‘মুসলিমবিরোধী’ নাগরিকত্ব বিলের প্রতিবাদ

‘মুসলিমবিরোধী’ নাগরিকত্ব বিলের প্রতিবাদ

উত্তরদক্ষিণ মুদ্রতি সংস্করন । ১৩ ডিসেম্বর ২০১৯ । প্রকাশ ০০:০১। আপডেট ১০:৩২

আসামে কারফিউ ভেঙে রাজপথে জনতার ঢল গুলিতে নিহত ২

ইন্ডিয়ার আসাম প্রদেশের রাজধানী গুয়াহাটিতে কারফিউ অমান্য করে রাস্তায় নেমেছে হাজারো জনতা। পার্লামেন্টের উচ্চ ও নিম্নকক্ষে পাস হওয়া ‘মুসলিমবিরোধী’ বিতর্কিত নাগরিকত্ব বিলের (সিএবি) প্রতিবাদ আন্দোলনে সেখানে জনতার ঢল নামে। গতকাল বৃহস্পতিবার (১২ ডিসেম্বর) সকালে গুয়াহাটিতে লোকজন কারফিউ ভেঙে সেনাবাহিনীর উপস্থিতিতেই রাস্তায় নেমে আসেন। আসামের ছাত্র সংগঠন- এএএসইউ ও কেএমএসএস লোকজনকে রাস্তায় নেমে আসার আহ্বান জানিয়েছিল আগেই। এতে সারা দিয়েছে রাজ্যবাসী। তবে গুয়াহাটির শহরতলীর কোনো কোনো এলাকায় পুলিশ গুলিবর্ষণ করেছে বলেও খবর পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে এনডিটিভি। গুলিবিদ্ধ হয়ে অন্তত ২ জন বিক্ষোভকারী নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এর আগে গত বুধবার সন্ধ্যায় ভারতীয় পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ রাজ্যসভায় সিএবি পাস হওয়ার আগেই আসামের বিভিন্ন অংশে বিক্ষোভ শুরু হয়। বিক্ষোভকারীরা পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পুরো রাজ্যকে অস্থির করে তোলে। প্রতিবাদ চলতে থাকায় আসাম ও প্রতিবেশী ত্রিপুরায় সব ট্রেন চলাচল বন্ধ রাখা হয়। গুয়াহাটি ও ডিব্রুগড়গামী বহু ফ্লাইট বাতিল করা হয়। হাজার হাজার লোক রাস্তায় নেমে প্রতিবাদে অংশ নিতে থাকায় এক পর্যায়ে আসামের চারটি এলাকায় সেনাবাহিনীর সদস্যদের মোতায়েন করা হয়। গুয়াহাটিতে প্রতিটিতে ৭০ জন করে সেনাবাহিনীর দুটি দল মোতায়েন করা হয়। এর পাশাপাশি ‍তিনসুকিয়া, ডিব্রুগড় এবং জোরহাট জেলায় সেনা মোতায়েন করা হয়েছে বলে কর্মকর্তাদের বরাতে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা প্রেস ট্রাস্ট অব ইন্ডিয়া (পিটিআই)। সেই সঙ্গে সেসব এলাকায় বন্ধ রাখা হয়েছে মোবাইল-ইন্টারনেট পরিষেবা। এনডিটিভি ও আনন্দবাজারের খবরে বলা হয়েছে, বিক্ষোভের মুখে আসামের বৃহত্তম শহর গুয়াহাটিতে অনির্দিষ্টকালের জন্য কারফিউ জারি করা হয় বুধবার। ডিব্রুগড়ে প্রতিবাদকারীরা রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী সর্বানন্দ সানোয়াল ও কেন্দ্রীয় মন্ত্রী রামেশ্বর তেলির বাড়িতে চড়াও হওয়ার পর সেখানেও কারফিউ জারি হয়। প্রতিবাদকারীরা সানোয়ালের লক্ষীনগরের বাড়িতে পাথর নিক্ষেপ করে। তারা আরেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী দুলিয়াজানের বাড়িতেও হামলা চালিয়ে ভাংচুর করে। আসামজুড়ে ব্যাপক প্রতিবাদের মুখে বৃহস্পতিবার সকালে নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল নিয়ে আসামের জনগণকে আশ্বস্ত করে টুইট করেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। ‘আপনাদের অধিকার কেউ কেড়ে নিতে পারবে না,’ টুইটে বলেন তিনি। গত বুধবার রাতে ডিব্রুগড়ের চাবুয়ায় প্রতিবাদকারীরা একটি রেলস্টেশনে আগুল লাগিয়ে দেয়। তিনসুকিয়া জেলার পানিতোলা রেলস্টেশনও প্রতিবাদকারীরা পুড়িয়ে দিয়েছে বলে নর্থইস্টান ফ্রন্টিয়ার রেলওয়ের মুখপাত্র জানিয়েছেন। ইন্ডিগো বৃহস্পতিবার তাদের ডিব্রুগড়গামী ও সেখান থেকে ছেড়ে আসার কথা থাকা সব ফ্লাইট বাতিল করেছে। স্পাইসজেটও গুয়াহাটি ও ডিব্রুগড়গামী ও সেখানে থেকে ছেড়ে আসার কথা থাকা তাদের সব ফ্লাইট শুক্রবার পর্যন্ত বাতিল করেছে। ভারতের অভ্যন্তরীণ রুটে চলাচলকারী অন্যান্য এয়ারলাইন্সগুলো একই ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। গত মঙ্গলবার দুপুর ২টা থেকে পরবর্তী ৪৮ ঘণ্টার জন্য পুরো আসামজুড়ে ইন্টারনেট সার্ভিস বন্ধ রাখা হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার (১২ ডিসেম্বর) প্রতিবেশী ত্রিপুরায় বন্ধের ডাক দিয়েছে বিরোধীদল কংগ্রেস। ব্যাপক প্রতিবাদের মুখে এই রাজ্যটিতে সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের নেতৃত্বে আসাম রাইফেলের ২১০ জন আধাসেনা মোতায়েন করা হয়েছে। এর আগে রাজ্যটিতে সেনাবাহিনীর ১৪০ জন সদস্যকে মোতায়েন করা হয় বলে ভারতের প্রতিরক্ষা বিভাগের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন। প্রতিবেশী আসামের ছাত্র সংগঠন এএএসইউ ও কেএমএসএস লোকজনকে রাস্তায় নেমে আসার আহ্বান জানানোর পর কারফিউ অমান্য করে হাজারো জনতা রাস্তায় নামে। পরিস্থিতি কোনদিকে যাবে শেষ পর্যন্ত তা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশ্লেষকরা।

