উহান থেকে বিদেশিদের সরিয়ে নেয়া হচ্ছে

উহান থেকে বিদেশিদের সরিয়ে নেয়া হচ্ছে

উত্তরদক্ষিণ অনলাইন । ২৯ জানুয়ারি ২০২০ । আপডেট ১৬:৪২

করোনাভাইরাসের সংক্রমণের কেন্দ্রবিন্দু চীনের উহান শহর থেকে শত শত বিদেশি নাগরিকে সরিয়ে নেয়া শুরু হয়েছে। এদিকে, প্রতিনিয়তই চীনে এই ভাইরাসের সংক্রমণে প্রাণহানির সংখ্যা বাড়ছে এবং আরো সংক্রমণের খবর নিশ্চিত হওয়া গেছে।

অস্ট্রেলিয়া পরিকল্পনা করেছে যে, চীন থেকে ফেরত আসা তাদের ৬০০ নাগরিককে মূল ভূখণ্ডে নেয়ার আগে সতর্কতা হিসেবে দুই সপ্তাহের জন্য ক্রিসমাস আইল্যান্ডে রাখবে। যা মূল ভূখণ্ড থেকে ২ হাজার কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। জাপান, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপও তাদের নাগরিকদের ফিরিয়ে নেয়া শুরু করেছে। তবে বাংলাদেশের নাগরিকদের ফেরানোর কার্যক্রম শুরু হয়েছে কিনা সেই তথ্য নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ভাইরাসটিকে ডেভিল বা খুবই খারাপ প্রকৃতির বলে উল্লেখ করেছেন এবং বলেছেন যে, চীন এটাকে পরাজিত করবে। চীনের জাতীয় স্বাস্থ্য কমিশনের-এনএইচসি এক বিশেষজ্ঞ বলেছেন, প্রাদুর্ভাবটি সেরে উঠতে আরো ১০ দিনের মতো সময় লাগতে পারে।

বুধবার (২৯ জানুয়ারি) এনএইচসি বলেছে, চীনে এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১৩২ জনে দাঁড়িয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে যে, হুবেই প্রদেশের রাজধানী উহানের সি ফুড মার্কেটে অবৈধ বন্যপ্রাণী বাণিজ্য থেকে এই ভাইরাসটি ছড়িয়েছে। খবর বিবিসির।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনা ভাইরাসের কারণে শ্বাসযন্ত্রের গুরুতর ও তীব্র সংক্রমণ হয়, যার কোনও নির্দিষ্ট নিরাময় বা প্রতিষেধক নেই। এরইমধ্যে স্টারবাকস চীনে তাদের অর্ধেকেরও বেশি আউটলেট বন্ধ করেছে। এছাড়া অর্থনৈতিক প্রভাবও মারাত্মক হতে শুরু করেছে।

কাদের সরিয়ে নেয়া হচ্ছে?: অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী স্কট মরিসন বলেছেন, তার দেশের নাগরিকদের দুই সপ্তাহের জন্য ক্রিসমাস আইল্যান্ডে রাখা হবে। এই ঘোষণার পর সমালোচনা ও বিতর্ক শুরু হয়েছে। কারণ ওই দ্বীপটি অভিবাসন প্রত্যাশীদের বন্দী শিবির হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ওই শিবিরগুলোর বেহাল দশা এবং সেখানে মানবাধিকার লঙ্ঘন করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। বর্তমানে সেখানে চার সদস্যের একটি শ্রীলংকান পরিবার রয়েছে। কিন্তু প্রায় এক হাজার মানুষকে ধারণ করার জন্য এটি তৈরি করা হয়েছিল।

অস্ট্রেলিয়ার নাগরিকদের পাশাপাশি নিজেদের ৫৩ জন নাগরিককে ফিরিয়ে আনতে ক্যানবেরার সাথে একযোগে কাজ করবে নিউজিল্যান্ড। প্রায় ২০০ জন জাপানি নাগরিক উহান থেকে বিমানে করে টোকিওর হানেডা বিমানবন্দরে অবতরণ করেছে। আরো ৬৫০ জন জাপানি বলেছে যে, তারা ফিরে যেতে চান এবং দেশটির সরকার বলেছে- তারা আরো ফ্লাইট চালুর পরিকল্পনা করছে।

জাপানের গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ফিরিয়ে নেয়া নাগরিকদের মধ্যে অনেকে জ্বর এবং কাশিতে ভুগছেন। তবে উপসর্গ দেখা না দিলেও ফিরে যাওয়া সবাইকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হবে। বাড়ি ফিরে যাওয়ার আগে তাদেরকে একটি নিয়ন্ত্রিত ওয়ার্ডে রেখে পরীক্ষা করা হবে এবং এগুলোর ফল না আসা পর্যন্ত তাদের বাড়ি থেকে বের না হওয়ার নির্দেশনা দেয়া হবে।

বুধবার, যুক্তরাষ্ট্রের কনস্যুলেটের কর্মকর্তাদের পাশাপাশি কিছু মার্কিন নাগরিকও উহান শহর ছেড়ে গেছে। সিএনএন এর তথ্য মতে, তাদেরকে কম পক্ষে দুই সপ্তাহ ধরে বিমান বন্দরের হ্যাঙ্গারে তৈরি করা বিশেষ ব্যবস্থায় থাকতে হবে।

যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র দপ্তরও তাদের প্রায় ২০০ নাগরিককে ফিরিয়ে নেয়ার ব্যবস্থা করছে, যারা ফিরেতে চান। কিন্তু কিছু কিছু ব্রিটিশ নাগরিক কর্তৃপক্ষের সমালোচনা করে অভিযোগ তুলেছেন যে, তাদের ফিরিয়ে নেয়ার ব্যবস্থা নেয়নি কর্তৃপক্ষ। বরং চীনের সঙ্গে সব ধরনের ফ্লাইট বাতিল করার ঘোষণা দিয়েছে ব্রিটেন। আলাদাভাবে, দুটি বিমান ইউরোপের নাগরিকদের ফিরিয়ে নেয়ার কথা রয়েছে। এরমধ্যে প্রথম ফ্লাইটে ২৫০ জন ফরাসি নাগরিক চীন ছাড়বেন বলে বিবিসি জানিয়েছে।

দক্ষিণ কোরিয়া জানিয়েছে, চলতি সপ্তাহে চারটি ফ্লাইটে তাদের ৭০০ নাগরিককে ফিরিয়ে নেয়া হবে। কিন্তু তাদেরকে আলাদাভাবে পর্যবেক্ষণে রাখা হবে কিনা তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। দক্ষিণ কোরিয়ার সংবাদ মাধ্যমগুলোর বরাত দিয়ে বিবিসি বলছে, সংক্রমণের শিকার নাগরিকদের সব খরচ সরকার বহন করবে। এ পর্যন্ত, দেশটিতে চারজন আক্রান্ত হওয়ার খবর নিশ্চিত হওয়া গেছে।

এরইমধ্যে, হংকং চীনের মূল ভূখণ্ডের সাথে আন্তঃসীমান্ত ভ্রমণ বন্ধের পরিকল্পনার ঘোষণা দিয়েছে। উহানের সাথে সাথে পুরো হুবেই প্রদেশই যানবাহন চলাচলের দিক থেকে অচল হয়েছে পড়েছে।

সবশেষ তথ্য কী?: জার্মানি, ভিয়েতনাম, তাইওয়ান এবং জাপানে মানুষ থেকে মানুষে ছড়িয়ে পড়ার খবর নিশ্চিত হওয়া গেছে- যা চীন থেকে ভ্রমণকারীদের ভাইরাস বয়ে আনার ধারণার বিপরীত-এই তথ্য ভাইরাস ছড়িয়ে পড়া নিয়ে উদ্বেগ আরো বাড়িয়েছে। চীনের শীর্ষস্থানীয় বক্ষব্যাধী বিশেষজ্ঞ ঝং নানশান, যিনি করোনা ভাইরাস নিয়ন্ত্রণ এবং প্রতিরোধ বিষয়ক কমিটির প্রধান। তিনি শিনহুয়া সংবাদ সংস্থাকে বলেন, আমার মনে হয়- এক সপ্তাহ বা ১০ দিনের মধ্যে, এই প্রাদুর্ভাবটি শীর্ষে পৌঁছাবে এবং এর পরে আর বড় মাত্রায় কোনও সংক্রমণ হবে না।

চীন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাথে একমত হয়েছে যে, দেশটিতে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের পাঠানো হবে। যাতে তাদের সহায়তায় করোনা ভাইরাস বোঝা যায় এবং এর বৈশ্বিক প্রভাব মোকাবিলায় নির্দেশনা পাওয়া যায়। প্রেসিডেন্ট শি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান টেড্রোস আঢানম ঘেব্রেয়েসাসের সাথে বেইজিংয়ে দেখা করেন। তিনি বলেন, ভাইরাসটি খুবই খারাপ প্রকৃতির এবং এটিকে আমরা লুকিয়ে থাকতে দেবো না।

সাউথ চীন মর্নিং পোস্ট তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, ২০০৩ সালে বেইজিংয়ে একটি হাসপাতাল সাত দিনে তৈরি করা হয়েছে সার্স ভাইরাসে সংক্রমিতদের চিকিৎসার জন্য। সেই হাসপাতালটিকে আবারো প্রস্তুত করা হচ্ছে করোনাভাইরাসে আক্রান্তদের চিকিৎসার উপযোগী করে তোলার জন্য। উহানেও একই ধরণের একটি হাসপাতাল এক সপ্তাহের মধ্যে দ্রুত তৈরি করা হয়েছে।

বিবিসির প্রতিনিধি সরেজমিনে উহান শহর পরিদর্শন করেছে। এ নিয়ে ব্রিটিশ গণমাধ্যমটি জানান, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং চীনের জাতীয় কর্তৃপক্ষের মতে, চীনের বাইরে ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ৬০টি ঘটনা নিশ্চিত হওয়া গেছে। সবচেয়ে বেশি রয়েছে থাইল্যান্ডে, যেখানে ১৪ জন আক্রান্ত হয়েছে। মানুষ থেকে মানুষে ছড়িয়ে পড়ার নতুন যে খবর এসেছে তা করোনাভাইরাসের ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কাকে আরো বাড়িয়ে তুলবে। জাপান এবং জার্মানিতে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো থেকে জানা যায় যে, সংক্রমণের শিকার কারো ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে আসলে অন্য ব্যক্তির মধ্যেও এটা ছড়িয়ে পড়তে পারে। সবচেয়ে বেশি আক্রান্তের শঙ্কা রয়েছে, যাদের কাশি এবং জ্বরের উপসর্গ রয়েছে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যাদের মধ্যে এখনো কোনও উপসর্গ দেখা দেয়নি তাদেরও আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। আর উপসর্গ দেখা দিতে কারো কারো এক সপ্তাহরও বেশি সময় লাগতে পারে।

যারা এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে- তাদের ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে যেতে নিষেধ করা হচ্ছে-এর মানে হচ্ছে, আক্রান্ত বা যে সংক্রমণের জীবাণু বহন করছে এমন কারো থেকে পর্যাপ্ত দূরত্ব বজায় রাখা। যাতে নিঃশ্বাসের সাথে জীবাণু প্রবেশ করতে না পারে কিংবা তাদেরকে স্পর্শ করতে না হয়।

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading