মহীয়সী বেগম রোকেয়া নারী মুক্তির দূত
উত্তরদক্ষিণ মুদ্রতি সংস্করন । ০৯ ডিসেম্বর ২০১৯ । প্রকাশ ০০:০১। আপডেট ১১:৩০
নারীর মর্যাদা, অধিকার ও স্বনির্ভরতা অর্জন তথা নারী মুক্তিদূত ছিলেন বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন। মহীয়সী এই নারী ভেঙে দেন সমাজের কুসংস্কার। মূলত তিনি ছিলেন একজন প্রকৃত সমাজসংস্কার ও প্রগতিশীল আন্দোলনের পথিকৃত্। বেগম রোকেয়া উন্নত মানসিকতা, দূরদর্শী চিন্তা, যুক্তিপূর্ণ মতামত প্রদান ও বিশ্লেষণ, উদার মানবতাবোধের অবতারণা এবং সর্বোপরি দৃঢ় মনোবল দিয়ে তত্কালীন নারী সমাজকে জাগিয়ে তোলেন। বাঙালি মুসলিম নারীদের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তিনি সর্বদা পর্দার অন্তরালে থেকে নারী শিক্ষা বিস্তারে উদ্যোগ নেন এবং মুসলিম মেয়েদের অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে মুক্তির পথ সুগম করেন। সামাজিক নানা বিধিনিষেধ, নিয়ম-নীতির বেড়াজাল অগ্রাহ্য করে বেগম রোকেয়া বাঙালি মুসলিম সমাজে আবির্ভূত হয়েছিলেন অবরোধবাসিনীদের মুক্তিদূত হিসেবে। আজ ৯ ডিসেম্বর, বেগম রোকেয়ার জন্ম-মৃত্যু দিবস তথা বেগম রোকেয়া দিবস। দিবসটি উপলক্ষ্যে এক বাণীতে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ বলেছেন, নারীর ক্ষমতায়নে বাংলাদেশ আজ বিশ্বে রোল মডেল। ৯ ডিসেম্বর ‘বেগম রোকেয়া দিবস’ উপলক্ষে গতকাল রবিবার (৮ ডিসেম্বর) দেয়া এক বাণীতে তিনি বলেন, ‘নারীর মর্যাদা, অধিকার ও স্বনির্ভরতা অর্জনে আমাদের সকলকে একযোগে কাজ করতে হবে। তবেই বেগম রোকেয়ার আদর্শ ও স্বপ্ন বাস্তবায়িত হবে।’ রাষ্ট্রপতি বলেন, তিনি শিক্ষার মাধ্যমে নারীকে ক্ষমতায়িত করা এবং সামাজিক বৈষম্য দূর করে নারীর মর্যাদা সমুন্নত রাখার স্বপ্ন দেখেছিলেন। তার প্রদর্শিত পথেই উন্নয়নের প্রতিটি ক্ষেত্রে আজ প্রত্যয়দীপ্ত নারীরা বিস্ময়কর উত্থান ঘটিয়েছেন। নারী পুরুষের সমান অংশীদারিত্ব ব্যতীত টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয় উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বর্তমান সরকার নারী সমাজকে দেশের সার্বিক উন্নয়ন কর্মকান্ডে সম্পৃক্তকরণের মাধ্যমে নারীর ক্ষমতায়নকে নিশ্চিত করতে নিরবচ্ছিন্ন কাজ করে যাচ্ছে। এ লক্ষ্যে প্রণীত হয়েছে জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি, ২০১১ ও বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৭। এ বছর নারী ও সমাজ উন্নয়নে অনন্য অবদান রাখার জন্য যারা ‘বেগম রোকেয়া পদক-২০১৯’ এর জন্য মনোনীত হয়েছেন- তাদেরকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানান রাষ্ট্রপতি। তিনি বলেন, বেগম রোকেয়ার জীবনাদর্শ ও কর্ম আমাদের নারী সমাজের অগ্রযাত্রায় পথপ্রদর্শক হয়ে থাকবে।
অপরদিকে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আশা প্রকাশ করে বলেছেন, বেগম রোকেয়ার কর্মে ও আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে নারীরা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে এগিয়ে যাবেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘নারী ও শিশু পাচার প্রতিরোধ, আইনি সহায়তা প্রদান, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ এবং কিশোর-কিশোরী ক্লাবের মাধ্যমে নারীর ক্ষমতায়নে ব্যাপক কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য ফ্রিল্যান্সিং এবং নারী উদ্যোক্তা উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।’ নিজেদের মেধা ও কর্মের মাধ্যমে নারী উন্নয়নে অবদান রাখায় যারা ‘রোকেয়া পদক ২০১৯’ লাভ করেছেন তাদের আন্তরিক অভিনন্দন জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘উন্নয়নের মূল স্রোতধারায় নারীর অংশগ্রহণের ফলেই বাংলাদেশ আজ নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে।’ বেগম রোকেয়ার স্বপ্ন আজ বাস্তবে রূপ নিয়েছে। নারীর ক্ষমতায়নে বর্তমানে বাংলাদেশ এশিয়ার দেশগুলির শীর্ষে অবস্থান করছে। এমনটা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘রাজনীতি, অর্থনীতি, পররাষ্ট্রনীতি, আইন প্রণয়ন, নীতি নির্ধারণ, প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর উচ্চ পর্যায়, সাংবাদিকতা, তথ্য-প্রযুক্তি, শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি এবং খেলাধুলাসহ পেশাভিত্তিক সকল স্তরে আজ নারীদের গর্বিত পদচারণা। এভারেস্ট বিজয় থেকে শুরু করে মানবাধিকার রক্ষা এবং জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনের কর্মকান্ডে নারীরা বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখছেন। নারীর হাত ধরে বাংলাদেশ অর্জন করছে একের পর এক আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও সম্মাননা। ‘সকলের জন্য শিক্ষা’ চিন্তার রূপায়নে কেবল মুসলমান সমাজে নয়, সারা ভারতীয় উপমহাদেশে বেগম রোকেয়া সার্থক সামাজিক আন্দোলনের দিশারি।
উনিশ শতকের রক্ষণশীল ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজব্যবস্থায় মুসলিম নারীসমাজে শিক্ষা বিস্তার ও সভ্যতার আলোয় উদ্ভাসিত করার স্বপ্ন দেখেছিলেন নারী জাগরণের পথিকৃত বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন। বেগম রোকেয়া ব্যক্তিগত উদ্যোগে নারীদের স্বাবলম্বী করে গড়ে তোলার জন্য পরিকাঠামো স্থাপন করেছিলেন। জনসচেতনতা তৈরির জন্য হাতে তুলে নিয়েছিলেন কলম। তার প্রবন্ধ, গল্প ও উপন্যাসের মধ্য দিয়ে নারীশিক্ষার প্রয়োজনীয়তা এবং নারী-পুরুষের সমতাভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণের কথা উঠে এসেছে। সেই পথেই আজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে বাংলাদেশ।

