পরিবহন ধর্মঘটে ভোগান্তিতে দেশবাসী
উত্তরদক্ষিণ মুদ্রতি সংস্করন । ২১ নভেম্বর ২০১৯ । প্রকাশ ০০:০১। আপডেট ১০:৩২
শ্রমিকদের পক্ষে ২ সাবেক মন্ত্রী, সরকারও কঠোর অবস্থানে
ধর্মঘটের কারণে বিপাকে পড়েছেন দেশের সাধারণ মানুষ। নতুন সড়ক পরিবহন আইন কার্যকর ও বাস্তবায়নকে কেন্দ্র করে দেশে পরিবহন শ্রমিকদের একাংশ যে ধর্মঘট শুরু করেছে। সূত্র বলছে, তাতে পেছন থেকে সমর্থন যোগাচ্ছেন বর্তমান ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ সরকারেরই দুই সাবেক মন্ত্রী। অন্যদিকে এই আইন স্থগিত রাখার দাবি নাকচ করে দিয়ে সরকারও অনড় অবস্থান নিয়েছে। নতুন সড়ক পরিবহন আইনের বিরুদ্ধে শেরপুর, ময়মনসিংহ, খুলনা, বরিশাল, পিরোজপুরসহ ১০টির বেশি জেলায় বাস মালিক শ্রমিকরা কোন আগাম ঘোষণা ছাড়াই বাস চলাচল বন্ধ করে রেখেছেন দুইদিন ধরে। কোনো কোনো অঞ্চলে এই ধর্মঘট গতকাল বুধবার তৃতীয়দিনের মতো অব্যাহত ছিল। গণপরিবহন শ্রমিকদের পাশাপাশি বুধবার থেকে পণ্যবাহী ট্রাক এবং কাভার্ডভ্যান মালিক শ্রমিক ঐক্য পরিষদও দেশব্যাপী অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি শুরু করেছে। গতকাল বুধবার রাজধানীতেও গণপরিবহণ চলচল ছিল একেবারেই নগণ্য। পণ্যবাহী ট্রাক এবং কাভার্ডভ্যান মালিক শ্রমিক ঐক্য পরিষদের সদস্য সচিব তাজুল ইসলাম বলছিলেন, নতুন আইনে জেল জরিমানা অনেক বেশি হওয়ায় তারা এর বিরোধিতা করছেন। বাংলাদেশে সড়ক পরিবহন শ্রমিক ও মালিকদের প্রধান দু’টি সংগঠনের দু’জন শীর্ষ নেতা শাজাহান খান এবং মসিউর রহমান রাঙ্গাঁ। তারা দুজনেই আওয়ামী লীগের জোট সরকারের মন্ত্রী এবং বর্তমানে তারা দু’জনই এমপি। শাজাহান খান আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা ও পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের কার্যকরী সভাপতি। মসিউর রহমান রাঙ্গাঁ জাতীয় পার্টির মহাসচিব এবং পরিবহন মালিক সমিতির সভাপতি। দুজনেই নানা কারণে বেশ বিতর্কিত। তারা ব্রিটিশ গণমাধ্যম বিবিসিকে জানিয়েছেন, শ্রমিকদের দাবিকে তারা সমর্থন করেন। শাজাহান খান বলেছেন, সরকারের গঠিত কমিটিতে তারা আইনটিতে বিভিন্ন অপরাধের ব্যাপারে জরিমানা কমানোসহ বেশ কিছু সংশোধনী প্রস্তাব করেছিলেন। সেই আলোচনা যখন চলছে তার মধ্যেই আইনটি কার্যকর করা হয়েছে। “একজন ড্রাইভারকে যদি ৫ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়, তারপক্ষে সেই টাকা দেয়া সম্ভব নয়। চালককে ৮ম শ্রেণী এবং তার সহকারীকে পঞ্চম শ্রেণী পাস হতে হবে। এখন একজন দীর্ঘদিন সহকারীর কাজ করে তারপর চালক হলে সে ৮ম শ্রেণীর সার্টিফিকেট কোথায় পাবে? এটা শিথিল করার কথা আমরা বলেছি। এগুলোসহ আরও কিছু বিষয়ে সংশোধনীর প্রস্তাব আমরা দিয়েছি।” নিরাপদ সড়কের দাবিতে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে আইনটি সংসদে উত্থাপন করা হয়েছিল এক বছরেরও বেশি সময় আগে। এতদিন পর তা কার্যকর করা হলে বাস-ট্রাকের মালিক-শ্রমিকরা যানবাহন বন্ধ করে দিয়ে কেন সংকট তৈরি করছেন- এমন প্রশ্ন তুলেছে যাত্রীদের অধিকার নিয়ে আন্দোলনকারী সংগঠনগুলো। যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্য অনুযায়ী দেশে ৭০ লাখের মতো বাস-ট্রাক চালকের মধ্যে প্রায় ৫০ লাখের নিবন্ধন বা লাইসেন্স নেই। আর ৬০ শতাংশ বাস, মিনিবাসের ফিটনেস নেই। এসব সমস্যার জন্য নতুন আইনে বড় অংকের জরিমানা গুণতে হবে। এটি একটি ভীতি তৈরি করেছে এবং মূলত এই কারণেই মালিক-শ্রমিকরা বিভিন্ন জেলায় বাস চলাচল বন্ধ রেখেছেন মনে করছেন যাত্রী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোজাম্মেল হক চৌধুরী। ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলনের পরিচালক ফারিহা ফতেহ বলেন, কথায় কথায় যানবাহন বন্ধ না করে মানুষকে দুর্ভোগে না ফেলে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা উচিত ছিল। ‘আপনি আইন ভঙ্গ করবেন, এটার জন্য আপনাকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা যাবে না, এটাওতো ঠিক না। কোনও সুনির্দিষ্ট বিষয়ে আপত্তি থাকলে আপনারা সরকারের সাথে বসেন, আলোচনা করেন। কিন্তু এভাবে যানবাহন বন্ধ করে দিয়ে দেশের বিপদ ডেকে আনলাম, মানুষকে দুর্ভোগে ফেললাম-এটা ঠিক নয়।’ তবে বিভিন্ন সময় সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে স্বার্থ আদায়ের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সরকার দলীয় এমপি শাজাহান খান। তিনি বলেন, পরিবহন শ্রমিক-মালিকরা সাধারণ মানুষকে জিম্মি করছে না। তারা আলোচনার মাধ্যমেই সমস্যার সমাধান করবেন বলে তিনি উল্লেখ করেছেন। ‘মানুষকে জিম্মি করার অভিযোগ সঠিক নয়। শ্রমিকরা তাদের সমস্যা তুলে ধরে। কোন সমাধান না হলে তখন গিয়ে আন্দোলনের প্রশ্ন আসে।’
ধর্মঘটকে ‘কর্মবিরতি’ বলছেন পরিবহন শ্রমিকেরা: পরিবহন শ্রমিকদের আকস্মিক কর্মবিরতিতে যাত্রী নামের দেশবাসীর ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে গত তিনদিনে। পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা তাদের আন্দোলনকে কখনো তারা ধর্মঘট, আবারো কখনো ভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে সেটিকে ‘কর্মবিরতি’ হিসেবে বর্ণনা করেন। নতুন সড়ক পরিবহন আইন সংস্কারের দাবিতে গত তিনদিন ধরে পরিবহন শ্রমিকরা যা করছে, সেটিকে তারা ‘কর্মবিরতি’ হিসেবে বর্ণনা করছেন। শ্রম আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘কর্মবিরতি’ শব্দটি ব্যবহারের মাধ্যমে পরিবহন শ্রমিকরা দেখাতে চাইছেন যে বিষয়টিতে সংগঠনের কোনও দায় নেই। এটা শ্রমিকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে পালন করছে বলে তারা দেখাচ্ছেন। শ্রম আইন বিশেষজ্ঞ এবং বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী উত্তম কুমার দাশ বলেন, বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী ‘ধর্মঘটের’ বিষয়টি মালিক-পক্ষ এবং শ্রমিক-পক্ষের বিষয়। কিন্তু পরিবহন খাতে উভয় পক্ষের স্বার্থ এক হয়ে গেছে। তিনি বলেন, এখানে শ্রমিকদের দাবি সরকারের কাছে। সেজন্য তারা ‘ধর্মঘটের’ পরিবর্তে ‘কর্মবিরতি’ শব্দটি ব্যবহার করছে। “আইন নিয়ে তাদের যদি কোন ক্ষোভ থাকে, তাহলে বিষয়টি তারা আদালতে চ্যালেঞ্জ করতে পারে। কিন্তু কোনভাবেই জনজীবন বিপর্যস্ত করে কর্মবিরতিতে যেতে পারে না।” তাছাড়া বাস-ট্রাক শ্রমিকরা যেভাবে বিভিন্ন স্থানে যানবাহন চলাচলে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে সেটি দেশের আইন অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য বলে উল্লেখ করেন বিশ্লেষকরা। দেশের আইন অনুযায়ী ধর্মঘট ডাকতে পারে স্বীকৃত শ্রমিক সংগঠন। তাদের যদি কোনও দাবি থাকে তাহলে বিষয়টি নিয়ে প্রথমে আলোচনা করতে হবে মালিক পক্ষের সাথে। মালিক-পক্ষ বিষয়টি সুরাহা না করলে তখন তারা বিষয়টি নিয়ে যাবে শ্রম অধিদপ্তরে। সেখানে মালিক এবং শ্রমিক- উভয়পক্ষের সাথে আলোচনার মাধ্যমে মধ্যস্থতার চেষ্টা করা হবে। যদি শ্রম অধিদপ্তরের মধ্যস্থতায় যদি মালিক এবং শ্রমিক-পক্ষ একমত না হয় তখন আইন অনুযায়ী দুটো রাস্তা খোলা থাকে। আইনজীবী উত্তম কুমার দাশ বলেন, বিষয়টি নিয়ে শ্রমিক-পক্ষ তখন আদালতে যেতে পারে কিংবা তারা ধর্মঘট পালন করতে পারে। কিন্তু চাইলেই তারা আকস্মিকভাবে ধর্মঘটে যেতে পারে না। পরিবহন শ্রমিকরা বলছেন, তারা কোনও বেআইনি কাজ করছেন না। বাংলাদেশ ট্রাক-কাভার্ড মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদের সদস্য সচিব তাজুল ইসলাম বলেন, চলমান কর্মবিরতিতে দেশের কোন আইন ভঙ্গ হয়নি। তিনি দাবি করেন দেশের কোথাও পরিবহন শ্রমিকরা যান চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে না। যদিও গতকাল রাজধানীর পবেশ পথ যাত্রাবাড়ী, সাইনবোর্ড এলাকাসহ বিভিন্ন সড়কে শ্রমিক নামে সঙ্ঘবদ্ধ সন্ত্রাসীরা স্বেচ্ছায় যারা গাড়ি নিয়ে সড়কে নেমেছেন, সেই সব চালকদের হেনস্থা করেছেন, যাত্রীদের হেনস্থা করেছেন এমনকি প্রাইভেট গাড়িতে কালি মেখে দেয়ার মতো ঘটনাও ঘটিয়েছে। যা নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু আইনকৃঙ্খলা বাহিনী অপরাধীদের এ পর্যন্ত আইনের আওতায় আনতে পারেনি বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।

