রোহিঙ্গা গণহত্যার অভিযোগ অস্বীকার করলেন সু চি
উত্তরদক্ষিণ মুদ্রতি সংস্করন । ১২ ডিসেম্বর ২০১৯ । প্রকাশ ০০:০১। আপডেট ১০:৩৮
প্রত্যাবাসন বিলম্বের শঙ্কা আইনজীবীদের
রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর গণহত্যার অভিযোগে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে নেদারল্যান্ডসের হেগে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) দায়ের করা মামলার দ্বিতীয় দিনের শুনানি হয়েছে। গতকাল বুধবার (১১ ডিসেম্বর) বাংলাদেশ সময় বিকলে ৩টায় শুরু হওয়া শুনানিতে মিয়ানমারের পক্ষে বক্তব্য দেন দেশটির স্টেট কাউন্সিলর অং সান সু চি। তিনি বলেন, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর গণহত্যার অভিযোগে করা মামলাটি ‘অসম্পূর্ণ ও বিভ্রান্তিকর’। জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে তার দেশের বিরুদ্ধে আনা গণহত্যার অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, ২০১৬ সালে ক্রমাগত আক্রমণ চালায় আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি-আরসা। ২০১৭ সালের আগস্টে আরসা একটি সামরিক চৌকি ধ্বংস ও ৩০ জন পুলিশকে হত্যা করে। এভাবে তারা ১২টি হত্যাযজ্ঞ চালায়। এরপর মিয়ানমার সেনাবাহিনী সশস্ত্র অভিযান চালায়। মিয়ানমারের ‘ক্লিয়ারেন্স অপারেশন’কে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করেছে গাম্বিয়া। ওই সেনা অভিযানের পেছনে গণহত্যা চালানোর অভিপ্রায়ের কোনও প্রমাণ নেই। অং সান সু চি বলেন, তার দেশের সেনাসদস্যরা যুদ্ধাপরাধ করে থাকলে তা মিয়ানমারের দেশীয় তদন্ত ও বিচারব্যবস্থায় নিষ্পত্তি করা হবে। এটিকে আন্তর্জাতিকীকরণের সুযোগ নেই। তার দাবি, ১৯৪৮-এর গণহত্যা সনদ এখানে প্রযোজ্য নয়। সেনাবাহিনী কোনো জেনোসাইড করলে সংবিধান অনুযায়ী মিয়ানমারের স্বাধীন তদন্ত ব্যবস্থা কোর্ট মার্শাল করে। সেই ধারবাহিকতায় ২৯ জন সেনা সদস্যসহ এক হাজার ৩২ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। আরো গভীর অনুসন্ধানের অনুরোধ করছি গাম্বিয়াকে। মানবাধিকার লঙ্ঘন হলে মিয়ানমার সরকার মেনে নেবে না। আন্তর্জাতিক আইনের চেয়ে অভ্যন্তরীণ বিচার ব্যবস্থা অনেক দ্রুত। অং সান সু চি বলেন, রোহিঙ্গাদের প্রধান বাসভূমি রাখাইন প্রদেশে গোলযোগের ইতিহাস কয়েক শতাব্দীর এবং এ সংঘাতকে আরো গভীর করতে পারে এমন কিছু না করতে আইসিজে’র প্রতি আহ্বান জানান তিনি। সু চি বলেন, রাখাইনে কোনো ধরনের বৈষম্য করা হবে না। মুসলমান শিশু ও ছাত্রছাত্রীদের জন্য বৃত্তি চালু করা হচ্ছে। তিনটি আইডিপি (ইন্টারন্যালি ডিসপ্লেসড পিপল) শিবির বন্ধ করা হয়েছে। মিয়ানমার রাখাইন প্রদেশের বাস্তুচ্যুত মানুষদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনের প্রতি অঙ্গীকারাবদ্ধ। এ রকম অবস্থায় কীভাবে বলা হয় যে গণহত্যার উদ্দেশ্য নিয়ে সেখানে কার্যক্রম চলছে?
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বাধাগ্রস্ত হবে: সু চির পর বক্তব্য দেন মিয়ানমারের আইনজীবী ক্রিস্টোফার স্টকার ও ফোবে ওকোয়া। ফোবে ওকোয়া তার বক্তব্যের শুরুতে অন্তর্বতী ব্যবস্থার নির্দেশনার বিষয়ে কথা বলেন। বাংলাদেশ থেকে প্রত্যাবাসনের বিষয়ে চলমান প্রক্রিয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, অন্তর্বতী ব্যবস্থার নির্দেশনা দেওয়া হলে প্রত্যাবাসন বাধাগ্রস্ত হবে। তিনি বলেন, বিভিন্ন জাতীয় আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় সহায়তা করছে। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা এবং জাতিসংঘ উন্নয়ন সংস্থা বাস্তুচ্যুতদের পুনর্বাসনের জন্য বিভিন্ন প্রকল্পে কাজ করছে। ইউএনএইচসিআর মাঠপর্যায় থেকে প্রত্যাবাসন তদারক করবে এবং কোনো ধরনের ঝুকি দেখলে তারা তা জানাতে পারবে। সুতরাং, প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকে চলতে দেওয়া উচিত। সবচেয়ে বড় বোঝা যাদের ঘাড়ে পড়েছে তারা মিয়ানমারের সঙ্গে একটি সম্মত কার্যবিবরণীতে প্রত্যাবাসনের বিষয়ে একমত হয়েছে। বাংলাদেশ মিয়ানমারে আশু কোনো গণহত্যার ঝুকির কথা বলছে না। ফোবে ওকোয়ার আগে আদালতে কথা বলেন, মিয়ানমারের অপর আইনজীবী ক্রিস্টোফার স্টকার। গাম্বিয়া যেসব অন্তর্বতী ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা চেয়েছে সেগুলো কেন দেওয়া উচিত নয়, তার দফাওয়ারি ব্যাখ্যা দেন তিনি। তিনি বলেন, আদালত যদি অন্তর্বতী আদেশ দেয় তাহলে সেগুলো প্রতিপালনের বাস্তবতা ও বিবেচনায় নিতে হবে। মিয়ানমার সনদ লঙ্ঘনের মতো কোনো আচরণ করেছে বলে স্বীকার করে না। সুতরাং, বিরোধের গুণগত দিক (মেরিট) বিচার না করে আদালত কোনো অন্তর্বতী আদেশ দিতে পারেন না। তিনি বলেন, গণহত্যার প্রশ্নে অন্য যেসব দেশ মামলা করেছে তারা সবাই সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। গণহত্যা সনদের আওতায় কোনো আবেদন করতে হলে সরাসরি সংক্ষুব্ধ হওয়ার প্রশ্নটিকে অস্বীকার করা যায় না। মিয়ানমারের ঘটনাবলিতে যদি কোনো দেশ সংক্ষুব্ধ হয়ে থাকে, সেটা হওয়ার কথা বাংলাদেশের। কিন্তু, বাংলাদেশ গণহত্যা সনদের প্রযোজ্য ধারাটি গ্রহণ না করায় কোনো মামলা করার অধিকার রাখে না। কার্যত লাওস ছাড়া মিয়ানমারের অন্য কোনো প্রতিবেশীই এমন মামলা করতে পারে না। গণহত্যা সনদের অধীনে গাম্বিয়ার যদি সত্যিই কোনো বিরোধ থাকতো, তাহলে দেশটি শুরু থেকে সে কথা বলেনি কেন? গণহত্যা সনদের কথা তারা তুলেছে শুধুমাত্র ওআইসির তরফে মামলার প্রস্তুতি গ্রহণ সম্পন্ন হওয়ার পর। গাম্বিয়ার সঙ্গে বিরোধের ভিত্তি নেই দাবি করে ক্রিস্টোফার স্টকার বলেন, যে তথ্যানুসন্ধানী দলের রিপোর্ট এবং ওআইসির প্রস্তাবের ভিত্তিতে মিয়ানমারের কাছে যে চিঠি দেওয়া হয়েছিল তা থেকে বিরোধ তৈরি হতে পারে না। ওই চিঠিতে মিয়ানমারের প্রতি গণহত্যা সনদের বাধ্যবাধকতা পূরণের জন্য যে দাবি জানানো হয়েছিল তার জবাবে জন্য যতটা সময় অপেক্ষা করা হয়েছে তা যথেষ্ট কিনা প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন ওই চিঠি থেকে কোনো বিরোধের জন্ম হয় না। শুনানির প্রথম দিন মঙ্গলবার মিয়ানমারে গণহত্যা বন্ধের নির্দেশ দিতে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (আইসিজে) প্রতি আহবান জানায় গাম্বিয়া। আজ বৃহস্পতিবার তৃতীয় ও শেষ দিনের শুনানি শুরু হবে। তিন দিনের শুনানি শেষে কবে রায় ঘোষণা করা হবে সে বিষয়ে এখনও কিছু বলা হয়নি। ‘ওয়ার্ল্ড কোর্ট’ বা বিশ্ব আদালত হিসেবে পরিচিত আইসিজেতে গত মাসে মামলা করে গাম্বিয়া। এতে কূটনৈতিক ও আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে ওআইসি। শুনানি শুরুর আগের দিন সোমবার গাম্বিয়ার উদ্যোগকে সমর্থন দেয় কানাডা এবং নেদারল্যান্ডস। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিবের নেতৃত্বে শুনানিতে উপস্থিত রয়েছেন ২০০ জনের একটি প্রতিনিধি। সেখান কয়েকজন রোহিঙ্গাও আছেন। আইসিজে’র ওয়েবসাইটে শুনানি সরাসরি সম্প্রচার করা হচ্ছে। সারা বিশ্বের গণমাধ্যমকর্মীসহ বিপুলসংখ্যক আন্তর্জাতিক দর্শক এই শুনানি দেখছেন। খবর এএফপি ও রয়টার্সের।
সু চির প্রতি ৮ নোবেলজয়ীর আহ্বান: রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে গণহত্যাসহ যেসব অপরাধ সংঘটিত হয়েছে, তা স্বীকার করে নিতে অং সান সু চি’র প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন শান্তিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী হয়েছেন এমন আটজন আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব। বাংলাদেশের অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসসহ এই নোবেল বিজয়ীরা এক বিবৃতিতে বলেন, সেনাবাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্বের পাশাপাশি অং সান সু চি’র সংঘটিত ফৌজদারী অপরাধের জন্য অবশ্যই জবাবদিহি করা উচিত। বিবৃতিতে বলা হয়, ‘আমরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন এই কারণে যে এসব অপরাধের নিন্দা না জানিয়ে অং সান সু চি বরং এটা সক্রিয়ভাবে অস্বীকার করছেন যে এ ধরণের অপরাধ আদৌ ঘটেছিল।’ দ্য হেগে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গাম্বিয়ার করা মামলার শুনানিতে মঙ্গলবার স্টেট কাউন্সিলর অং সান সু চি যুক্তি তুলে ধরেন। বিবৃতিতে আরো বলা হয়, ‘শান্তির পক্ষের মানুষ হিসেবে আমরা অং সান সু চি’র প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি, তিনি যেন রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে চলা বৈষম্য অবসানের ব্যবস্থা নেন এবং রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব, ভূমির মালিকানা, চলাচলের অধিকার এবং অন্যান্য মৌলিক অধিকার নিশ্চিতে কাজ করেন।’ মুহাম্মদ ইউনূস ছাড়া অন্য যারা বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেছেন, তারা হলেন- শিরিন এবাদি (ইরান-২০০৩), লেমাহ গবোয়ি (লাইবেরিয়া-২০১১), তাওয়াক্কল কারমান (ইয়েমেন-২০১১), মাইরিড মাগুয়ের (উত্তর আয়ারল্যান্ড-১৯৭৬), রিগোবার্তো মেনচু তুম (গুয়াতেমালা-১৯৯২), জোডি উইলিয়ামস (যুক্তরাষ্ট্র-১৯৯৭) ও কৈলাশ সত্যার্থি (ভারত-২০০৬)।

