প্রার্থীদের সম্পদের বিবরণ যাচাইয়ে আগ্রহী নয় ইসি
উত্তরদক্ষিণ অনলাইন । ০২ জানুয়ারি ২০২০ । আপডেট ১৮:৫৪
শত কোটি টাকার মালিক তাপস, ৬ কোটি আছে ইশরাকের, তাবিথের আছে ৪৫ কোটি টাকা, আতিকের ১২
মোহাম্মদ শিহাব : ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন দেশে বর্তমানে আলোচনার প্রধান ইস্যু। আগামী ৩০ জানুয়ারি ভোটগ্রহণ। এরই মধ্যে দুই বৃহস্পতিবার (২ জানুয়ারি) দুই সিটিতে প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই শেষে বৈধ প্রার্থীদের তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। অনেকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রধান রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরা নির্বাচন কমিশনের হলফ নামায় সম্পদের যে বিবরণ দিয়েছেন সেটি নিয়ে এখন বেশ আলোচনা হচ্ছে। কিন্তু নির্বাচন কমিশনের (ইসি) এ নিয়ে কোনো মাথা ব্যথা নেই।
সূত্রমতে, নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে প্রার্থীদের সম্পদের বিবরণ এবং শিক্ষাগত যোগ্যতাসহ ৮টি বিষয়ের তথ্য দেয়া বাধ্যতামূলক করা হয় ২০০৮ সাল থেকে। তবে সম্পদ নিয়েই আলোচনা হয় বেশি। প্রার্থীদের দেয়া সম্পদের বিবরণ কতটা সত্য-অসত্য সেটি নিয়েও প্রশ্ন দেখা দেয় অনেকের ক্ষেত্রে। প্রশ্ন হচ্ছে, সম্পদের এ বিবরণ দিয়ে নির্বাচন কমিশন কী করে? ইসি কি এই বিবরণ যাচাই-বাছাই করে? মনোনয়ন বৈধ-অবৈধ হওয়ার ক্ষেত্রে এই বিবরণের কি কোনও সম্পর্ক আছে? নির্বাচনের ওপর এর আদৌ কোনও প্রভাব থাকে? এমন অনেক প্রশ্ন রাজনৈতিক সচেতন মহলের। তবে এর সহজ উত্তরে বলা যেতে পারে, ভোটে এর কোনও গুরুত্ব নেই। ইসি এ নিয়ে কোনও কাজ বা যাচাই-বাছাইও করে না। তবে গণমাধ্যমে কারো বিরুদ্ধে এই তথ্যের ভিত্তিতে সংবাদ প্রচার করলে দুদক যদি মনে করে বিবরণীতে অসঙ্গতি আছে তবে তদন্ত করা হয় কোনো কোনো ক্ষেত্রে।
আতিকের চেয়ে তাবিথের সম্পদ চারগুণ বেশি: ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী আতিকুল ইসলাম একজন ধনাঢ্য ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত। নির্বাচন কমিশনে দাখিল করা হলফ-নামায় তিনি যে সম্পদের বিবরণ দিয়েছেন, সেখানে দেখা যাচ্ছে- নিজের নামে বাড়ি থাকলেও তার নামে কোনও গাড়ি নেই। তার ১৬টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে এবং স্থাবর এবং অস্থাবর- সবমিলিয়ে তার সম্পদের পরিমাণ প্রায় ১২ কোটি টাকা।
অন্যদিকে তার প্রতিন্দ্বন্দ্বী বিএনপি প্রার্থী তাবিথ আউয়ালও একজন ব্যবসায়ী। ৩৭টি প্রতিষ্ঠানের মালিকানা রয়েছে তার। তার অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৪৫ কোটি টাকা।
শত কোটি টাকার মালিক তাপস: ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী ফজলে নূর তাপস হলফ-নামায় দেখিয়েছেন, অস্থাবর এবং স্থাবর- সব মিলিয়ে তার সম্পদ ১০০ কোটি টাকার বেশি।
বিপরীতে বিএনপি প্রার্থী ইশরাক হোসেন সব মিলিয়ে প্রায় ৬ কোটি টাকার সম্পদ দেখিয়েছেন।
প্রার্থীদের সম্পদ বিবরণী কতটা সত্য?: বিশ্লেষকরা মনে করেন, প্রার্থীরা সম্পদের যে বিবরণ দিচ্ছেন, তাতে তথ্য গোপনের মতো বিষয় থাকতে পারে বলে তাদের আশংকা। যেহেতু সম্পদের বিবরণ নির্বাচন কমিশন যাচাই করে না, সেজন্য এ হলফনামা ভোটারদের কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে পারছেন না।
প্রার্থীরা যাতে সম্পদের বিবরণ জমা দেন সেজন্য সেসব সংগঠন বহু আগে থেকে দাবি তুলে আসছিল তাদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে সুশাসনের জন্য নাগরিক- সুজন। সুজনের সাথে সম্পৃক্ত অধ্যাপক তোফায়েল আহমেদ মনে করেন, প্রার্থীদের দেয়া তথ্য কতটা সঠিক সেটি নিয়ে অনেকের মনেই সংশয় আছে। তিনি বিবিসিকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, সম্পদের বিবরণের মাধ্যমে অনেক চাঞ্চল্যকর তথ্য বের হয় এবং এগুলো বেশ আলোচিত হয়। ইলেকশন কমিশনের কাজ হচ্ছে এ তথ্যগুলো চ্যালেঞ্জ করা। নির্বাচন কমিশন যদি এগুলো যাচাই করে দেখে তাহলে বিরাট কার্যকারিতা এসে যায়।’ নির্বাচন পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ফেমার মুনিরা খান বলছেন, প্রার্থীদের দেয়া তথ্য সঠিক কিনা সেটি যাচাই করে দেখা সময় সাপেক্ষ কাজ নয়।
ইসি কেন তথ্য যাচাই করে না?: নির্বাচন কমিশনের সচিব মোহাম্মদ আলমগীর এক সাক্ষাৎকারে বলেন, প্রার্থীরা যদি হলফ-নামায় কোনও ভুল তথ্য দিয়ে থাকে তাহলে সেটির দায়-দায়িত্ব প্রার্থীর ওপর বর্তায়। এক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের কিছু করণীয় নেই। সচিব আলমগীর বলেন, প্রার্থীদের দেয়া হলফনামা আমরা ওয়েবসাইটে প্রকাশ করি, যাতে জনগণ এটা দেখতে পারে। ভোটাররা যাতে বিবেচনা করে তাদের মূল্যায়ন করে ভোট দিতে পারেন। এটা হলো আইনগত বিষয়। ইসি সচিব আরও বলেন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড যদি মনে করে যে, প্রার্থীরা সম্পদের হিসাবে গরমিল করেছেন, তাহলে তারা বিষয়টিতে ব্যবস্থা নিতে পারে।
তবে সম্পদের হিসাবে যাচাই না করে নির্বাচন কমিশন তাদের দায় এড়িয়ে যাচ্ছে বলে মনে করেন সুজন কর্মী অধ্যাপক তোফায়েল আহমেদ। তিনি মনে করেন, এসব তথ্য যাচাইয়ের পরেই মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা উচিত। এর জবাবে সচিব আলমগীর বলেন, সম্পদ যাচাই করার কাজটি নির্বাচন করতেও চায় না। সচিব আলমগীর মনে করেন, নির্বাচন কমিশন এতো দায়িত্ব নিলে কাজ সঠিকভাবে সম্পন্ন করা কঠিন হবে। সব ক্ষমতা একটি জায়গায় কেন্দ্রীভূত হবার আশংকার কথাও জানান তিনি।

