দৌলতদিয়ায় আরেক যৌনকর্মীর জানাজা নিয়ে আলোচনা তুঙ্গে

দৌলতদিয়ায় আরেক যৌনকর্মীর জানাজা নিয়ে আলোচনা তুঙ্গে

উত্তরদক্ষিণ অনলাইন । ২২ ফেব্রুয়ারী ২০২০ । আপডেট ১৮ঃ১০

রাজবাড়ির দৌলতদিয়ায় গত বৃহস্পতিবার ইসলামি রীতিতে দ্বিতীয় যৌনকর্মীর জানাজা পড়ানো হয়েছে স্থানীয় পুলিশের উদ্যোগে। ২০ ফেব্রুয়ারি দুপুরে মারা যাওয়া যৌনকর্মী রীনা বেগমের জানাজা পড়ানো হয় বৃহস্পতিবার রাত ৯টার দিকে। এর আগে চলতি মাসের শুরুর দিকে আরেক যৌনকর্মীর মৃত্যু হলে পুলিশের উদ্যোগে তার জানাজা ও দাফনের ব্যবস্থা হয়। বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় বইছে। ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে দ্বিতীয় জানাজার বিষয়টি নিয়ে বিবিসি বাংলা নিউজ করেছে। নিউজ নিয়ে বিবিসির ফেসবুক পেজে অনেকেই তাদের প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন।

আলেয়া খাতুন নামে এক নারী লিখেছেন, ঐ এলাকার এখানে যে পুরুষগুলো দেখছেন তারা কী কখনও পতিতা পল্লিতে গিয়ে খদ্দর হয়ে নিজের জৈবিক চাহিদা, শখ পূরণ করে নাই, তবে তাদের জানাজা হলে পতিতার জানাজা কেন হবে না। এর জবাবে রাসেল হোসাইন নামে একজন লিখেছেন, এখানে আমার অতি ধার্মিক ভাই যারা বলছেন আমি পতিতাদের বৈধ বলছি সেটা ভুল।পতিতা এমন জঘন্য কাজে জড়িয়েছে আপনার জন্য, আমার জন্য। কারণ আমরা নিজেদের মুসলিম ধার্মিক বলে পরিচয় দিতেই বুক উচু হয়ে উঠে গর্বে। অথচ মুসলিম হিসেবে আপনার আমার আশেপাশে ৪০ টি বাড়ির খোঁজ খবর রাখার দায়িত্ব দিয়ে গেছে নবী (সঃ)। সে কখনই খাটি মুমিন নয় যার আশেপাশে কেউ একজন অভোক্ত রাত্রি যাপন করলো। যদি এই ৪০ বাড়ির কোন লোক এক বেলা অনাহারে দিন কাটায় তবে মুসলিম হিসেবে জবাব আমাদেরই দিতে হবে। আমরা মুসলিমরা নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত, তাই মৌলিক চাহিদা খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা ইত্যাদি পূরণ করার জন্য অভাবে কেউ না কেউ খারাপ পথে যাচ্ছে কারণ তারা না খেয়ে থাকলে কেউ বলেনা খেয়েছ? তবে উড়নাটা একটু সড়লে সবাই দেখে পারলে সাথে আরো কয়জনকে দেখিয়ে দেয়।

শফিকুল হাকিম নামে একজনের মন্তব্য, বিবিসিবাংলাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে এই ব্যতিক্রমী অথচ ভিন্নমাত্রা যোগ করে আমাদের সমাজের সকলের মন ও মননে, ঠিক সে রকম দারুণ একটা খবর পরিবেশন করার জন্য। এই খবর পরিবেশনের সাথে সাথে আমাদের এই কুসংস্কারাচ্ছন্ন যুক্তিবোধহীন মানুষের মাঝে নিশ্চয়ই সৃষ্টি করবে নতুন বোধহয়, নতুন আশার সঞ্চার করবে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে।

অবশ্য সবাই পক্ষে বলেননি। এর বিপক্ষেও অনেকে মন্তব্য করেছেন। রীতিমতো বিষয়টি এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় আলোচনার ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। বিরোধীদের মন্তব্য, যে কাজটি শুধু ইসলাম নয়, কোনো ধর্মই অনুমোদন করে না। সেটিকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করে মৃত্যুর পর তাদেরকে কেন ধর্মীয় রীতিতে সৎকারের প্রয়োজন পড়লো? ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী যদি সৎকারই করতে হবে, তবে কেন জীবিত অবস্থায় এ পেশা থেকে বেড়িয়ে আসেননি। আর যৌনকর্মীদের মৃত্যুর পর যারা তাদের জানাজার আয়োজন করার উদ্যোগ নিতে পারে তারা কেন, যৌনকর্মীদের সুস্থ স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে উদ্যোগী হন না? -এমন নানা তর্ক-বিতর্ক যৌনকর্মীদের জানাজাকে কেন্দ্র করে বলছে।

বিবিসির খবরে বলা হয়েছেত, দৌলতদিয়ায় যৌনপল্লী সংলগ্ন কবরস্থানে স্থানীয় পুলিশের উদ্যোগে আয়োজন করা জানাজায় স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারাসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের অনেকেই উপস্থিত হয়েছিলেন বলে জানান গোয়ালন্দ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আশিকুর রহমান। ওসি বলেন, প্রথা ভেঙে যৌনকর্মীদের জানাজা পড়ানোর যেই চল প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, বিশিষ্ট ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে সেটি আরো স্বীকৃত হলো।

এর আগে গত ৬ ফেব্রুয়ারি প্রথমবারের মতো হামিদা বেগম নামের এক যৌনকর্মীর জানাজা পড়ানো হয়েছিল। ঐ জানাজার আয়োজনও করা হয়েছিল স্থানীয় পুলিশ প্রধান আশিকুর রহমানের উদ্যোগে। তবে সেই জানাজার নামাজ পরিচালনা করা দৌলতদিয়া রেলস্টেশনের ইমাম গোলাম মোস্তফা জানিয়েছিলেন যে, তিনি ভবিষ্যতে আর কোনো যৌনকর্মীর জানাজা পড়াবেন না। হামিদা বেগমের জানাজা পড়ানোর পর স্থানীয়ভাবে সমালোচনার মুখে পড়ার কারণেই তিনি আর কোনো যৌনকর্মীর জানাজা না পড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন।

সূত্রমতে, ঐ ঘটনার পর রাজবাড়ি জেলা ইমাম সমিতির পক্ষ থেকে পুলিশের কাছে স্মারকলিপি দেয়া হয়, যেখানে গোয়ালন্দ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আশিকুর রহমানের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয় যে, তিনি ইমামকে বাধ্য করেছিলেন যৌনকর্মীর জানাজা পড়াতে। তবে ওসি আশিকুর রহমানের ভাষ্য, তিনি কোনও জোর করেননি। তার অনুরোধের প্রেক্ষিতেই ইমাম জানাজা পড়াতে রাজি হয়েছিলেন।

স্থানীয় ইমাম সমিতির পক্ষ থেকে এমনও সিদ্ধান্ত নেয়া হয় যে, তারা আর কোনো যৌনকর্মীর জানাজা পড়াবেন না। এর পর গত বৃহস্পতিবার রীনা বেগমের জানাজা পড়ান গোয়ালন্দ থানা মসজিদের ইমাম আবু বকর সিদ্দিক। স্থানীয় ইমামদের অনেকেই যৌনকর্মীর জানাজা পড়াবেন না বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন। ওসি বলেন, কাউকে যেহেতু ধর্মীয় কাজে জোর করা যায় না, তাই আমি থানা মসজিদের ইমামকে অনুরোধ করি জানাজা পড়াতে। তিনি রাজি হওয়ার পর জানাজা আয়োজন করা হয়।

দৌলতদিয়ার যৌনকর্মীরা আশাবাদি ছিলেন যে, হামিদা বেগমের জানাজার পর সেটা হয়তো যৌনকর্মীদের প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটাতে কাজে দেবে। কিন্তু পল্লীর বাইরে সাধারণ মানুষের অধিকাংশই এবিষয়ে নেতিবাচক ধারণা পোষণ করেন বলে বিবিসির খবরে বলা হয়। স্থানীয়রা মনে করেন, যৌনকর্মীদের পেশাই যখন ইসলাম ধর্ম সমর্থিত নয়, তখন তাদের মৃত্যুর পর ধর্মীয় রীতিতে সৎকারের চেষ্টা করার কোনো কারণ নেই।

স্থানীয়দের সঙ্গে একমত নন ওসি আশিকুর রহমান। তিনি মনে করেন, কখনো ইসলামিক রীতিতে যৌনকর্মীদের জানাজা না পড়ানো হওয়ার কারণে এনিয়ে কিছুটা অস্বস্তি কাজ করছে স্থানীয় মানুষের মধ্যে। সময়ের সাথে সাথে মানুষ অভ্যস্ত হয়ে যাবে। তবে যৌনকর্মীদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে কিনা তার পক্ষ থেকে এ বিষয়ে ওসি আশিকের কোনো বক্তব্য জানা যায়নি।

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading