দেশে ফের ‘সোয়াইন ফ্লু’ আসছে?
উত্তরদক্ষিণ অনলাইন । ০২ জানুয়ারি ২০২০ । আপডেট ১৮:৫৩
সোয়াইন ফ্লু আক্রান্ত হয়ে সাবেক সংরক্ষিত আসনের এমপি মারা গেলেও এনিয়ে ভয়ের কোনো কারণ নেই বলে মনে করেন চিকিৎসকরা। সংরক্ষিত আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী ফজিলাতুন নেসা বাপ্পি চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন বৃহস্পতিবার। তিনি এইচওয়ানএনওয়ান ভাইরাস বা সোয়াইন ফ্লু ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের আইসিইউ বিভাগের প্রধান ডাক্তার কামরুল হুদা এমনটাই জানিয়েছেন।
সরকার দলীয় সাবেক এই নারী সাংসদ সোয়াইন ফ্লু আক্রান্ত হয়ে মারা গেলেও বাংলাদেশে এই রোগ এখন ব্যাপকহারে ছড়িয়ে পড়ার কোনো আশঙ্কা নেই বলে নিশ্চিত করেন রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইন্সটিটিউটের পরিচালক ডাক্তার মীরজাদি সাবরিনা ফ্লোরা। বিবিসিকে দেয়া সাক্ষাৎকারে ডা. ফ্লোরা বলেন, “এই রোগটিকে এখন সোয়াইন ফ্লু নাম দেয়া যথাযথ হবে না। কারণ, শূকর থেকেই যে এই রোগের ভাইরাস ছড়াতে হবে, এমনটি নয়। মানুষের দেহেই এই ভাইরাসের উপস্থিতি পাওয়া যায়।” সারাদেশে নিয়মিত এই ফ্লু’র পরীক্ষা নিরীক্ষা চলে বলেও নিশ্চিত করেছেন সাবরিনা ফ্লোরা।
সোয়াইন ফ্লু যেভাবে ছড়ায়: সোয়াইন ফ্লু সাধারণত হাঁচি-কাশির মাধ্যমে মানুষের মধ্যে সংক্রমিত হয়। ফ্লু আক্রান্ত ব্যক্তির কাছে থাকলে, তার ব্যবহৃত পাত্রে খাবার খেলে বা ঐ ব্যক্তির কাপড় পড়লে ফ্লু ছড়ানোর আশঙ্কা থাকে, বলছেন চিকিৎসকরা।
সোয়াইন ফ্লু’র উপসর্গ: সাধারণ সোয়াইন ফ্লু’র উপসর্গ সাধারণ ফ্লু’র মতই হয়ে থাকে। জ্বর, কাশি, গলা ব্যথা, শরীরে ব্যথা, ঠান্ডা ও অবসাদের মত উপসর্গ দেখা দিতে পারে ফ্লু হলে। পাশাপাশি শ্বাসকষ্ট, র্যাশ বা পাতলা পায়খানাও হতে পারে। শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি, গর্ভবতী নারী, ডায়বেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তি বা কোনো ধরণের অসুখে ভুগতে থাকা ব্যক্তি ফ্লু’তে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকেন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সোয়াইন ফ্লু নিজে থেকেই সেরে যায়। তবে এর ফলে বিভিন্ন দেশে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।
গবেষকরা বলছেন, ফ্লু’র ভাইরাসগুলো নিজেদের মধ্যে জিনগত উপাদান অদল বদল করতে পারার সক্ষমতা রয়েছে। তাই কোন ধরনর সোয়াইন ফ্লু বিপজ্জনক হতে পারে, তা নিশ্চিত করে বলতে পারেন না চিকিৎসকরা। ২০০৯ সালে মেক্সিকোতে ভাইরাসের ব্যাপক সংক্রমণের প্রমাণ পাওয়া যায়। এরপর প্রায় মহামারি আকারে এই ফ্লু ছড়িয়ে পড়ে নানা দেশে। ধারণা করা হয়, ২০১৩ সাল পর্যন্ত বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রায় ২ লাখ মানুষ সোয়াইন ফ্লু’তে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন।
বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে সাপ্তাহিক ভিত্তিতে ফ্লু’র পরীক্ষা চালানো হয় এবং সেগুলো নিয়মিত পর্যবেক্ষণে রাখা হয় বলে বিবিসিকে জানান সাবরিনা ফ্লোরা। তার ভাষায়, খুব বড় সংখ্যায় না হলেও সারাদেশেই আমরা এই ফ্লু রোগী দেখতে পাই। তিনি জানান, এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত এই রোগের হার বেশি থাকে। এই রোগের প্রতিষেধক সরকারের কাছে রয়েছে। আবার কয়েকটা প্রতিষ্ঠান বাণিজ্যিকভাবেও তৈরি করছে।
ডাক্তার ফ্লোরা জানান, বাংলাদেশে প্রথম সোয়াইন ফ্লু’র উপস্থিতি নিশ্চিত হয় ২০০৯ সালে। ২০১০ সালে বাংলাদেশে সোয়াইন ফ্লু’র টিকাদান কর্মসূচি চালানো হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সেসময় বাংলাদেশের মানুষের জন্য বিনামূল্যে সোয়াইন ফ্লু’র টিকা পাঠায়। এরপর গত এক দশকে দেশের বিভিন্ন জায়গায় সোয়াইন ফ্লু আক্রান্ত রোগী পাওয়া যায়। ২০১৫ সালে ইন্ডিয়ার কয়েকটি রাজ্যে সোয়াইন ফ্লু আক্রান্ত হয়ে কয়েক হাজার মানুষ মারা যাওয়ার পর এই বিষয়টি আবারো আলোচনায় আসে। সোয়াইন ফ্লু যেন ছড়িয়ে না পড়তে পারে, তা নিশ্চিত করতে সেসময় নানারকম সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নেয়া হয় স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে। এই সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে সেসময় অনেক চিকিৎসককে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। বিশেষ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেয়া হয় বাংলাদেশের বন্দরগুলোতে। থার্মাল স্ক্যানার ব্যবহার করে বিদেশ থেকে আসা ব্যক্তিদের পরীক্ষা করার নির্দেশ দেয়া হয়।
এর পর সেই কার্যক্রম অবশ্য কিছুটা থমকে গেছে। একজন সাবেক এমপির মৃত্যুর পর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হলেও আতঙ্কিত হওয়ার মত কোনও কারণ নেই বলেই দেশবাসীকে আশ্বস্ত করেছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

