করোনাভাইরাসের লক্ষণসহ ঢাকায় ‘আইসোলেশনে’ ৫ জন

করোনাভাইরাসের লক্ষণসহ ঢাকায় ‘আইসোলেশনে’ ৫ জন

উত্তরদক্ষিণ অনলাইন । ০৩ মার্চ ২০২০ । আপডেট ১৮ঃ১৯

নভেল করোনাভাইরাস প্রতিরোধের অংশ হিসেবে কভিড-১৯ রোগের লক্ষণ নিয়ে ঢাকায় হাসপাতালে ভর্তি হওয়া পাঁচজনকে ‘আইসোলেশনে’ রাখা হয়েছে। তবে তাদের সবার অবস্থাই ভালো বলে জানিয়েছে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর)। বিশ্বজুড়ে আতঙ্ক ছড়ানো করোনাভাইরাস নিয়ে মঙ্গলবার (৩ মার্চ) নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে সন্দেহভাজন পাঁচ রোগীকে বিচ্ছিন্ন রাখার কথা জানান আইইডিসিআরের পরিচালক মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা।

চীনে কভিড-১৯ ছড়িয়ে পড়ার পর ঢাকার কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল এবং সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে আইসোলেশন ইউনিট চালু করে আইইডিসিআর। সেখানে সন্দেহভাজন রোগীকে আলাদা রেখে চিকিৎসা দেওয়া হয়। ডা. ফ্লোরা বলেন, অতিরিক্ত সতর্কতা হিসেবে তাদের আইসোলেশনে রাখা হয়েছে। আমাদের হাসপাতালে সব সময়ই আইসোলেশনে থাকে। যখনই আমরা রোগী সন্দেহ করি বা যখনই আমাদের কাছে ফোন কল আসে যে তার মধ্যে লক্ষণ-উপসর্গ আছে, আমরা বিলম্ব না করে তাকে আগে হাসপাতালে পাঠাই। নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা তাদের ছাড়ি। আইসোলেশনে থাকা পাঁচজনের সবারই শারীরিক অবস্থা এখন ভালো বলে জানান তিনি।

জরুরি প্রয়োজনে করোনাভাইরাস আক্রান্তদের চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে বেসরকারি হাসপাতালগুলোয় আইসোলেশন ইউনিট চালুর নির্দেশনা দিয়েছে আইইডিসিআর। যাতে যদি সন্দেহজনক রোগী থাকে, তাদের নমুনা সংগ্রহের পর পরীক্ষা করে যেন বলতে পারি। যদি ওই রোগী পজিটিভ হয়, তাকে অন্য হাসপাতালে যেতে হয় তাহলে রোগটি ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে, বলেন ডা. ফ্লোরা।

নভেল করোনাভাইরাস সংক্রমণ হলে লক্ষণগুলো হয় নিউমোনিয়ার মতো। শুরুটা হয় জ্বর দিয়ে, সঙ্গে থাকতে পারে সর্দি, শুকনো কাশি, মাথাব্যথা, গলাব্যথা ও শরীর ব্যথা। সপ্তাহখানেকের মধ্যে দেখা দিতে পারে শ্বাসকষ্ট। করোনাভাইরাসের কোনো টিকা বা বিশেষায়িত ওষুধ এখনও আবিষ্কৃত হয়নি। চিকিৎসকরা বলছেন, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ভালো হলে এ রোগ কিছুদিন পর এমনিতেই সেরে যেতে পারে। তবে ডায়াবেটিস, কিডনি, হৃদযন্ত্র বা ফুসফুসের পুরোনো রোগীদের ক্ষেত্রে মারাত্মক জটিলতা দেখা দিতে পারে। মানুষের দেহে ভাইরাস সংক্রমণের পর লক্ষণ দেখা দিতে পারে এক থেকে ১৪ দিনের মধ্যে।

ঢাকার শাহজালাল বিমানবন্দরে থার্মাল স্ক্যানারের মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে যাত্রীদের।ঢাকার শাহজালাল বিমানবন্দরে থার্মাল স্ক্যানারের মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে যাত্রীদের। তাই করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঘটেছে, এমন দেশ থেকে কেউ এলে তাকে অন্তত ১৪ দিন ঘরে থাকার পরামর্শ দিয়েছে আইইডিসিআর। সেই সঙ্গে বিমানবন্দরগুলোতে চলছে পরীক্ষা। ডা. ফ্লোরা জানান, দেশে মঙ্গলবার পর্যন্ত ৯৬ জনের নমুনা পরীক্ষা করে কারও শরীরে নভেল করোনাভাইরাস পাওয়া যায়নি। এরমধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় পরীক্ষা করা হয়েছে ৩টি নমুনা। তিনি বলেন, যাদের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে তাদের বেশিরভাগ বাংলাদেশি। এর মধ্যে চীন ফেরতই বেশি, দক্ষিণ কোরিয়া ফেরতও আছেন। বিদেশি কয়েকজনের নমুনাও পরীক্ষা করা হয়েছে। করোনাভাইরাস দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধেই জোর বেশি দিচ্ছে সরকার।

ডা. ফ্লোরা বলেন, ঢাকায় আসা অতিথিদের সম্পর্কে তথ্য দিতে হোটেলগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আক্রান্ত দেশ থেকে যদি যাত্রীরা আসেন, তাহলে আপনারা আমাদেরকে জানান। যাতে আমরা আমাদের সার্ভিলেন্স কাজ করতে পারি। আমাদের দেশে আসা কোনো যাত্রীর মধ্যে যদি কোনো জীবাণু থাকে তার থেকে যেন ছড়িয়ে পড়তে না পারে। একইসঙ্গে তিনি বলেন, তার মানে এই নয়, যারা আসছেন তারা করোনাভাইরাস আক্রান্ত। সুতরাং আমরা যেন তাদের সঙ্গে এমন কোনো আচরণ না করি, তারা যেন হেনস্তার শিকার না হয়।

কোরিয়া, জাপান ও ইরানে কভিড-১৯ রোগটি ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়ায় এ তিনটি দেশ বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগের কারণ-বলেছেন আইইডিসিআর পরিচালক। আমাদের দেশের সঙ্গে দক্ষিণ কোরিয়ার সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ। আমাদের অনেক শিক্ষার্থী সেখানে পড়াশোনা করে, কর্মীরা কাজ করেন। এছাড়া ব্যবসায়িক সংযোগও রয়েছে। এ কারণে যেসব দেশ থেকে যাত্রীরা আসলে আমরা অতিরিক্ত ব্যবস্থা নিচ্ছি সেই তালিকার মধ্যে তাদেরকে রেখেছি।

ভারত-শ্রীলঙ্কায় করোনাভাইরাস সংক্রমণ ঘটলেও দেশবাসীকে আশ্বস্ত করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলছেন, কোনো কারণে এই ভাইরাস বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়লেও তা মোকাবেলায় সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছে সরকার। সরকারের প্রস্তুতি তুলে ধরে মঙ্গলবার সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, আশেপাশের দেশে যেহেতু করোনাভাইরাস এসে গেছে, বাংলাদেশেও যে আসবে না, এটা নিশ্চিত করে বলা যায় না। তবে আমরা সবসময় প্রস্তুত আছি, আমাদের প্রস্তুতি আরও বৃদ্ধি করছি। করোনাভাইরাস চলে আসলেও আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নাই। আমরা আগে থেকেই সকল ধরনের প্রস্তুতি নিয়ে আছি।

বাংলাদেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগী পাওয়া গেলে তাদের কীভাবে চিকিৎসা দেওয়া হবে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নীতিমালা অনুসরণ করে ইতোমধ্যেই ট্রিটমেন্ট প্রোটোকল তৈরি করা হয়েছে বলে জানান মন্ত্রী। আমরা বুকলেট তৈরি করেছি। ডব্লিউএইচও’র গাইডলাইন অনুসরণ করে চিকিৎসা পদ্ধতি (ট্রিটমেন্ট প্রোটোকল) তৈরি করা হয়েছে। ঢাকার কুয়েত মৈত্রী হাসাপতালে বিশেষ ব্যবস্থা করেছি। বক্ষব্যাধি হাসপাতালকেও বিশেষভাবে তৈরি করা হচ্ছে, সেখানে ২০ শষ্যার একটি আইসিইউ এর ব্যবস্থা করছি, ক্রিটিক্যাল রোগী যদি পাওয়া যায় সেখানে আমরা সেবা দেব।

জেলা পর্যায়ের প্রত্যেকটি হাসপাতালে যেন আইসিইউ’র ব্যবস্থা থাকে, সেই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। প্রতিটি জেলায় আইসোলেশন ওয়ার্ড করেছি। বিশেষ করে হাসপাতালের টপ ফ্লোরে এই ওয়ার্ড করেছি। আল্লাহ না করুক যদি কখনও দেখা যায়, রোগী বাড়ে, তাহলে হাসপাতালের বাইরেও কিছু প্রতিষ্ঠান এখন থেকেই মার্ক করে রাখছি, যেখানে রোগীদের রাখা যাবে। বিশেষ করে স্কুল, কলেজ, মিলনায়তন, কমিউটনিটি সেন্টারে রাখার ব্যবস্থাও করছি। স্থানীয় পর্যায়ের কমিটি এসব ঠিক করে রাখবে।

জাহিদ মালেক জানান, হাসপাতালে যেসব চিকিৎসক-নার্সরা কাজ করবেন, তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। গাউন, মাস্ক, গ্লাভস যথেষ্ট পরিমাণে দেওয়া হচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে ভিডিও কনফারেন্স করে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে বলে জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী। সব জেলায় জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে একটি এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নেতৃত্বে সব উপজেলায় নেতৃত্বে আরেকটি করে কমিটি করা হয়েছে। বিশেষ প্রয়োজন বিদেশ থেকে দেশে আসতে এবং বিদেশে না যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, যে দেশ থেকেই আসুক না কেন সেলফ কোয়ারেন্টিনে থাকবেন।

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading