ইন্ডিয়ায়ায় ‘মুসলিমবিরোধী’ নাগরিকত্ব বিল পাস
উত্তরদক্ষিণ মুদ্রতি সংস্করন । ১০ ডিসেম্বর ২০১৯ । প্রকাশ ০০:০১। আপডেট ১০:৩২
প্রতিবেশী তিন দেশ থেকে যাওয়া অমুসলিম শরণার্থীদের নাগরিকত্ব দিতে বহুল আলোচিত নাগরিকত্ব সংশোধনী বিলে অনুমোদন দিয়েছে ইন্ডিয়ার পার্লামেন্ট। গতকাল সোমবার (৯ ডিসেম্বর) নিম্নকক্ষ লোকসভায় (সংসদে) স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বিলটি উত্থাপন করেন। ৯০ মিনিট উত্তপ্ত বিতর্কের পর ২৯৩-৮২ ভোটের ব্যবধানে এটি পাস হয়। আইনে পরিণত হতে হলে বিলটির এখন পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ রাজ্যসভার অনুমোদন পেতে হবে। তবে সেখানে ক্ষমতাসীন হিন্দু জাতীয়তাবাদী ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকায় বিলটির ভবিষ্যত্ অনিশ্চিত। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক প্রতিবেদনে বিলটিকে ‘মুসলিমবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে। ৪ ডিসেম্বর ভারতে অমুসলিম শরণার্থীদের নাগরিকত্ব দিতে একটি খসড়া বিলে অনুমোদন দেয় দেশটির মন্ত্রিসভা। বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান থেকে ভারতে শরণার্থী হওয়া অমুসলিমদের নাগরিকত্ব দিতে এ বিলটি আনা হয়। এর আগে ২০১৬ সালে একবার পার্লামেন্টে এ বিলটি লোকসভার অনুমোদন পেলেও রাজ্যসভার অনুমোদন পেতে ব্যর্থ হয়। তখন আসামসহ উত্তর-পূর্বাঞ্চলজুড়ে বিলটির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ হয়। গতকাল সোমবার বিজেপি সরকার পার্লামেন্টে বিলটি তোলার পরও ভারতের উত্তরপূর্বাঞ্চলে বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী এলাকায় বিলটির বিরুদ্ধে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছে। বিক্ষোভকারীদের আশঙ্কা এতে করে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বিপুল সংখ্যক শরণার্থী ভারতে প্রবেশ করবে। নাগরিকত্ব সংশোধন বিলের মাধ্যমে ভারতের ৬৪ বছরের পুরাতন নাগরিকত্ব আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ১৯৫৫ সালের ওই আইনে বলা হয়েছে, নাগরিকত্ব পেতে হলে ভারতে থাকতে হবে ১১ বছর। তবে সংশোধিত বিলে বলা হয়েছে, হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, পার্সি ও খ্রিষ্ট ধর্মাবলম্বীরা যদি প্রমাণ করতে পারে তারা পাকিস্তান, আফগানিস্তান বা বাংলাদেশ থেকে এসেছে, তাহলে তারা পাঁচ বছরেই আবেদন করতে পারবে। বিজেপি সরকার বলছে, এই বিল পাসের মধ্য দিয়ে ধর্মীয় কারণে নিপীড়িত মানুষের আশ্রয়স্থল হবে ভারত। তবে সমালোচকদের মতে, বিজেপি’র মুসলমান জনগোষ্ঠীকে কোণঠাসা করার নীতির অংশ হিসেবেই পার্লামেন্টে বিল তোলা হয়েছে। ধর্মীয় বৈষম্য হচ্ছে না: এদিকে, নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়ে ফের কংগ্রেসের ঘাড়ে দেশভাগের দায় চাপালেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। দেশটির সংসদে বিতর্কিত নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল পেশ করে বিরোধিতার মুখে পড়ে অমিত শাহ জানিয়ে দেন, ‘ধর্মের নিরিখেই দেশভাগ করেছিল কংগ্রেস। তা না হলে আজ এই বিলের প্রয়োজনই পড়ত না।’ এদিন সংসদে নাগরিকত্ব বিলের তীব্র বিরোধিতা শুরু করেন বিরোধীরা। এই বিলকে অসাংবিধানিক আখ্যা দেন কংগ্রেস নেতারা। তাতেই গর্জে ওঠেন অমিত শাহ। তিনি বলেন, ‘আজ এই বিলের প্রয়োজন পড়ল কেন? স্বাধীনতার পর কংগ্রেস ধর্মের নিরিখে দেশভাগ না করলে, আজ এই বিলের প্রয়োজনই ছিল না। আমরা নই, ধর্মের নিরিখে দেশভাগ করেছিল কংগ্রেসই।’ অমিত শাহ বলেন, ‘১৯৭১ সালে বাংলাদেশের শরণার্থীদের আশ্রয় দিয়েছিলেন ইন্দিরা গান্ধী। তখন তিনি পাকিস্তানি শরণার্থীদের আশ্রয় দেননি কেন? তাহলে কি ইন্দিরা গান্ধীও অসাংবিধানিক পদক্ষেপ করেছিলেন?’ দেশের সংখ্যালঘুদেরকে নিশানা করতেই নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল আনা হয়েছে বলে এদিন মন্তব্য করেন লোকসভায় কংগ্রেসের দলনেতা অধীরঞ্জন চৌধুরী। এই বিলের মাধ্যমে সংবিধানে উল্লিখিত সমানাধিকার সংক্রান্ত ১৪ ধরার লঙ্ঘন করা হচ্ছে বলে দাবি করেন তৃণমূলের সৌগত রায়। কিন্তু তাদের অভিযোগ উড়িয়ে দেন বিজেপি সভাপতি ও দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। তিনি বলেন, ‘দেশের .০০১ শতাংশ সংখ্যালঘুকে কোণঠাসা করা নাগরিকত্ব সংশোধনী বিলের উদ্দেশ্য নয়। আগেই এর ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। সমানাধিকার নিয়ে আলোচনা চাইলে গোটা বিশ্বের উদাহরণ তুলে ধরতে পারি। কিন্তু সমানাধিকারের কথা যখন উঠছেই, তখন একটা কথা বলতেই হয়, সংখ্যালঘুরা যখন শিক্ষাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংরক্ষণ পায়, তখন সমানাধিকারের যুক্তি কোথায় যায়? তাতে সংবিধানের ১৪ ধারার লঙ্ঘন হয় না?’ আনন্দবাজার বলছে, ধর্মীয় নিপীড়ণের জেরে পাকিস্তান, আফগানিস্তান এবং বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে ইন্ডিয়ায় প্রবেশকারী হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, পার্সি ও খ্রিস্টান জনগোষ্ঠীকে ভারতের নাগরিকত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে নাগরিক সংশোধনী বিলে। এর আগে, ১৯৫৫ সালের নাগরিকত্ব আইনে বলা হয়, অন্তত ১১ বছর ইন্ডিয়ায় থাকলে তবেই কোনও ব্যক্তিকে নাগরিকত্ব দেওয়া হবে। নতুন বিলে ওই সংস্থান কমিয়ে পাঁচ বছর করা হয়েছে। তবে তাতে বাইরে থেকে আসা অমুসলিমদের কথা বলা হয়েছে। এতেই আপত্তি তুলছেন বিরোধীরা। কেন্দ্রীয় সরকার ইচ্ছাকৃত ভাবে বেছে বেছে অমুসলিম অনুপ্রবেশকারীদের নাগরিকত্ব দিচ্ছে বলে অভিযোগ তাঁদের। কিন্তু শাহের যুক্তি, পড়শি দেশ থেকে কোনও মুসলিম নাগরিকত্বের আবেদন জানালে, তা খতিয়ে দেখা হবে। শুধুমাত্র সংশোধনী বিলের আওতায় কোনও সুবিধা পাবেন না তারা। কারণ পাকিস্তান, বাংলাদেশের মতো মুসলিম অধ্যুষিত দেশে তাঁদের ধর্মীয় নিপীড়ণের শিকার হতে হয় না।

