা চৌধুরী বলেন, ‘মুসলমানরা তো আদালতের কাছে নির্দিষ্ট ওই জমিটি, যেখানে বাবরি মসজিদ ছিল, সেটার অধিকার চেয়েছিল। সম্পত্তির ভিক্ষা তো মুসলমানরা করেনি।’ তিনি আরও বলেন, ‘জমিয়তে উলেমা-এ হিন্দ সেজন্যই বলেছে যে, পাঁচ একর জমি তো আমরাই ভিক্ষা করে কিনতে পারি। ওই জমি পেয়ে আমরা তাই যে খুব খুশি তা নয়।’

