ইন্ডিয়ার রাজ্যসভায়ও ‘বিতর্কিত’ নাগরিকত্ব বিল পাস, শীঘ্রই আইনে পরিণত হচ্ছে
উত্তরদক্ষিণ মুদ্রতি সংস্করন । ১২ ডিসেম্বর ২০১৯ । প্রকাশ ০০:০১। আপডেট ১০:৪০
রাষ্ট্রহীন হওয়ার শঙ্কায় অসংখ্য মুসলিম, তীব্র প্রতিবাদ বিক্ষোভ, সংঘর্ষ, গ্রেপ্তার, ইন্টারনেট বন্ধ, দুই রাজ্যে সেনা মোতায়েন
হিল্লোল বাউলিয়া ষ তীব্র বিতর্ক, উত্তেজনা আর উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যে ইন্ডিয়ার রাজ্যসভায়ও ‘মুসলিমবিরোধী’ বিতর্কিত নাগরিত্ব বিলটি পাস হয়েছে। ১২৫-১০৫ ভোটের ব্যবধানে গতকাল বুধবার (১১ ডিসেম্বর) নাগরিকত্ব সংশোধনী বিলটি ইন্ডিয়ার উচ্চকক্ষে পাস হয়। এখন রাষ্ট্রপতির অনুমোদন পেলে শিঘ্রই এটি আইনে পরিণত হবে বলে জানিয়েছেন হিন্দুত্ববাদী দল বিজেপির সভাপতি ও ইন্ডিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। এর আগে গতকাল বুধবার বিকেলে রাজ্যসভায় বিলটির বিরুদ্ধে দেশটির বিরোধী দলের সদস্যরা তীব্র বিরোধীতা করেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সরকারি দলের মতেরই প্রতিফলন ঘটেছে ভোটা-ভুটিতে। বিশ্লেষকরা বলছেন, নতুন নাগরিকত্ব বিলটি আইনে পরিণত হলে ইন্ডিয়ার বহু মুসলিম রাষ্ট্রহীন বা উদ্ভাস্তু হয়ে পড়তে পারেন। এদিকে, গত সোমবার বিতর্কিত বিলটি ইন্ডিয়ার লোকসভা বা পার্লামেন্টে পাস হওয়ার পর বিভিন্ন মহল থেকে এটি বাতিলের দাবি তুলেন। ইন্ডিয়ার বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের পাশাপাশি বিশিষ্টজনরাও এর বিরোধীতা করে আসছিলেন। সেই সঙ্গে প্রতিবাদে রাস্তায় নেবে তীব্র আন্দোলন করেন আসাম, ত্রিপুরা, পশ্চিমবঙ্গসহ বিভিন্ন রাজ্যের হাজার হাজার মানুষ। এসময় বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। পুলিশের টিয়ারশেল ও লাঠিপেটায় আহত হন অনেকে। গ্রেপ্তার করা হয় বিক্ষোভকারীদের। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে দুই রাজ্যে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। বন্ধ করে দেয়া হয়েছে ইন্টারনেট পরিষেবা। আর এমন পরিস্থিতির মধ্যেই দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের ইচ্ছে অনুযায়ী রাজ্যসভায় পাস হলো সংশোধনী বিলটি। এনডিটিভির খবরে বলা হয়, রাজ্যসভায় বিলটি নিয়ে বিতর্ক চলে। সেই সময় বিতর্কিত বিলটির প্রতিবাদে উত্তপ্ত হয়ে ওঠা আসাম ও ত্রিপুরায় সেনা নামায় কেন্দ্রীয় সরকার। এনডিটিভির খবর অনুযায়ী, বিলেরপক্ষে ভোট পলে ১১৭টি এবং বিপক্ষে পড়েছে ৯২টি ভোট। আর আনন্দবাজার বলছে, বিলের পক্ষে ১২৫ ও বিপক্ষে ১০৫টি ভোট পড়েছে। তবে দুটি গণমাধ্যমই বলেছে বিলটি সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোটে পাস হয়েছে রাজ্যসভায়। আর এর দু’দিন আগেই বিলটি পাস হয়েছে লোকসভায়। বুধবার বিলটি রাজ্যসভায় বিলটি পেশ করেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। বিলটির বিরোধিতা করে বিরোধী দল ও দক্ষিণপন্থী দলগুলো। তাদের অভিযোগ, এই বিল মুসলিম প্রতি প্রতিহিংসামূলক এবং সংবিধানের ১৪ নম্বর ধারা বিরোধী। সেখানে সবার সাম্যতার কথা বলা হয়েছে। জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ দাবি করে বলেন, দেশের মুসলিমদের ভয় পাওয়ার কোনও প্রয়োজন নেই। কারণ, ‘তারা দেশের নাগরিক ছিলেন এবং থাকবেন।’ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দাবি, এই বিলটি শুধুমাত্র প্রতিবেশী দেশের সংখ্যালঘুদের জন্য, ইন্ডিয়ার মুসলিমদের নিয়ে ‘কোনও পদক্ষেপ নেই’। বিলটি নিয়ে আবেগপূর্ণ আবেদন জানিয়ে কংগ্রেস নেতা আনন্দ শর্মা বলেন, ‘আমার মনে হয়, এই বিলটি ভারতের সংবিধানের ভিত্তিতে আঘাত। এটি ভারতের সংবিধানের আত্মাকে আঘাত করবে। এটি সংবিধানের প্রস্তাবনার বিরুদ্ধে।’ রাজ্যসভাকে সতর্কবার্তা দিয়ে তৃণমূল সাংসদ ডেরেক ও ব্রায়েন বলেন, ‘গণতন্ত্র থেকে একনায়কতন্ত্রের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে ইন্ডিয়া।’ তার ভাষণে, নাজি জার্মানির ছবি তুলে ধরেন, সেটিকে নাগরিকত্ব বিল এবং জাতীয় নাগরিকপঞ্জীর সঙ্গে তুলনা করে বলেন, কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের সঙ্গে উত্তর-পূর্বের ডিটেনশন ক্যাম্পের ‘অদ্ভুত মিল’ রয়েছে। নাগরিকত্ব বিল নিয়ে বক্তব্য রাখেন বিজেপি নেতা জেপি নাড্ডা, বিরোধীদের তোলা পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ খারিজ করে দেন তিনি। তার কথায়, ‘এটা পুরোপুরিই ভুল’। তিনি বলেন, ‘পুরোপুরিভাবেই পাকিস্তান, আফগানিস্তান এবং বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের জন্য’। দীর্ঘ আইনি লড়াই শেষে, জামিনে মুক্তির পর, কংগ্রেস সাংসদ পি চিদাম্বরম কেন্দ্রের দিকে একাধিক প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন। তার মধ্যে ছিল- বিলে কেন ভারতের তিনটি প্রতিবেশী দেশের উল্লেখ রয়েছে এবং কেন শ্রীলঙ্কার হিন্দুদের মতো অন্যান্য ধর্ম এবং সংখ্যালঘুদের বাদ দেওয়া হয়েছে। এনডিটিভি বলছে, যখন রাজ্যসভায় বিলটি নিয়ে বিতর্ক চলছিল, বিলের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, বিক্ষোভ থামাতে ত্রিপুরা ও আসামে সেনা নামানো হয়। সূত্রের খবর., ত্রিপুরার কাঞ্চনপুর ও মানু এলাকায় দুই কোম্পানি বাহিনী পাঠানো হয়েছে। আরও দুই কোম্পানি পাঠানো হয়েছে আসামের বঙ্গাইগাঁও এবং ডিব্রুগড় জেলায়। রাজ্যের ১০টি জেলায় মোবাইল-ইন্টারনেট এবং ডেটা পরিষেবা বন্ধ করে দিয়েছে আসাম সরকার, রাজ্যের অন্যতম গুয়াহাটি শহরে কারফিউ জারি করা হয়েছে। এনডিটিভির খবরে আরও বলা হয়েছে, সোমবার লোকসভায় বিলটির পক্ষে বলতে গিয়ে উত্তর-পূর্বের রাজ্যগুলিতে প্রতিবাদ, বিক্ষোভ প্রত্যাহারের আবেদন জানান অমিত শাহ, যাতে এলাকার পরিচিতি অক্ষুন্ন থাকে, সে ব্যাপারে পদক্ষেপের আশ্বাস দেন তিনি। বিক্ষোভকারীদের উদ্বেগ, বিলে উল্লেখ করা শরণার্থীরা সেখানকার বাসিন্দাদের পরিচিত এবং জীবন জীবিকা বিপন্ন করতে পারে। এদিন, বিজেপি সাংসদদের উদ্দ্যেশে বক্তব্য রাখেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তিনি বলেন, ‘কয়েকটি দল’ নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল নিয়ে পাকিস্তানের ভাষায় কথা বলছে। তার কথায়, ‘স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল, ধর্মীয় নিপীড়ন থেকে পালিয়ে বাঁচা মানুষদের স্বস্তি দেবে এই বিল’। বিল এবং কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ শোনা যায় কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীর মুখে। তিনি এটিকে ‘উত্তর-পূর্বের রাজ্যের ওপর অপরাধমূলক হামলা’ বলে মন্তব্য করেন। এলাকাটিকে ‘জাতিগত সাফাই’ করার পদক্ষেপ বলেও মন্তব্য করেন রাহুল গান্ধী। উত্তর-পূর্বের মানুষের প্রতি তার সমবেদনা ছিল এবং থাকবে বলেও জানান লোকসভার কংগ্রেস সাংসদ ও দলটির সাবেক সভাপতি রাহুল গান্ধী।
উত্তপ্ত আসামে জারি কারফিউ, সেনা মোতায়েন: মুসলিমবিরোধী বিলের প্রতিবাদে আসাম রাজ্যে হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করেন। এসময় পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। বিক্ষোভকারীদের থামাতে কাদানে গ্যাসের শেল ছোঁড়ে পুলিশ। করা হয় লাঠিচার্জও। এতে অনেকে আহত হয়েছেন। এনডিটিভির খবরে বলা হয়, গুয়াহাটিসহ আসামের ১০টি জেলায় গতকাল বুধবার সন্ধ্যা থেকে বন্ধ রাখা হয়েছে মোবাইল ইন্টারনেট পরিষেবা। নাগরিকত্ব বিলের প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে প্রতিবাদে সামিল হয়েছেন বহু মানুষ, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ বেঁধে যায় বিক্ষোভকারীদের। পরে সেনাবাহিনীকে রাস্তায় থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আসাম অধিগ্রহণ ১৯৮৫ এর প্রতিবাদে ছাত্র সংগঠনের বিক্ষোভ ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। গুয়াহাটি বিমানবন্দরে আটকে পড়েন আসামের মুখ্যমন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোওয়াল। এদিন যখন মুখ্যমন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোওয়াল আটকে পড়েন, সেই সময় রাজ্যসভায় বিতর্ক চলছিল নাগরিকত্ব বিল নিয়ে। ছাত্রনেতা জানিয়েছেন, সচিবালয়ের সামনে পুলিশের পদক্ষেপে আহত হন বহু বিক্ষোভকারী। আগুন ধরিয়ে দেওয়ায় ব্যবহার করা হয় জল কামান। গুয়াহাটি, ডিব্রুগড় এবং জোরহাটের মতো এলাকায় কয়েকশো বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংবাদসংস্থা পিটিআই। তবে পুলিশ বা প্রশাসনের কোনো বক্তব্য পায়নি এনডিটিভি। পিটিআই জানিয়েছে, জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বৈঠকের জন্য তৈরি করা মঞ্চও ভেঙে দেয় বিক্ষোভকারীরা। সরকারি ব্যানার এবং পোস্টার ভেঙে দেওয়া হয় এবং সচিবালয়ের সামনে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় এদিন। এক ছাত্রনেতাকে উদ্ধৃত করে পিটিআই জানিয়েছে, ‘এটি সর্বানন্দ সোনোওয়ালের নেতৃত্বাধীন একটি বর্বরের সরকার। নাগরিকত্ব বিল খারিজ না করা পর্যন্ত আমরা কোনও চাপের সামনে মাথা নত করব না।’