মহারাষ্ট্রের আইপিএস কর্মকর্তার পদত্যাগ: এদিকে নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল (সিএবি) এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে মহারাষ্ট্র পুলিশ ক্যাডারের আইপিএস কর্মকর্তা আবদুর রহমান পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন। এক টুইটে চাকরি ছাড়ার কথা জানান তিনি। সঙ্গে নিজের পদত্যাগপত্রও পোস্ট করেছেন। গতকাল বৃহস্পতিবার (১২ ডিসেম্বর) এ খবর জানিয়েছে এনডিটিভি। মহারাষ্ট্র পুলিশের আইজি পদের এই কর্মকর্তা মুম্বাইয়ে কাজ করছিলেন। টুইটে তিনি লেখেন, ‘নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল সংবিধান পরিপন্থি এবং ভারতে ধর্মীয় বহুত্ববাদের বিরোধী। আমি ন্যায়বিচারের পক্ষের সব মানুষকে গণতান্ত্রিক পন্থায় এ বিলের বিরোধিতা করার আহ্বান জানাচ্ছি। সরকারের সঙ্গে সহমত হতে না পারায় আমি আর কাজে যাব না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’ বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান থেকে গিয়ে ভারতে শরণার্থী হওয়া অমুসলিমদের নাগরিকত্ব দেওয়ার লক্ষ্যে আনা হয় নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল। হিন্দু, খ্রিস্টান, শিখ, জৈন, বৌদ্ধ ও পার্সি সম্প্রদায়ের শরণার্থীদের ভারতীয় নাগরিকত্ব দেওয়ার কথা বলা আছে বিলে। বিলটিতে মুসলিমরা না থাকায় এটি সাম্প্রদায়িক বলে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে। গত বুধবার রাতে রাজ্যসভায় পাশ হয়েছে এ বিল। বিলের স্বপক্ষে ভোট পড়ে ১২৫টি, বিপক্ষে ভোট পড়ে ৯৯টি। এর আগে এটি লোকসভায় পাশ হয়েছিল। এখন রাষ্ট্রপতি সই করলে বিলটি আইনে পরিণত হবে। তবে বিরোধীরা বিলের বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টে যেতে পারেন।

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading