দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির রায়

দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির রায়

উত্তরদক্ষিণ মুদ্রতি সংস্করন । ০২ ডিসেম্বর ২০১৯ । প্রকাশ ০০:০১। আপডেট ১০:৪৪

সড়কে দুই শিক্ষার্থী মৃত্যুর ঘটনায় মামলা দুই চালকসহ তিনজনের যাবজ্জীবন, চালকদের খামখেয়ালিতে ‘বাসচাপা’থেকে শিক্ষার্থীদের রেহাই মিলছে না

রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে বাসচাপায় রমিজউদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনায় জাবালে নূর পরিবহনের দুই চালক ও একজন সহকারীসহ তিনজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছে আদালত। একই মামলায় অপরাধ প্রমাণিত না হওয়ায় খালাস পেয়েছেন এক বাসের মালিকসহ দু’জন আসামি। বাংলাদেশকে নাড়িয়ে দেওয়া সেই দুর্ঘটনার দেড় বছরের মাথায় গতকাল রোববার (১ ডিসেম্বর) ঢাকার মহানগর দায়রা জজ কে এম ইমরুল কায়েশ ওই মামলার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির রায় ঘোষণা করেন। দণ্ডবিধির ৩০৪ ধারায় ‘অপরাধজনক নরহত্যার’ দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে দুই বাস চালক মাসুম বিল্লাহ ও জুবায়ের সুমন এবং হেলপার কাজী আসাদকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। একইসঙ্গে তিন আসামিকে ৫০ হাজার টাকা করে প্রত্যেককে জরিমানা করেন আদালত। জরিমানা অনাদায়ে আরও ৬ মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয় আসামিদের। দণ্ডবিধির ৩০৪ ধারায় এটাই সর্বোচ্চ সাজা। তাছাড়া সড়ক দুর্ঘটনায় এটি একটি দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হিসেবে দেখছেন আইনজ্ঞরা। দণ্ডিত এই তিন আসামির মধ্যে পলাতক কাজী আসাদ বাদে বাকি দুজন রায়ের সময় আদালতে উপস্থিত ছিলেন। জাবালে নূরের একটি বাসের মালিক জাহাঙ্গীর আলম ও হেলপার এনায়েত হোসেনকে বেকসুর খালাস দেওয়া হয়েছে রায়ে। জাবালে নূরের আরেক বাসের মালিক শাহাদাত হোসেনের বিরুদ্ধে মামলার কার্যক্রম উচ্চ আদালতের নির্দেশে স্থগিত রয়েছে। আদালতের পর্যবেক্ষণ: বিচারক মামলার রায়ের পর্যবেক্ষণে বলেছেন, ‘বর্তমানে চালকদের খামখেয়ালির কারণে অনেক ছাত্রছাত্রী বাসের চাপা থেকে রেহাই পাচ্ছে না। ড্রাইভার, মালিক ও পুলিশ বাহিনী আরও সতর্ক থাকা দরকার। বিশেষ করে ট্রাফিক পুলিশকে বেশি লক্ষ্য রাখতে হবে।’ বিচারক বলেন, ‘মালিক পক্ষদের লক্ষ্য রাখতে হবে যেন দক্ষ বাসচালকদের বাস চালানোয় নিয়োগ দেওয়া হয়। হালকা যানের লাইসেন্সধারীদের কোনোভাবেই যেন ভারী যানচালক হিসেবে নিয়োগ না দেওয়া হয়।’ ঢাকা মহানগর দায়রা জজ কে এম ইমরুল কায়েশ আলোচিত মামলাটির রায় ঘোষণার আগে পর্যবেক্ষণে এসব কথা বলেন।  চালক মাসুম বিল্লাহর বাসটি গত বছরের ২৯ জুলাই ঢাকার বিমানবন্দর সড়কে শিক্ষার্থী ও পথচারীদের উপরে উঠে গিয়েছিল। তাতে নিহত হয় শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের শিক্ষার্থী দিয়া খানম মিম ও আবদুল করিম রাজীব; আহত হয় আরও কয়েকজন। ওই বাসটির মালিক শাহাদাত। মিম ও করিমের মৃত্যুর পর শিক্ষার্থীদের নজিরবিহীন আন্দোলনে এক সপ্তাহ অচল ছিল ঢাকার সড়ক, আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন জেলায়। শিক্ষার্থীদের সব দাবি পূরণের আশ্বাস দিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করতে হয় সরকারকে। শিক্ষার্থীদের দাবিতেই সংসদে পাস হয় দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা সড়ক পরিবহন আইন, যা গত ১ নভেম্বর থেকে কার্যকর হয়েছে। দুর্ঘটনার দিনই ক্যান্টনমেন্ট থানায় মামলা করেন নিহত মিমের বাবা দূর পাল্লার বাসের চালক জাহাঙ্গীর আলম। ওই বছরের ৬ সেপ্টেম্বর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা (আইও) গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) পরিদর্শক কাজী শরিফুল ইসলাম আদালতে অভিযোগপত্র দেন।

সেখানে বলা হয়, কালশী ফ্লাইওভার থেকে নামার মুখে জাবালে নূরের দুটি বাস পাল্লা দেওয়ার সময় একটি এমইএস বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়ানো শিক্ষার্থীদের উপর উঠে যায়। চালক মাসুম বিল্লাহ গাড়ি চালাচ্ছিলেন বেপরোয়া গতিতে।যাত্রীরা সাবধান করলেও তাদের কথা তিনি কানে তোলেননি। তদন্তে জানা যায়, জাহাঙ্গীরের বাসের ফিটনেসের মেয়াদ দুই বছর আগেই শেষ হয়ে গিয়েছিল। ট্যাক্স টোকেনেরও মেয়াদ ছিল না। শাহাদাতের বাসের রুট পারমিটই ছিল না। আসামিদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ২৭৯, ৩২৩, ৩২৫, ৩০৪ ও ৩৪ ধারায় অভিযোগ আনা হয় চার্জশিটে। ওই বছরের ২৫ অক্টোবর ঢাকার মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারক আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরুর নির্দেশ দেন। অভিযোগপত্রের ৪১ জন সাক্ষীর মধ্যে ৩৭ জন আদালতে এসে তাদের বক্তব্য উপস্থাপন করেন। কারাগারে থাকা চার আসামি গত ৭ অক্টোবর নিজেদের নির্দোষ দাবি করে ন্যায়বিচার প্রার্থনা করেন। দুই পক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে গত ১৪ নভেম্বর বিচারক রায়ের জন্য ১ ডিসেম্বর তারিখ নির্ধারণ করে দেন।

রায় ঘোষণার পর আসামিপক্ষ ও দিয়ার পরিবার অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। আসামিপক্ষ ন্যায় বিচার পায়নি উল্লেখ করে তাদের আইনজীবীরা রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করার কথা জানিয়েছেন। অপরদিকে, নিহত দিয়া খাতুন মিমের পরিবারের সদস্যরা বলছেন, চাকলদের ফাঁসির রায় না হওয়ায় তারা সন্তুষ্ট হতে পারেননি। রাষ্ট্রপক্ষকে উচ্চ আদালতে আসামিদের ফাঁসির আবেদন নিয়ে যাওয়ার দাবি তাদের। তবে নিহত দুই শিক্ষার্থীর সহপাঠীরা রায়ে মোটামুটি সন্তুষ্টি প্রকাশ করে তাদের আন্দোলনের ৯ দফা বাস্তবায়ন বিশেষ করে সড়কে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অনুরোধ জানিয়েছে সরকারের কাছে।

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading