করোনাভাইরাসে আক্রান্ত চীন, ৬ দিনে হাসপাতাল বানানোর চেষ্টা
উত্তরদক্ষিণ অনলাইন । ২৫ জানুয়ারি ২০২০ । আপডেট ১৭:১৪
করোনাভাইরাসে আক্রান্তদের চিকিৎসার জন্য উহান শহরে ছয় দিনে একটি হাসপাতাল তৈরির কথা জানিয়েছে চীন। বর্তমানে দেশটিতে ১২শর বেশি মানুষে এতে আক্রান্ত রয়েছে এবং ৪১ জনের মৃত্যু হয়েছে। এই সংক্রমণ শুরু হয় উহান শহরে, যেখানে প্রায় এক কোটি ১০ লাখ মানুষের বাস। শহরটির হাসপাতালগুলোতে উদ্বিগ্ন বাসিন্দাদের উপচে পড়া ভীর এবং ফার্মেসিগুলোতে ওষুধের সংকট তৈরি হয়েছে।
দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদ মাধ্যম বলছে, ছয় দিনে যে নতুন হাসপাতালটি বানানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, সেখানে এক হাজার শয্যা থাকবে। খবর বিবিসির। ব্রিটিশ গণমাধ্যমটি বলছে, চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ মাধ্যম অনলাইনে যে ভিডিও পোস্ট করেছে তাতে দেখা যাচ্ছে যে, খনন যন্ত্র এরইমধ্যে ওই স্থানে পৌঁছে কাজ শুরু করেছে। পুরো এলাকাটি ২৫ হাজার বর্গমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত। ২০০৩ সালে বেইজিংয়ে সার্স ভাইরাস মোকাবিলা করতে স্থাপিত আরেকটি হাসপাতালের আদলে এই হাসপাতালটি তৈরি করছে চীন।
হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের গ্লোবাল হেলথ এন্ড সোশ্যাল মেডিসিন বিভাগের প্রভাষক জোয়ান কাউফম্যান বলেন, এটা মূলত রোগ-অন্তরণ বা রোগীদের আলাদা করে রাখার জন্য একটি হাসপাতাল, যেখানে সংক্রমণের শিকার রোগীদের পাঠানো হবে যেখানে সুরক্ষা এবং জীবাণু প্রতিরোধী সরঞ্জাম থাকবে। চীনের সাধারণত খুব দ্রুত জিনিসপত্র তৈরির রেকর্ড রয়েছে। এমনকি এ ধরণের বিশাল বিশাল প্রকল্পের ক্ষেত্রেও,- বলেন পররাষ্ট্র সম্পর্ক বিষয়ক কাউন্সিলের গ্লোবাল হেলথ এর জ্যেষ্ঠ ফেলো ইয়াংঝং হুয়াং।
ইয়াংঝং হুয়াং বলেন, ২০০৩ সালে বেইজিংয়ের হাসপাতালটি সাত দিনে তৈরি করা হয়েছিল। তাই এবার মনে হচ্ছে নির্মাণকারী দলটি সেই রেকর্ড ভেঙে ফেলতে চাইছে। বেইজিংয়ের হাসপাতালের মতোই, উহান সেন্টারটিও আগে থেকেই নির্মিত ভবনে তৈরি করা হবে। এই কর্তৃত্ববাদী দেশটি শীর্ষ থেকে নিচে বা টপ-ডাউন মোবিলাইজেশন পদ্ধতি অনুসরণ করে থাকে। যার কারণে তারা আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এড়িয়ে এবং আর্থিক সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে তাদের সব পুঁজি নির্দিষ্ট দিকে নিয়োগ করতে পারে। হুয়াং আরও বলেন, ঠিক সময়ে কাজ শেষ করতে সারা দেশ থেকে প্রকৌশলীদের এখানে নিয়ে আসা হতে পারে। প্রকৌশলই হচ্ছে সেই কাজ, যাতে চীন খুবই ভালো। দ্রুত গতিতে আকাশচুম্বী ভবন তৈরির রেকর্ড রয়েছে তাদের। এটা পশ্চিমাদের জন্য চিন্তা করাটাই কঠিন। এটা সম্ভব।
আর চিকিৎসা সরঞ্জামাদির কথা বলতে গেলে, উহান সেগুলো অন্য হাসপাতাল থেকে আনতে পারে কিংবা সরাসরি কারখানা থেকেও অর্ডার করতে পারে। শুক্রবার (২৪ জানুয়ারি) গ্লোবাল টাইমস জানায়, পিপলস লিবারেশন আর্মি থেকে ১৫০ জন চিকিৎসাকর্মী উহানে পৌঁছেছে। তবে নতুন হাসপাতাল তৈরির পর তারা সেখানে কাজ করবে কিনা সে বিষয়ে কিছু নিশ্চিত করা হয়নি।
সার্স মহামারির সময় কী ঘটেছিল?: ২০০৩ সালে সার্সের উপসর্গে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসার জন্য বেইজিংয়ে শিয়াওটাংশান হাসপাতাল নির্মাণ করা হয়েছিল। সেটা তৈরি করা হয়েছিল সাত দিনে, যা বিশ্বে সবচেয়ে দ্রুত হাসপাতাল তৈরির রেকর্ড ভেঙ্গেছিল বলে ধারণা করা হয়। চায়না ডটকম ডট সিএন জানায়, ঠিক সময়ে কাজ শেষ করার জন্য প্রায় ৪ হাজার মানুষ দিন রাত কাজ করেছিল। এরমধ্যে একটি এক্স-রে কক্ষ, সিটি কক্ষ, নিবিড় পর্যবেক্ষণ ইউনিট এবং ল্যাবরেটরি রয়েছে। প্রতিটি ওয়ার্ডে আলাদা পায়খানা ছিল।
দুই মাসের মধ্যে সেখানে দেশটিতে সার্স আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে এক-সপ্তমাংশকে ভর্তি করা হয়েছিল যাকে দেশটির সংবাদ মাধ্যম চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে বিস্ময়কর ঘটনা বলে উল্লেখ করেছিল।
সার্সে আক্রান্তের পর চিকিৎসা নিয়ে সবার শেষ শিয়াংটাংশান হাসপাতাল ছাড়েন এক নারী
মিস কাউফম্যান। তিনি বলেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে এর নির্দেশ দেয়া হয়েছিল এবং নার্স ও অন্যান্য চিকিৎসকদের দেশটির অন্য হাসপাতালগুলো থেকে নিয়ে আসা হয়েছিল ওই হাসপাতালে কাজ করতে। তাদেরকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে আলাদা নির্দেশনা দেয়া হয়েছিল, যেখানে কিভাবে সংক্রামক রোগ মোকাবিলা করতে হবে এবং সার্স সনাক্তকরণ এবং সেগুলোকে আলাদা করার কঠোর ও নির্দিষ্ট উপায় উল্লেখ করা হয়েছিল। তিনি বলেন, সার্স মহামারির সময় ব্যয়ভার স্থানীয়ভাবে মেটানো হলেও রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকেও প্রচুর পরিমাণ ভর্তুকি দেয়া হয়েছিল, যা দিয়ে কর্মকর্তাদের বেতন ও নির্মাণ কাজে ব্যয় করা হয়। আমার মনে হয় না যে, এর ব্যয়ভার উহান সরকারের ওপর পড়বে। কারণ, এটা এখন সর্বোচ্চ গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে,- বলেন মিস কাউফম্যান। আর হুয়াংয়ের মতে, হাসপাতালটি মহামারি শেষ হয়ে যাওয়ার পরে চুপিসারে পরিত্যাগ করা হয়েছিল।
রোনাভাইরাসে সংক্রমণ অব্যাহত, বেড়েছে মৃত: এদিকে,চীনের স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা বলছেন, হুবেই প্রদেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে আরো ১৫ জনের প্রাণহানি হয়েছে। এই হুবেই প্রদেশে প্রথম করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শুরু হয়েছিল। চীনে বর্তমানে এ ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১২৮৭ জনে, যাদের মধ্যে অন্তত ৪১ জন মারা গেছেন।
চীনে নতুন চন্দ্র বর্ষ উদযাপন শুরু হওয়ার সাথে সাথে এই খবর আসলো। এটি দেশটির ক্যালেন্ডারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিনগুলির একটি।
ফরাসি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় শুক্রবার রাতে জানিয়েছে, আক্রান্তদের মধ্যে প্রথম জন বোরডক্সের এবং বাকি দুজন প্যারিসের বাসিন্দা। চীনের মিডিয়াগুলো বলছে, নতুন এক হাজার শয্যার হাসপাতালটি ছয় দিনের মধ্যে প্রস্তুত হয়ে যাবে। এটি নির্মাণে ৩৫টি খনন যন্ত্র এবং ১০টি বুলডোজার কাজ করছে।
এই ভাইরাসে কেউ আক্রান্ত হলে- প্রথমে তার জ্বর হয়। এরপর দেখা দেয় শুকনো কাশি এবং সপ্তাহ খানেক পরে শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। এ অবস্থায় অনেকেরই হাসপাতালে চিকিৎসা নেয়া জরুরি হয়ে পড়ে। প্রতি চার জন আক্রান্তের একজনের অবস্থা মারাত্মক হয়ে পড়ছে।

