এ বছর দেশে সংবাদের প্রধান ইস্যু হতে পারে যে বিষয়গুলো

উত্তরদক্ষিণ অনলাইন । ০৭ জানুয়ারি ২০২০ । আপডেট ১৩:৩৪

আফসান চৌধুরী : ২০১৯ সাল বাংলাদেশের জন্য খুব টালমাটাল ছিল না। যদিও অপ্রত্যাশিত ছিল অনেক কিছু। কখনও কখনও উদ্বেগজনক পরিস্থিতিও তৈরি হয়েছিল। কিন্তু ক্ষমতাসীন পক্ষগুলো শক্তিশালী ও সঙ্ঘবদ্ধ থাকায় নাড়া দেয়ার মতো বড় কোনও ঝড় আসেনি। তবে রাষ্ট্রের কাঠামো এখন একইসাথে জোরালো ও দুর্বল মনে হচ্ছে। আর এটার সবচেয়ে স্পষ্ট প্রতিফলন হয়েছে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে।

বাংলাদেশ এ অঞ্চলের শীর্ষ জিডিপি অর্জনকারী দেশ হিসেবে আবীর্ভূত হয়েছে এবং দেশের প্রবৃদ্ধির হার অন্যদেরকে ছাড়িয়ে গেছে। বিগত বেশ কয়েক বছর ধরেই এই ধারাটা চলে আসছে। তবে, আগামী বছর দুটো ইস্যু এ ক্ষেত্রে ঝামেলা তৈরি করতে যাচ্ছে। এগুলো হলো সম্পদের খুবই অসম বণ্টন এবং আয়ের বৈষম্য সম্পর্কিত। বাংলাদেশে বিরাট ধনী ব্যক্তিদের প্রবৃদ্ধি হয়েছে আকাশচুম্বি, এমনকি চীনের চেয়েও বেশি যেখানে ‘দ্রুত ধনী বনে যাও’ সিনড্রোম এখন সবার কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। ফলে এমন একটা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে- যেখানে অন্যান্য শ্রেণীর সাথে সম্পর্কটি কোণঠাসা হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত শ্রেণী এখন আর রাজনৈতিক-সামাজিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ নয় এবং ক্ষমতাসীন দল তাদেরকে এড়াতে পেরে খুশিতেই আছে। মজার ব্যাপার হলো, মধ্যবিত্ত শ্রেণী নিজেও এটা নিয়ে খুব একটা গা করছে না যতক্ষণ তাদের ভোক্তা সংস্কৃতিতে কোনও বাধা সৃষ্টি না হচ্ছে।

কোনও ধরনের ভিন্নমতকে উৎসাহ দেয়া হচ্ছে না এবং সে কারণে একটা ‘ঐক্যমতের সমাজের’ আবির্ভাব হচ্ছে। এর ফল হলো- এক দীর্ঘ সারির মানুষের সৃষ্টি হচ্ছে, যারা এই পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে চলতে চায়। এটা কোনও দলীয় অবস্থান নয় বরং ক্ষমতা ভাগাভাগির মধ্যে যে চারটি উপাদান রয়েছে, সেগুলোর জোটের অবস্থান: যেগুলো হলো সেনাবাহিনী, আমলাতন্ত্র, ব্যবসায়ী মহল আর রাজনীতিবিদগণ।

ব্যাংকের অবস্থা স্বাস্থ্যকর নয়: ২০২০ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যখন তার তৃতীয় মেয়াদের শাসনকাল অব্যাহত রাখতে যাচ্ছেন, এ অবস্থায় তার সরকারকে সেই বিষয়ের দিকে নজর রাখতে হবে, যেটা এখন এশিয়ার বৃহত্তম বাজেট ঘাটতির রূপ নিয়েছে। এটা একটা উদ্বেগের বিষয়, যেটা রমরমা প্রবৃদ্ধির ঝড়ে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে। অর্থনীতির মধ্যে প্রবল দুর্বল দিক রয়েছে, যেটা খুবই স্পষ্ট এবং রাজস্ব আদায়ের হার হ্রাস ও ব্যাংকগুলোর অলস ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধির মধ্য দিয়ে যেটার প্রতিফলন ঘটেছে।

উভয় ক্ষেত্রেই অভিযোগের আঙ্গুলগুলো উঠছে অর্থনৈতিক সিস্টেমের অনানুষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনার দিকে, যেটা যোগাযোগ ও নেটওয়ার্ক ও দুর্নীতির উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে, শক্ত নীতিমালার ভিত্তিতে নয়। এই মডেল কিছু সময়ের জন্য কাজ করে এবং করতে পারে। কিন্তু এর সাথে যে বিপদ জড়িত, সেটা কোনওভাবেই ছোট নয়। এখন পর্যন্ত ব্যাংকিং খাত মানি লন্ডারিংয়ের মাধ্যম হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে এবং সুদের হার এক ডিজিটে নামিয়ে আনার জন্য সরকারের আহ্বানে কোনও সাড়া মেলেনি। কিন্তু এখন এটার আদেশ দেয়া হয়েছে। এটা ভালো। কিন্তু এর অর্থ দাঁড়াচ্ছে যে ৮% সুদের হারে যে পুঁজি দেয়া হয়েছে, সেটার উপর এর প্রভাব পড়ছে এবং সেটাকে ৬ শতাংশে নামিয়ে আনা হচ্ছে। অফিসিয়াল সেভিং সিস্টেমগুলোর উপর অর্থ ছাড়ের আগেই ৫% কর চাপিয়ে দেয়া হয়েছিল, যেটা বিনিয়োগের ঐতিহ্যগত ভিত্তি– মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উপর ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল। যদিও এখানে কিছুটা নমনীয়তা দেখানোর পরিকল্পনা রয়েছে। কিন্তু বড় অঙ্কের ঋণের ক্ষেত্রে ক্ষমতাধরদের অবাধ সুযোগ এবং মধ্যম পর্যায়ের ব্যক্তিদের বিশেষ করে সিনিয়রদের জন্য সীমিত বিনিয়োগ সুবিধা একটা ইস্যু তৈরি করবে, যেটা হয়তো অবজ্ঞা করা যেতে পারে। কিন্তু শেষ বিচারে এটা সুশাসনের মানের ক্ষেত্রে একটি দাগ হয়ে থাকবে।

ডেঙ্গু মহামারী এবং বর্তমান অবস্থা: ২০১৯ সালে বাংলাদেশকে আরেকটি যে সঙ্কট নাড়া দিয়ে গেছে, সেটা হলো ইতিহাসের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ মশাবাহিত ডেঙ্গু মহামারি। মৃতের সংখ্যা কয়েকশ হবে। কিন্তু আক্রান্তের সংখ্যা এর ১০০ গুণ বেশি। মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতার মাত্রা চরম পর্যায়ে চলে গিয়েছিল। সরকারি স্বাস্থ্যসেবা এবং মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশানের ব্যাপারে আদৌ যদি কোনও আস্থা থেকে থাকে, তাহলে সেটা তলানিতে চলে গেছে। যেহেতু, এই পরিস্থিতিটা দীর্ঘ সময় ধরে চলছে। তাই সাধারণ মানুষের ধারণা হলো- এই ইস্যুটি মোকাবিলার সক্ষমতা তাদের আয়ত্বের বাইরে চলে গেছে। এখানেই অভ্যন্তরীণ সুশাসনের সঙ্কটকে চিহ্নিত করতে হবে। অর্থনীতি ও জনস্বাস্থ্যের মতো প্রধান সমস্যাগুলোর ব্যবস্থাপনার মতো সক্ষমতা কি এই শাসন ব্যবস্থার মধ্যে আছে? বাংলাদেশ এটা প্রমাণ করেছে যে, উচ্চ জিডিপির সাথে জনগণের উচ্চ জীবনমান অর্জনের সক্ষমতা অর্জিত হয় না। সাধারণের মধ্যে এ রকম একটা ধারণা রয়েছে যে, পরিস্থিতি এভাবেই চলবে এবং সেটা পরিবর্তনের সম্ভাবনাও খুবই সামান্য। রাজনৈতিক কাঠামোর দুর্বলতার কারণে, বর্তমান নেতাদের পরবর্তী প্রজন্মের সময়ে রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থা নিয়ে এক ধরনের উদ্বেগ রয়েছে, সেটা ক্ষমতাসীন ও বিরোধী অবস্থানে থাকা সকল পক্ষের জন্যই এবং এই দলগুলো রাজনৈতিক প্রজ্ঞাসম্পন্ন দ্বিতীয় সারির উত্তরাধীকারীদের লালনপালনের ক্ষেত্রে তেমন কোন সক্ষমতা দেখাতে পারছে না।

