রাজধানীর বেকারি কারখানায় নিম্নমানের খাদ্যপণ্য উৎপাদন

রাজধানীর বেকারি কারখানায় নিম্নমানের খাদ্যপণ্য উৎপাদন

উত্তরদক্ষিণ অনলাইন । ২০ জানুয়ারি ২০২০ । আপডেট ১৮:৩২

রাজধানীর মোহাম্মাদপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় নামে-বেনামে বৈধ-অবৈধ বেকারি কারখানার ছাড়াছড়ি। এসব কারখানায় নিম্নমানের খাদ্যপণ্য উৎপাদন করা হচ্ছে। এসব খাদ্যপণ্যে রাজধানীর বাজার ছয়লাব। বিশেষ করে ছোট ছোট চায়ের দোকানে মানহীন, উৎপাদন ও মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ ছাড়া তৈরি পণ্যগুলো বিক্রি হচ্ছে। এসব খাবার খেয়ে অসুস্থ হচ্ছেন অনেকে। প্রশাসনের এক্ষেত্রে কোনো পদক্ষেপ না থাকায় কারখানা মালিকদের ব্যবসা এখন বেশ রমরমা।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বেশিরভাগ কারখানায় বিএসটিআইয়ের আইনের তোয়াক্কা করছে না

কারখানা মালিকরা। এই মালিকদের বেশিরভাগ স্থানীয় প্রভাবশালী ও ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে জড়িত থাকায় তাদের বিরুদ্ধে কেউ কথা বলারও সাহস পাচ্ছেন না। তাছাড়া সংশ্লিষ্ট প্রশাসনও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে আন্তরিক নয় বলে অভিযোগ আছে।

সূত্রমতে, মোহাম্মদপুরের বেড়িবাঁধ, কাটাসুর, বছিলা, বছিলা ব্রিজ, শেরে বাংলা রোড, নবোদয় হাউজিং, চাঁদ উদ্যান, ঢাকা উদ্যানসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে অন্তত ২০টি বেকারি ফ্যাক্টরি। এর মধ্যে কোনও কোনওটির বিএসটিআইয়ের অনুমোদনও নেই। আবার যেগুলোর অনুমোদন আছে- সেগুলোতেই আইন না মেনে নোংরা পরিবেশে নিম্নমানের খাদ্যপণ্য উৎপাদন করা হয়। এসব কারখানার বেশির ভাগ ক্ষেত্রে কোনো সাইন বোর্ড নেই। ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান ও প্রশাসনের হস্তক্ষেপ এড়াতে ওইসব প্রতিষ্ঠান বাহিরে সাইন বোর্ড ব্যবহার করে না বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে।

সরে জমিনে গিয়ে দেখা গেছে, পাউরুটি/বন রুটি, বিভিন্ন সাইজের কেকসহ নানা ধরনের বিস্কুটের মোড়কে উৎপাদনের ও মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ এবং মূল্য উল্লেখ নেই। এসব পণ্যের প্যাকেটগুলোর মুখ খোলা রাখা হয়। ফলে এতে ধুলা-বালি ও মাছি প্রবেশ করে নানা ধরনের রোগ-জীবাণু ছড়ায়। এসব খাবার খেয়ে অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়েন। জানা গেছে, নিম্ন আয়ের মানুষ তথা শ্রমিকরাই এসব খাবার বেশি খেয়ে থাকেন। এসব খাবার খেয়ে তারা পেটের অসুখ ও অরুচি এমনকি ডায়রিয়া-আমাশাসহ নানা ধরনের রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। 

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পণ্যের মোড়কে উৎপাদনের ও মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ এবং মূল্য উল্লেখ না থাকা জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনে দণ্ডনীয় অপরাধ। এছাড়া কারখানাগুলোর ভেতরের পরিবেশ বেশির ভাগ ক্ষেত্রে নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর। কিন্তু প্রভাবশালী ব্যক্তিরা এর সঙ্গে জড়িত থাকায় স্থানীয় প্রশাসনও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে না বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয়রা জানিয়েছেন। তাছাড়া আবাসিক এলাকায় এসব কারখানা গড়ে ওঠায় বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা করা হচ্ছে। কারখানাগুলোর সঙ্গে লাগোয়া ভবনে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করতে বাধ্য হচ্ছেন হাজার হাজার মানুষ।

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, ওইসব কারখানায় উৎপাদিত মেয়াদহীন রুটি ও কেকগুলো মোহাম্মদপুর, লালমাটিয়া, আদাবর, বছিলা, ঢাকা উদ্যান, ধানমন্ডি, শ্যামলী, কলেজগেট, আসাদগেট, জাতীয় সংসদ ভবন এলাকাসহ আশপাশের অন্তত ৫ হাজার ফুটপাথের চায়ের দোকানে বিক্রি হয়। ছোট দোকানে এসব পণ্য বিক্রি হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে অভিযানে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর বা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত মানবিক কারণে আগ্রাহী নয়। এই সুযোগ নিয়েই মূলত কারখানাগুলো নিয়মনীতি উপেক্ষা করে রমরমা ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে।

এবিষয়ে মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ডের একজন চা দোকানির কাছে জানতে চাইলে তিনি নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, প্রতিদিন সকালে কারখানা থেকে যেই রুটি ও কেক দেয়া হয়, তাতে উৎপাদনের তারিখ উল্লেখ থাকে না। এটা কোনো কোম্পানিরই থাকে না। তিনি আরও জানান, এগুলো শুধু বাসস্ট্যান্ডেই নয়, হাসপাতাল এমনকি কোর্টের সামনেও বিক্রি হয়। এটা আইনগতভাবে অবৈধ জানেন কিনা- এমন প্রশ্নে ওই দোকানি বলেন, এখানে আমাদের তো কিছু করার নেই। কোম্পানিগুলো তারিখ না উল্লেখ করলে আমাদের কী করার আছে!

তবে ভিন্ন কথা বলেছেন, নবোদয় হাউজিং এলাকার ‘রনি ব্রেড এন্ড বিস্কুট ফ্যাক্টরী’র মালিক। ওই কারখানা মালিকের ভাষ্য, আমরা সবগুলোতেই তারিখ উল্লেখ করি। কিন্তু দোকানদাররা অনেক সময় তা তুলে ফেলে দেয়। এসময় কারখানায় রাখা বেশ কিছু কেকের প্যাকেটে তারিখ ও মূল্য উল্লেখ না থাকার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, এগুলো ডেলিভারি দেয়ার আগে ডেট লাগিয়ে দেয়া হবে। তবে দোকানে থাকা তার ফ্যাক্টরি উৎপাদিত পণ্যের ছবি দেখানো হলে এক পর্যায়ে তিনি বলেন, রাতে যে মালগুলো যায় সেখানে কিছুটা এমন হতে পারে, এটা অস্বীকার করছি না। প্রসঙ্গত, রনি মধুবন ব্র্যান্ড নামে রুটি বিভিন্ন চায়ের ও স্টেশনারি দোকানে বিক্রি হতে দেখা গেছে। যার প্যাকেটে উৎপাদনের ও মেয়াদ উত্তীর্ণের তারিখ নেই।

সরেজমিনে মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধ সংলঘ্ন চাঁদ উদ্যানে ‘শাহপরান ব্রেড এন্ড বিস্কুট ফ্যাক্টরী’তে দেখা গেছে ভয়াবহ চিত্র। কারখানার ভেতরে নোংরা পরিবেশে ফ্লোরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ফেলে রাখা হয়েছে ফ্যাক্টরিতে তৈরি বিস্কুট, কেক ও রুটিগুলো। সবখানে মাছি ভন ভন করছিল তখন। ওই কারখানার ভেতরে ঢুকলেই যে কারো গা ছমছম করবে। সেই পরিবেশেই এসব খাদ্যপণ্য তৈরি হচ্ছে প্রতিনিয়ত। কারখানাটির বাহিরে কোনো সাইন বোর্ড নেই। দেয়ালে একটি মাদ্রাসার বিজ্ঞাপন শোভা পাচ্ছে। অপরিচিত কেউ সেখানে গেলে কারখানাটিকে মাদ্রাসা মনে করবেন হয়তো। কারখানাটির ওই পরিবেশের ছবি তুলতে গেলে এর কর্মচারীরা সাংবাদিকদের দিকে তেড়ে আসেন। এর মধ্যে ইউসুফ আলী একজন মারমুখি হয়ে ওঠেন।

ছবি তোলার কারণে উত্তেজিত হয়ে তিনি বলেন, আপনারা ফ্যাক্টরির মালিক না আসা পর্যন্ত যেতে পারবেন না। কারখানার ম্যানেজারসহ অন্য কর্মচারীরাও ছিলেন অনেকটা মারমুখি। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ওই কারখানাটির মালিকের নাম মোহাম্মদ আলী। তিনি ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। তবে কোনও পদে আছেন কিনা তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ফ্যাক্টরির ভেতর স্থানীয় এমপি সাদেক খানের সঙ্গে মোহাম্মদ আলীর ছবিসহ একটি পোস্টার টানানো দেখা গেছে। সেখানেও মোহাম্মদ আলীর কোনো পদ বা পরিচয় দেয়া নেই।

পরে মোবাইল ফোনে এক সাংবাদিককে হুমকির সুরে মোহাম্মদ আলী বলেন, আপনারা আমার ফ্যাক্টরিতে আসছিলেন, যেনে শুনে আসবে না। সাহস থাকলে এখন আসেন, আমি এখন কারখানায় আছি। উল্লেখ্য অন্যান্য কোম্পানির ন্যায় শাহপরান কোম্পানিরও বিভিন্ন ধরনের পাউরুটি/বনরুটি ও কেকের মোড়কে উৎপাদনের ও মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ উল্লেখ নেই। তাছাড়া ফ্যাক্টরিতে ৪ বছর পর্যন্ত বাহিরে সাইন বোর্ড ব্যবহার করা হয়নি। কারখানাটির ম্যানেজার নিজেই তা শিকার করেছেন।

শাহজালাল, বিসমিল্লাহ, সুইট ব্রেডসহ মোহাম্মদপুরের অন্যান্য বেকারি ফ্যাক্টরিগুলোর চিত্রও প্রায় একই। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কার্যকর ব্যবস্থা নিবেন বলে প্রত্যাশা এলাকাবাসীর।

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading