ইন্দোর টেস্টের আয়নায় বাংলাদেশের ক্রিকেট
উত্তরদক্ষিণ অনলাইন । ১৭ নভেম্বর ২০১৯ । আপডেট ১০:১২
১৯ বছরে কতটা এগিয়েছে দেশের ক্রিকেট? টেস্টের প্রতি ক্রিকেটারদের নিবেদন কতখানি। আগ্রহভরে কি খেলেন প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট, কতটা উন্মুখ তারা নিজেদের মেলে ধরতে। ইন্দোর টেস্টে মুমিনুল হকের দলের যাচ্ছেতাই পারফরম্যান্সে এমন নানা প্রশ্ন উঠে আসছে। জাগছে মান নিয়ে প্রশ্ন। ১৯ বছর পরও যে সেই শুরুর সময়ের বাংলাদেশেরই দেখা মিলল।
২০০০ সালের নভেম্বরে ঢাকায় ভারতের বিপক্ষে অভিষেক টেস্ট খেলেছিল বাংলাদেশ। ১৯ বছর পেরিয়ে আরেক নভেম্বরে ইন্দোরে তারা খেলল ভুলের কাঁটায় সাজানো এক টেস্ট। প্রতিপক্ষ সেই ভারত। পারফরম্যান্সও যেন অনেকটা একইরকম, বিবর্ণ।
প্রধান কোচ রাসেল ডমিঙ্গো স্বীকার করলেন, টেস্টের আদর্শ প্রস্তুতির জন্য খুব বেশি সময় পাননি তারা। তিন পেসার যে খেলানো প্রয়োজন ছিল, সেটাও মেনে নিলেন। অধিনায়ক মুমিনুল মনে করেন, টস জিতে ব্যাট করা ছিল ভুল সিদ্ধান্ত। সীমাহীন ভুল করে যাওয়া ম্যাচে হারের ব্যবধানটাও অনেক বড়, ইনিংস ও ১৩০ রান।
প্রথম টেস্টের প্রস্তুতির জন্য স্রেফ দুটি অনুশীলন সেশন পায় বাংলাদেশ। সেটাও যথাযথ কাজে লাগাতে পারেনি তারা। এগোয় ভুল পরিকল্পনা নিয়ে। রবিচন্দ্রন অশ্বিন ও রবীন্দ্র জাদেজাকে মূল হুমকি ধরে নেটে অনুশীলন করে। পেস বোলারদের যে একেবারে খেলেনি তা নয়, তবে মূল মনোযোগ ছিল স্পিন সামলানোর দিকে। ম্যাচের আগে মোহাম্মদ মিঠুন বলেছিলেন, স্পিনকে মূল হুমকি ধরেই প্রস্তুতি নিচ্ছেন তারা।

সাকিব আল হাসানের অনুপস্থিতিতেও টেস্টে স্পিনই বাংলাদেশের বোলিংয়ের শক্তি। স্বাভাবিকভাবেই ভারত স্পিন সহায়ক উইকেট বানিয়ে নিজেদের বিপদ ডেকে আনতে চাইবে না। স্পিন উইকেট পেলে বাংলাদেশ কি করতে পারে, দিল্লিতেই তা টের পেয়েছে স্বাগতিকরা।
তারপরও বাংলাদেশ ধরে নিল, ভারত হাঁটবে তাদের চিরচেনা পথে। অতীতের মতো ফাঁদ পাতবে স্পিনে। আর সেটাই বড় ভুল বাংলাদেশের। হলকার স্টেডিয়ামের উইকেটে ছিল সবুজ ঘাসের ছোঁয়া, পেসারদের জন্য দারুণ সহায়তা। আর এতে মাঠে নামার আগেই যেন অনেক খানি পিছিয়ে পড়েছিল বাংলাদেশ।
এই তো, কদিন আগের ভারত টেস্ট দলে ভালোমতো নজর দিলেও তো এমন ভুল করার কথা না। সবশেষ সিরিজে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে দারুণ সফল ছিলেন ভারতীয় পেসাররা। তারা কতটা হুমকি হতে পারেন সেই হোম ওয়ার্ক হয়তো করেনি বাংলাদেশ। ম্যাচে তাদের যাচ্ছেতাই পারফরম্যান্স আর ফল সেটাই প্রমাণ করে।
ঢাকায় দুটি টি-টোয়েন্টি প্রস্তুতি ম্যাচ খেলেছিল তারা। কিন্তু টেস্ট দলের জন্য দেশে কিংবা ভারতে ছিল না কোনো প্রস্তুতি ম্যাচ। অথচ ভারতে দুটি টেস্টে তাদের চ্যালেঞ্জ ভিন্ন রংয়ের বলে খেলার। স্বাভাবিকভাবে ঘাটতি থেকে গেছে প্রস্তুতিতে।
বাংলাদেশের থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ভেবেছিল প্রথম টেস্টে প্রথাগত ভারতীয় উইকেট পাওয়া যাবে। প্রথম দুই দিন দাপট দেখাবেন ব্য্যাটসম্যানরা, এরপর ধীরে ধীরে স্পিনারদের জন্য বাড়বে সহায়তা। তাই স্পিন পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিয়েছিল বাংলাদেশ। ম্যাচের গল্প পুরো ভিন্ন; তাদের ভোগালেন তিন পেসার মোহাম্মদ শামি, উমেশ যাদব ও ইশান্ত শর্মা।
একাদশ নির্বাচনেও ভুল করে বাংলাদেশ। যে উইকেটে চার পেসার নিয়ে নেমে যাওয়াটাও অস্বাভাবিক হতো না সেখানে সফরকারীরা খেলল কেবল দুই পেসার নিয়ে, সঙ্গে দুই স্পিনার। ভারতের ব্যাটসম্যানদের যা একটু ভুগতে দেখা গেল ওই আবু জায়েদ চৌধুরী ও ইবাদত হোসেনের বলে।
প্রবলভাবে তৃতীয় পেসারের অভাব অনুভব করেছে বাংলাদেশ। দ্বিতীয় দিনের খেলা শেষে প্রধান কোচ ডমিঙ্গো জানান, তৃতীয় একজনর পেসার খেলানোর চিন্তা করলেও দলের সঠিক ভারসাম্য রাখতে গিয়ে খেলাতে পারেননি।

টিম ম্যানেজমেন্টের আরেক ট্যাকটিক্যাল ভুল, দলের সবচেয়ে অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যান মুশফিকুর রহিমকে চারে না খেলানো। কিপিং না করায় প্রায় সবাই তাকে চারে আশা করেছিলেন। কিন্তু মোহাম্মদ মিঠুনকে চারে খেলিয়ে পাঁচে মুশফিককে খেলানো হয়। মিঠুন দুই ইনিংসেই চরম ব্যর্থ।
দুই দলের স্কিলের পার্থক্য দিন-রাতের মতো পরিষ্কার। ব্যাটিং-বোলিংয়ে যোজন যোজন পিছিয়ে বাংলাদেশ। ফিল্ডিংয়ে ভারতের চেয়ে ভালো করেছে তারা। তবে বেশি মাশুল দিতে হয়েছে তাদেরই। প্রথম ইনিংসে একবার করে জীবন পান মুমিনুল ও মাহমুদউল্লাহ, তিনবার মুশিফক। তাতে কী? সুযোগ যে কেউই কাজে লাগাতে পারেননি। দ্বিতীয় ইনিংসে ৪ রানে জীবন পাওয়া এই কিপার-ব্যাটসম্যান খেলেন পঞ্চাশছোঁয়া ইনিংস। অন্যদিকে, ৩২ রানে জীবন পাওয়ার পর দারুণ ব্যাটিংয়ে মায়াঙ্ক আগারওয়াল তুলে নেন ডাবল সেঞ্চুরি।
স্কিলের ঘাটতি মনোবল আর চোয়ালবদ্ধ প্রতিজ্ঞা দিয়ে অনেকটাই কাটানো সম্ভব ছিল। ব্যাটসম্যানরা অন্তত দেখাতে পারতেন লড়াইয়ের মানসিকতা। এর কোনোটাই করতে পারেনি তারা।
তৃতীয় দিনের শুরুতে সুনীল গাভাস্কার বলেছিলেন, “এখানে লড়াই করে টিকে থাকার মানসিক শক্তি বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের আছে কি না। যদি সেখানে তারা উন্নতি করতে না পারে, ম্যাচ শেষ হতে পারে আজ বিকেলেই।” ঠিক তাই হয়েছে। বাংলাদেশ যখন গুটিয়ে যায় তখনও দিনের খেলা বাকি ছিল প্রায় ২০ ওভার।
ইন্দোর টেস্ট যেন হয়ে উঠেছিল বাংলাদেশের জন্য আয়না। নিজেদের টেস্ট ক্রিকেট কোথায় দাঁড়িয়ে, এর পরিষ্কার একটা চিত্রের দেখা মিলল। যা দেখে স্বাভাবিকভাবেই খুশি হতে পারেননি কোচ ও অধিনায়ক। ঘুরে দাঁড়াতে টেস্ট দলের কাঠামোতে পরিবর্তন আনার কথা বলেছেন ডমিঙ্গো। কোচের সঙ্গে একমত অধিনায়ক।
দ্বিতীয় টেস্ট শুরু হবে আগামী শুক্রবার, কলকাতায়। প্রথমবারের মতো দিবা-রাত্রির টেস্ট খেলবে বাংলাদেশ। সঙ্গে গোলাপি বলের চ্যালেঞ্জ। প্রথম টেস্টে বিশাল ব্যবধানে হারের ধাক্কা সইয়ে নিতে হবে নতুন শুরুর প্রস্তুতি। তবে তার আগে মনোবল ভেঙে যাওয়া দলের উজ্জীবিত হয়ে ওঠাই এখন প্রথম কাজ।
টেকনিক্যাল ও টেকটিক্যাল অসংখ্য ভুল সংশোধনের জন্য যে সময়টা বড্ড কম।