মিয়ানমার ও আসাম: গত বছরে আরও দুটো ইস্যুর উত্থান হয়েছে, যেগুলো হলো শরণার্থী সম্পর্কিত – এবং এগুলো বর্তমানে ও ভবিষ্যতে বাংলাদেশে ইস্যু হয়ে উঠবে। অনেক শোরগোল সত্বেও রোহিঙ্গা শরণার্থী ইস্যুটি যেখানে ছিল ঠিক সেখানেই আছে এবং কেউই এটার সমাধানে আগ্রহী বলে মনে হচ্ছে না। যেহেতু সবশেষ উচ্ছেদের বিষয়টি সৃষ্টি হয়েছে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সমস্যার কারণে, তাই এ সমস্যার সমাধানের সম্ভাবনা খুবই কম। আকারে হয়তো বড় হবে না এই সমস্যাটি কিন্তু শিগগিরই চলে যাওয়ার সম্ভাবনাও দেখা যাচ্ছে না। সবশেষে আসলো ভারতের সিএএ এবং এনআরসি। ভারতের উপর এর প্রভাব খুবই স্পষ্ট কিন্তু বাংলাদেশের উপর এর প্রভাব কতটা পড়বে, সেটা এখনও স্পষ্ট নয়। কয়েক দশকের মধ্যে যেটা ভারতের সবচেয়ে ভয়াবহ অভ্যন্তরীণ সঙ্কট হয়ে উঠেছে, সেটার ব্যাপারে ভারতের প্রস্তুতি ছিল অবাক করার মতো সামান্য। এটার অর্থ কি হতে পারে, সেটা এখন আর বিবেচ্য নয়, এখন বিবেচ্য হলো এ ব্যাপারে জনগণের বিরোধিতার অর্থ কি দাঁড়াবে – সেটা। ভারত কেন তাদের ২০০ মিলিয়ন মুসলিমকে বিচ্ছিন্ন করে দিতে চাচ্ছে, সেটা একটা ২০০ মিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন।

শরণার্থীরা যদি স্বল্প সংখ্যায় বাংলাদেশে ঢুকতে থাকে, তাহলে বাংলাদেশের সমস্যা হবে কম। যদি বেশি সংখ্যায় আসে, তাহলে সমস্যার আকারও বড় হতে পারে। কিভাবে সেটা ঘটবে সেটা যে কেউ কল্পনা করতে পারবে, কিন্তু ভারত এনআরসি নিয়ে যেভাবে পুরো বিষয়টি নেতিবাচকভাবে চিহ্নিত করেছে, বাংলাদেশ সেটা করেনি। যে কেউ ভাবতে পারেন যে বাংলাদেশ হয়তো অতিরিক্ত প্রস্তুত হয়ে আছে, কিন্তু কাজ সম্পাদনের সক্ষমতা এবং দক্ষতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের যে দুর্বলতা রয়েছে, সেটা হয়তো প্রত্যাশার চেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠতে পারে।

লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও প্রবন্ধিক।

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading