শীতের সঙ্গে বেড়েছে রোগের প্রকোপ, ঠাঁই নেই হাসপাতালগুলোতে
উত্তরদক্ষিণ অনলাইন । ০৫ জানুয়ারি ২০২০ । আপডেট ১৫:১৬
বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বায়ুদূষণের শহরগুলোর মধ্যে অন্যতম রাজধানী ঢাকা। শীত মৌসুমের শুষ্ক হাওয়ায় ধুলার কারণে এই দূষণের মাত্রা এখন আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। তার সঙ্গে হঠাৎ করেই শীতের তীব্রতা বেড়ে যাওয়ায় বিভিন্ন ধরনের রোগ-ব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছেন নগরবাসী। একে তো ঢাকার বায়ুদূষণ, তার ওপর তীব্র শীতের প্রকোপ−দুইয়ে মিলে নানান রোগে আক্রান্তদের ভিড়ে রাজধানীর হাসপাতালগুলোতে এখন আর ঠাঁই নেই। এমনটাই জানা গেছে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে।
স্বাস্থ্য অধিদফতর বলছে, গত বছরের নভেম্বর মাস থেকে শনিবার (৪ জানুয়ারি) পর্যন্ত ডায়রিয়া, শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ এবং অন্যান্য অসুস্থতায় (জন্ডিস, আমাশয়, চোখের প্রদাহ, চর্মরোগ এবং জ্বর) আক্রান্তের হার গত বছরের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি। বেড়েছে মৃতের সংখ্যাও। এর কারণ হিসেবে তারা বলছেন, বায়ুদূষণের সঙ্গে হঠাৎ করেই যোগ হয়েছে তীব্র শীত। যে কারণে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে।
চিকিৎসকরা বলছেন, শীতের সময়ে বায়ুদূষণের সঙ্গে হঠাৎ করে শৈত্যপ্রবাহ যোগ হওয়ায় অ্যাজমা, ডায়রিয়া, ব্রংকিউলাইটিস, নিউমোনিয়া, চর্মরোগ, চোখের প্রদাহের রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। তবে এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে শিশু ও বৃদ্ধরা।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের হিসাব মতে, গত বছরের ১ নভেম্বর থেকে চলতি বছরের ৪ জানুয়ারি পর্যন্ত নানান অসুখে আক্রান্ত হয়েছেন ৩ লাখ ১৭ হাজার ৪৪৯ জন। এর মধ্যে শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণে আক্রান্ত হয়েছেন ৫০ হাজার ৭৮৬ জন, ডায়রিয়াতে আক্রান্ত হয়েছেন ১ লাখ ২৫ হাজার ৬৫৩ জন এবং শীতকালীন অন্যান্য অসুস্থতায় আক্রান্ত হয়েছেন ১ লাখ ৪১ হাজার ১০ জন। অন্যান্য অসুস্থতার ভেতর রয়েছে- জন্ডিস, আমাশয়, চোখের প্রদাহ, চর্মরোগ এবং জ্বর। একই সময়ে আক্রান্তদের মধ্যে মারা গেছেন ৬১ জন। এর মধ্যে শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ১৭ জন, ডায়রিয়াতে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ৪ জন এবং অন্যান্য অসুস্থতায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ৩০ জন। শুধু নভেম্বর মাসে শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণে মারা গেছেন ১৫ জন, ডিসেম্বরে মারা গেছেন ২ জন, ডায়রিয়াতে ডিসেম্বরে কেউ মারা না গেলেও নভেম্বরে মারা গেছেন ৪ জন। এছাড়া অন্যান্য অসুস্থতায় নভেম্বরে মারা গেছেন ২৯ জন, আর ডিসেম্বরে মারা গেছেন ১ জন।
স্বাস্থ্য অধিদফতর বলছে, ২০১৮ সালের নভেম্বর থেকে ২০১৯ সালের মার্চ পর্যন্ত শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণে আক্রান্ত হয়েছিলেন ২০ হাজার ৪৪৬ জন, ডায়রিয়াতে আক্রান্ত হয়েছিলেন ৩৫ হাজার ৮৮১ জন আর অন্যান্য অসুস্থতায় আক্রান্ত হয়েছিলেন ৩০ হাজার ৪৩২ জন। মারা গিয়েছিলেন ১১ জন।
ডা. আয়শা আক্তার বলেন, ধুলাবালুর সঙ্গে হাঁচি-কাশি বেড়ে যাবে। এগুলো সবই ছোঁয়াচে রোগ। বাতাসের মাধ্যমে একজনের কাছ থেকে আরেকজনে ছড়ায়। হাঁচি-কাশিতে আক্রান্ত একজনের থেকে একহাত দূরত্বে থাকা আরেকজন সুস্থ মানুষ আক্রান্ত হতে পারেন। এজন্য নাক-মুখে রুমাল চেপে হাঁচি-কাশি দিতে হবে, যাতে সেটি না ছড়াতে পারে। তাছাড়া সুস্থদেরকে বাহিরে চলাচলের সময় মাস্ক ব্যবহার করা জরুরি। এতে সংক্রামন থেকে নিজেকে রক্ষা করা অনেকটা সম্ভব। তিনি আরও বলেন, দূষিত বাতাসের কারণে অ্যাজমা আক্রান্তদের হাঁপানি বেড়ে যাচ্ছে, সিওপিডি (ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ যা ফুসফুসের এক ধরনের জটিল রোগ) বাড়ছে।
ঢাকা শিশু হাসপাতালের আবাসিক সহকারী অধ্যাপক ডা. রিজওয়ানুল আহসান বলেন, শৈত্যপ্রবাহের সময়ে শিশু রোগীর সংখ্যা বেড়ে গিয়েছিল। তবে শীত একটু কমে আসার কারণে আবার রোগীর সংখ্যা কিছুটা কমেছে। নতুন করে শৈত্যপ্রবাহ শুরু হতে চলেছে। ফলে রুগির সংখ্যার ফের বাড়ার আশঙ্কা করছেন ডা. রিজওয়ানুল আহসান।
তাপমাত্রা কমতে পারে ৩ ডিগ্রি: কয়েকদিনের বৃষ্টির কারণে সারাদেশে কমতে শুরু করেছে তাপমাত্রা। শনিবারের তুলনায় রোববার (৫ জানুয়ারি) তাপমাত্রা কমেছে গড়ে তিন ডিগ্রি সেলসিয়াস। এদিন রাতের মধ্যে তাপমাত্রা আরও এক থেকে তিন ডিগ্রি সেলসিয়াস কমে যাওয়ার আশঙ্কা করছে আবহাওয়া অধিদফতর। সোমবারও আবহাওয়া একইরকম থাকতে পারে। চলতি সপ্তাহের শেষে ফের আসবে শৈত্যপ্রবাহ।
আবহওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, রোববার দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা তেঁতুলিয়ায় ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস। শনিবার এই তাপমাত্রা ছিল দিনাজপুরে ১২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এছাড়া, ঢাকায় এদিন ১৬ দশমিক ৩, যা শনিবার ছিল ১৭, ময়মনসিংহে ১৫ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তবে চট্টগ্রামে রোববার তাপমাত্রা কিছুটা বেড়েছে, সেখানকার এদিন তাপমাত্রা ১৮ ডিগ্রি সেলেসিয়াস, যা শনিবার ছিল ১৭ দশমিক ২ ডিগ্রি। সিলেটে তাপমাত্রা ২ ডিগ্রি কমে রোববার ১৫-তে নেমেছে। রাজশাহীতেও ১৫, বরিশালে ১৫ দশমিক ৩, রংপুরে ১৩ দশমিক ৮ এবং খুলনায় রোববার তাপমাত্রা ছিল ১৫ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
আবহাওয়ার পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার পূর্বাভাসে বলা হয়, যশোর, কুষ্টিয়া ও চট্টগ্রাম অঞ্চলসহ ঢাকা, ময়মনসিংহ, রংপুর, রাজশাহী ও সিলেট বিভাগের দু’এক জায়গায় হালকা অথবা গুঁড়ি থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। এছাড়া, দেশের অন্য এলাকায় আকাশ মেঘলাসহ আবহাওয়া প্রধানত শুষ্ক থাকতে পারে। মধ্য রাত থেকে সকাল পর্যন্ত দেশের কোথাও কোথাও হালকা থেকে মাঝারি ধরনের কুয়াশা পড়তে পারে। সারাদেশের রাতের তাপমাত্রা এক থেকে তিন ডিগ্রি সেলসিয়াস কমতে পারে। আবহাওয়াবিদ আরিফ হোসেন এ তথ্য জানিয়েছেন।

