অটিস্টিক এরিককে নিয়ে টানা-টানি হায়রে রাজনীতি!
উত্তরদক্ষিণ মুদ্রতি সংস্করন । ২৫ নভেম্বর ২০১৯ । প্রকাশ ০০:০১। আপডেট ১০:৩২
এনামুল হক : প্রয়াত জেনারেল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদপুত্র এরিককে নিয়ে বিতর্কটা বেশ ক’দিন ধরে চলছে। দেশে পেঁয়াজের আকাশছোঁয়া মূল্য, চালের মূল্য বৃদ্ধি, লবন নিয়ে গুজব, চলমান দুর্নীতিবিরোধী শুদ্ধি অভিযান এবং আওয়ামী লীগের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর জাতীয় সম্মেলনের কারণে বিষয়টি গণমাধ্যমে খুব বেশি আলোচনায় আসেনি। কিন্তু বিষয়টি আপতদৃষ্টিতে মীমাংসার লক্ষণ নেই। বরং কথার আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণ, জিডির বিরুদ্ধে জিডি আর মামলার হুমকি ধমকি চলছেই। এর মধ্যে বিষয়টিকে নিজের প্রভাব বৃদ্ধির প্রেক্ষিতে স্রেফ শত্রুতা হিসেবে ব্যাখ্যা দেয়ার চেষ্টা করেছেন এরশাদের ছোট ভাই ও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের। সন্তান এরিককে দেখভালের জন্য এরশাদের গড়ে যাওয়া ট্রাস্টি বোর্ডের অন্যতম সদস্য ও ভাপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান এবং তারই ভাতিজা সাবেক সেনা কর্মকর্তা খালেদ আকতারের ভূমিকাও প্রত্যাশিত নয়। তিনি ছোট চাচা জিএম কাদেরের সুরেই কথা বলছেন। অবশ্য খালেদ জাতীয় পার্টিরও প্রেসিডিয়াম সদস্য। ফলে তার ভূমিকা যে চেয়ারম্যানের পক্ষে হবে- সেটাই স্বাভাবিক। অভিযোগ উঠেছে, এরশাদপুত্র মানসিক প্রতিবন্ধী এরিককে মেরে ফেলতে পারলে সম্পদের পুরোটাই ওই চাচা-ভাতিজারাই লুটে-পুটে খেতে পারবেন। তাই এরিককে নির্যাতনের অভিযোগ করা হয়েছে ট্রাস্টি বোর্ড ও জাপা চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে। যদিও তারা অভিযোগ অস্বীকার করছেন। বরং এরিকের নিরাপত্তার জন্য উল্টো তার মা বিদিশাকে হুমকি হিসেবে দেখছেন জিএম কাদের ও খালেদ আকতার- এই দুই চাচা-ভাতিজা। বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক মহলে ও বিশ্লেষকদের মধ্যে কৌতূহল সৃষ্টি হয়েছে। তারা বলছেন, এরশাদ তার দ্বিতীয় স্ত্রী বিদিশাকে ডিভোর্স দিয়েছিলেন। আদালতের আদেশে এরিককে এরশাদ তার জীবদ্দশায় নিজের কাছে রেখেছেন। মা বিদিশা মাঝে মাঝে সন্তানকে দেখতে আসতেন। এরশাদের মৃত্যুর পর ছেলে এরিকের কাছে মা বিদিশার থাকাটা স্বাভাবিক। যদি এরিক মানসিক অসুস্থ না হতেন, এ নিয়ে কারো কোনো কথা বলারই সুযোগ ছিল না। কিন্তু ছেলেটি মানসিক ভারসাম্যহীন হওয়ায় এ নিয়ে তার চাচা জিএম কাদেরসহ পরিবারের অন্যরা জটিলতা সৃষ্টির সুযোগ গ্রহণ করছেন। মানবিক দিক থেকে এটি মোটেই সমর্থনযোগ্য নয়। বরং এরিককে নিয়ে যারা নানা বিতর্কের সৃষ্টি করছেন, তারা ছোট মনের পরিচয় দিচ্ছেন। এর পেছনে তাদের সম্পদের মোহ থাকা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু যারা রাজনীতি করেন, জাতীয় রাজনীতিতে নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তাদের এত ছোট মনের পরিচয় দেয়া একেবারেই বেমানান। যারা একজন অসুস্থ মানুষের সম্পদের লোভে নানা কৌশল অবলম্বন করেন-তাদের হাতে দেশের সম্পদ, রাষ্ট্র কতটা নিরাপদ থাকবে- সে প্রশ্নও জনমনে তৈরি হতে পারে। কাজেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মনোভাব পরিবর্তন জরুরি। বিশ্লেষকরা আরও বলছেন, বিদিশা কেন এরিককে দিয়ে তার চাচার বিরুদ্ধে জিডি করাতে যাবেন। এই বিদিশা তো এরশাদের মৃত্যুর পর তার লাশ দাফন, দলের চেয়ারম্যান পদ ইস্যুতে জিএম কাদেরকেই সমর্থন দিয়েছিলেন।যেখানে কাদেরের সঙ্গে এরশাদের প্রথম স্ত্রী রওশনের সাপে-নেউলে সম্পর্ক ছিল। এরিক প্রশ্নে কেন কাদেরের বিরুদ্ধে যাবেন বিদিশা, নিশ্চয়ই এর পেছনে বড় কারণ আছে। জিএম কাদের নিজেকে ‘প্রভাবশালী’ ব্যক্তি দাবি করায় সেই সন্দেহ আরও প্রকট হয় বৈকি! প্রশ্ন হলো যিনি এতদিন তার পক্ষে ছিলেন সেই বিদিশা কেন ‘প্রভাবশালীর’ বিরুদ্ধে গেলেন? মানুষের মনে এ প্রশ্ন উঠাও যৌক্তিক নয় যে, জিএম কাদের নিজের প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে ভাই এরশাদের অবর্তমানে তার সম্পদ ভোগ-দখল করতে চাচ্ছেন। যেমনটি অভিযোগ করেছেন জিএম কাদেরের ভাবি বিদিশা। সেক্ষেত্রে ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য, দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও নিজের ভাতিজা খালেদকে পক্ষে রাখছেন তিনি- এমন অভিযোগ আসাটাও অযৌক্তিক নয়। সুতরাং রাজনৈতিক ও মানবিক দিক বিবেচনায় এরিকের কাছে তার মা বিদিশাকে থাকার সুযোগ করে দেয়াটাই সংশ্লিষ্টদের বুদ্ধিমানের কাজ হবে। অন্যথায় বিদিশা ও এরিক নিরুপায় হয়ে উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হলে সঙ্গতকারণেই মা-ছেলের একসঙ্গে থাকার পক্ষে অনুমতি পাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। সেখানে এসব রাজনীতিবিদদের আসল মুখোঁশ খুলে পড়ার আশঙ্কাও উঁড়িয়ে দেয়া যায় না। কাজেই সময় থাকতে এসব নেতারা শুভবুদ্ধির পরিচয় দিবেন- সেটাই প্রত্যাশা করছেন অনেকে।
জিএম কাদেরকে ‘বাধা’ বলছেন বিদিশা, অপরপক্ষে মামলার হুমকি:
জাতীয় পার্টির প্রয়াত চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের অটিস্টিক সন্তান শাহতা জারাব এরিককে দেখভালের ক্ষেত্রে তার চাচা ও দলের বর্তমান চেয়ারম্যান জি এম কাদেরকে মূল বাধা বলছেন বিদিশা এরশাদ। গত শুক্রবার বিকালে রাজধানীর বারিধারায় এরশাদের বাড়ি প্রেসিডেন্ট পার্কে ছেলে এরিককে নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে আসেন বিদিশা। তার অবর্তমানে এরিকের ঠিকমতো দেখাশোনা না হওয়ার অভিযোগ করে বিদিশা বলেন, “মূল বাধা হচ্ছে ওর চাচা (জি এম কাদের)। পয়েন্টটা হল এরিকের সহায় সম্পত্তি। এরিক না, এরিকের প্রতি কারও কোনো ইন্টারেস্ট নাই। যদি এরিকের প্রতি ইন্টারেস্ট থাকত, তাহলে ওভাবেই দেখাশোনা করা হত। নেগলেক্ট করা হত না অ্যাটলিস্ট।” তার এই অভিযোগের পর বিদিশা এরশাদের বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করার হুমকি দিয়েছেন জিএম কাদের। অবশ্য গতকাল রোববার রাতে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত মামলার খবর মেলেনি। তবে এদিন জিএম কাদের সংবাদ সম্মেলন করে নিজের প্রভাব বৃদ্ধির জন্য তার শত্রুতাও বেড়ে গেছে বলে দাবি করেন। আর এর আগের দিন শনিবার ভাতিজা মেজর (অব.) খালেদ আকতারকে দিয়ে থানায় জিডি করানো হয়েছে। যেখানে অভিযোগ করা হয়েছে, বিদিশা অবৈধভাবে প্রেসিডেন্ট পার্কে আছেন। তিনিই নাকি এরিকের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করছেন- জিডিতে এমন দাবিও করেছেন ট্রাস্টি বোর্ডের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান খালেদ আকতার।

