আপিলেও জামিন নাকচ আপাতত কারাগারই ঠিকানা খালেদার

আপিলেও জামিন নাকচ আপাতত কারাগারই ঠিকানা খালেদার

উত্তরদক্ষিণ মুদ্রতি সংস্করন । ১৩ ডিসেম্বর ২০১৯ । প্রকাশ ০০:০১। আপডেট ১০:৪০

২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকার পুরনো অংশে বকশীবাজারে স্থাপিত বিশেষ জজ আদালতে শেষ হওয়া ‘জিয়া অরফ্যানেজ ট্রাস্ট’ দুর্নীতি মামলায় খালেদা জিয়ার ৫ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়। সেই দিন থেকে দণ্ডভোগ করছেন তিনি। পরে ওই মামলায় হাইকোর্ট তার শাস্তি বাড়িয়ে ১০ বছর করেছেন। অপরদিকে জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় একই আদালত একই বছরের অক্টোবরে তাকে ৭ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছে। সেই মামলাটি হাইকোর্টে বিচারাধীন। এদিকে খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ার প্রায় ১৮ মাস পর গতকাল বৃহস্পতিবার তার জামিন আবেদনের চূড়ান্ত শুনানি শেষে দেশের সর্বোচ্চ আদালত আবেদনটি খারিজ করে দেয়।

খালেদার জামিন আবেদন খারিজ: জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার জামিন চেয়ে করা আপিল আবেদন খারিজ করে দিয়েছেন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আদালত- সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। এর ফলে তার জামিনের বিষয়ে হাইকোর্টের খারিজ আদেশ বহাল রইলো।  তিনি এ মামলায় জামিন পাওয়ার আর কোনো আশা ফিকে হয়ে গেলো। এ মুহূর্তে তার কারাগার থেকে মুক্তির আর কোনো সম্ভাবনা নেই। গতকাল বৃহস্পতিবার (১২ ডিসেম্বর) প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগ এ আদেশ দেন। খালেদা জিয়ার আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী জয়নুল আবেদীন ও খন্দকার মাহবুব হোসেন। আর জামিন আবেদনের বিরোধিতা করেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আইনজীবী মো. খুরশীদ আলম খান। এর আগে চ্যারিটেবল মামলায় ৩১ জুলাই বিচারপতি ওবায়দুল হাসান ও বিচারপতি এস এম কুদ্দুস জামানের হাইকোর্ট বেঞ্চ খালেদা জিয়ার জামিন আবেদন খারিজ করেছিলেন। পরে ১৪ নভেম্বর হাইকোর্টের খারিজ আদেশের বিরুদ্ধে আপিল দায়ের করেন তার আইনজীবীরা।

আপিল বিভাগের সংশ্লিষ্ট শাখায় ১৪০১ পৃষ্ঠার ওই আপিল আবেদন দাখিল করা হয়। ওই আপিলের শুনানি নিয়ে খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্য পরীক্ষার প্রতিবেদন চেয়ে মামলার কার্যক্রম গতকাল বৃহস্পতিবার (১২ ডিসেম্বর) পর্যন্ত মুলতবি করেছিলেন আপিল আদালত। গত বুধবার ( ১১ ডিসেম্বর) উচ্চ আদালতের নির্দেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাত সদস্যের মেডিক্যাল বোর্ড তার স্বাস্থ্য প্রতিবেদন জমা দেয় আদালতে। যা আছে মেডিক্যাল রিপোর্টে: আদালতে জমা দেওয়া মেডিক্যাল রিপোর্টে কারাবন্দি বিএনপি চেয়ারপাসন বেগম খালেদা জিয়ার চারটি রোগের কথা উল্লেখ করেছেন চিকিত্সকরা। রিপোর্টে ডাক্তাররা লিখেছেন, বেগম খালেদা জিয়া ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, অ্যাজমা বা কাশিসহ শ্বাসকষ্ট এবং রিউমেটায়েড আর্থাইটাইসিসে ভুগছেন। মেডিক্যাল বোর্ড লিখেছেন, তার (খালেদা জিয়া) উচ্চ রক্তচাপ (হাইপারটেনশন) এবং অ্যাজমা মোটামুটি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, কেবল ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য তার নতুন করে কিছু পরীক্ষা প্রয়োজন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ডা. ঝিলন মিঞা সরকারের নেতৃত্বে অধ্যাপক ডা. ফরিদ উদ্দীন, ডা. শামীম আহমেদ, ডা. বদরুন্নেছা আহমেদ, ডা. তানজিমা পারভিন, ডা. চৌধুরী ইকবাল মাহমুদ এবং ডা. সৈয়দ আতিকুল হকের সমন্বয়ে এ মেডিক্যাল বোর্ড চিকিত্সা দিচ্ছেন খালেদা জিয়াকে। এ বিষয়ে বৃহস্পতিবার আপিল বিভাগে শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। ওই প্রতিবেদনে মেডিক্যাল বোর্ড উল্লেখ করেন,  খালেদা জিয়া আগে থেকেই রিউমেটায়েড আর্থাইটিসে ভুগছেন, সেজন্য আগে থেকেই তার হাঁটুর জয়েন্ট রিপ্লেস করা আছে। মেডিক্যাল বোর্ড এ প্রসঙ্গে বলেছেন, তার সবকিছু ঠিক থাকলেও রিউমেটায়েড আর্থাইটিস নিয়ন্ত্রণে আসছে না। যে চিকিত্সা তাকে দেওয়া হচ্ছে সেটা পরিপূর্ণ নয় উল্লেখ করে তারা বলেছেন, আধুনিক সময়ে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী একটি বায়োলজিক্যাল থেরাপি রয়েছে। কিন্তু এর কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া রয়েছে, আবার এতে করেই তিনি পুরোপুরি সুস্থ হয়ে যাবেন অথবা যাবেন না-এ বিষয়গুলোও সম্পর্কিত। এ বিষয়গুলোতে বেগম খালেদা জিয়ার সম্মতি চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু চিকিত্সকরা সে চিকিত্সা শুরু করবেন কিনা সে বিষয়ে এখনও সিদ্ধান্ত দেননি তিনি। মেডিক্যাল প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বেগম খালেদা জিয়ার যে রিউমেটিক আর্থাইটিস রয়েছে সেটা এতদিন পায়ে থাকলেও এখন সেটা শরীরের বিভিন্ন জয়েন্টকে আক্রান্ত করছে, অ্যাকিটিভ স্টেজে রয়েছে। এর অর্থ হচ্ছে, এখন সেটা শরীরের বিভিন্ন জয়েন্টকে ধরে ফেলেছে। চিকিত্সকদের ভাষায়, বিভিন্ন জয়েন্টকে ইনভল্ব করছে। সে কারণে তিনি অন্যের সাহায্য ছাড়া মুভমেন্ট করতে পারছেন না। আর এই অসুখে তিনি দীর্ঘদিন ধরে আক্রান্ত এবং এর কোনও ‘কিউরেটিভ ট্রিটমেন্ট’ এখনও আবিষ্কৃত হয়নি। একইসঙ্গে যেহেতু তার ‘রিউমেটিক আর্থাইটিস’ ‘অ্যাক্টিভে স্টেজে’ রয়েছে তাই এ বিষয়ে ‘আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত যে বায়োলজিক্যাল থেরাপি’ বা এ বিষয়ে যে অ্যাডভান্স চিকিত্সা সেটা তিনি এতদিন পাননি। তারা এখন সেটা শুরু করতে চান এবং বর্তমানে এটাই আন্তর্জাতিকভাবেও রিকমেন্ড করা হয়। কিন্তু এ চিকিত্সা দিলেই যে তিনি সুস্থ হয়ে যাবেন-সে বিষয়েও নিশ্চিত করে বলা যায় না। সে কারণে এ চিকিত্সা শুরু করতে হলে তার অনুমতি প্রয়োজন। একইসঙ্গে তার ডান পায়ে ছোট গুটির মতো রয়েছে এর জন্য তার একটি বিশেষ পরীক্ষা (এফএনএসি) করা দরকার বলে উল্লেখ করেছেন তারা মেডিক্যাল রিপোর্টে। চতুর্থত তার ক্ষুধামন্দা রয়েছে উল্লেখ করে তারা লিখেছেন, যার কারণে তিনি খেতে পারছেন না। তার ভেতরে কিছু হয়েছে কিনা সেটা জানার জন্য এন্ডোসকপি করা প্রয়োজন, একইসঙ্গে কিছু ভ্যাকসিনও দিতে হবে। কিন্তু এন্ডোসকপি এবং ভ্যাকসিনের বিষয়েও খালেদা জিয়া কয়েকদিন সময় চেয়েছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে মেডিক্যাল রিপোর্টে। এদিকে, মেডিক্যাল রিপোর্টে অ্যাডভান্স মেডিক্যাল ট্রিটমেন্ট বলতে কী বোঝানো হয়েছে জানতে চাইলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. কনক কান্তি বড়ুয়া বলেন, বেগম খালেদা জিয়ার আর্থ্রাটাইটিসের জন্য যে উন্নত মানের থেরাপি প্রয়োজন যেটা বাংলাদেশেই সম্ভব এটাই লিখেছেন চিকিত্সকরা।

খালেদার বিরুদ্ধে যত মামলা: ২০১৮ সালের ২৯ অক্টোবর পুরান ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারের প্রশাসনিক ভবনের সাত নম্বর কক্ষে স্থাপিত ঢাকার বিশেষ জজ আদালত ৫-এর বিচারক মো. আখতারুজ্জামান জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় খালেদা জিয়াকে সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড দেন। এর আগে দুর্নীতির আরেক মামলা, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় ২০১৮ সালের ৮ ফেবব্রুয়ারি বিচারিক আদালত খালেদা জিয়াকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড ও জরিমানা করে। ওইদিন রায়ের পরপরই তাকে পুরাতন ঢাকার সাবেক কেন্দ্রীয় কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। ৫ বছরের সাজার বিরুদ্ধে করা দুদকের রিভিশন আবেদন গ্রহণ করে ৩০ অক্টোবর তাকে ১০ বছরের কারাদণ্ডাদেশ দেন হাইকোর্ট। এছাড়াও খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি মামলার বিচার কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

নাইকো দুর্নীতি: কানাডার জ্বালানী কোম্পানি নাইকোর সঙ্গে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের চুক্তি করে রাষ্ট্রের প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা ক্ষতি করার এই মামলাটিও হয় ২০০৮ সালে সেনা-সমর্থিত সরকারের সময়। মামলাটি বিচারিক আদালতে চার্জগঠনের শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে।

গ্যাটকো মামলা: ঢাকার কমলাপুরে কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণের কাজ যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে গ্যাটকো নামে একটি কোম্পানিকে দেওয়ার অভিযোগে এই মামলাটিও হয় ২০০৭ পরবর্তী সেনা-সমর্থিত সরকারের সময়। এই মামলাটিও বিচারিক আদালতে বিচারাধীন।

বড় পুকুরিয়া কয়লা খনি: খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে ২০০৮ সালে দায়ের করা এই মামলার অভিযোগ ছিল – চুক্তিবদ্ধ কোম্পানি শর্ত ভেঙে সরকারের চোখের সামনে অতিরিক্ত এলাকায় কয়লা খনন করে রাষ্ট্রের ক্ষতি করেছে, এবং খালেদা জিয়া রাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষায় ব্যর্থ হয়েছেন। দুর্নীতির এই পাঁচটি মামলা ছাড়াও খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে আরো ৩১টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে ১১টি মামলা নাশকতার। সেই সাথে রয়েছে মানহানি এবং রাষ্ট্রদ্রোহের কিছু মামলা। ১৫ অগাস্টে ‘ভুয়া’ জন্মদিন পালনের অভিযোগেও একটি মামলা রয়েছে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে। বিএনপি সবসময় অভিযোগ করে, এই সব দুর্নীতির মামলা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত এবং হয়রানিমূলক। সরকারের পক্ষ থেকে অবশ্য এসব অভিযোগ বরাবরই নাকচ করা হয়েছে।

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading