করোনায় চাকরি হারাচ্ছে আড়াই কোটি কর্মী!
উত্তরদক্ষিণ অনলাইন । ২২ মার্চ ২০২০ । আপডেট ২১:২৫
হিল্লোল বাউলিয়া: এক সংবাদকর্মী জানান, তার স্বামী একটি প্রতিষ্ঠিত উন্নয়ন সংস্থায় (এনজিও) কর্মরত। নভেলা করোনাভাইরাস বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়ার পর গত ১৮ মার্চ সুমীর স্বামীর অফিস বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। ২০ মার্চ পর্যন্ত বেতন দেয়া হয় অফিস বন্ধ ঘোষণার সময়। এর পর কাজ হলে বাসায় বসে কাজ করতে হবে। সেক্ষেত্রে বেতন পাবেন অর্ধেক। আর কাজ না থাকলে বেতন পাবেন না। তাছাড়া কবে নাগাদ তার অফিসের কার্যক্রম স্বাভাবিক হবে তা এ মুহূর্তে কারো জানা নেই।
গত কয়েক মাস ধরে অস্থিরতা চলছে দেশের অন্যতম বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল এসএটিভিতে। কর্মী ছাটাই নিয়ে আন্দোলন-সংগ্রাম, হামলা-সংঘর্ষ সবই হয়েছে। এদিকে করোনায় যখন দেশবাসী চিন্তিত, ঠিক তখনই প্রতিষ্ঠানটির ২৭ জন সংবাদকর্মী ছাটাই করা করা হয়েছে। কর্তৃপক্ষের এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়েছেন। সাংবাদিক সংগঠেনের নেতৃবৃন্দসহ গণমাধ্যমকর্মীরা।
কিছু গণমাধ্যমে খবর এসেছে- করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে রাজধানীর ডেল্টা হাসপাতালে মৃত্যু হয় মিরপুরের এক ব্যক্তির, যা দেশে করোনাভাইরাস বা কভিড-১৯ রোগে দ্বিতীয় মৃত্যু। বেসরিকারি ওই হাসপাতালটিতে কভিড-১৯ রুগীর মৃত্যুর পর রুগীর সেবায় অংশ নেয়া অন্তত ২২ জন চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য কর্মীকে বাধ্যতামূলক ছুটি দেয়া হয়েছে। এর প্রতিবাদ জানিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেকেই সরকারের হস্তপেক্ষ প্রত্যাশা করেছেন।
এছাড়া কভিড-১৯ আক্রান্ত রুগীদের চিকিৎসা দিতে অনেক হাসপাতালের চিকিৎসকরা অনিহা দেখাচ্ছেন বলে নির্ভরযোগ্য বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। এক্ষেত্রে প্রয়োজনে চাকরি হারাতেও রাজি চিকিৎসকসহ স্বাস্থ্যকর্মীরা। আবার অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হচ্ছে। বেশ কিছু গার্মেন্টর্স বিনাবেতনে বন্ধ করে দেয়ার তথ্যও মিলেছে। ফলে ওইসব প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের চাকরি হারা হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। কবে তারা কর্মক্ষেত্রে ফিরতে পারবেন বা আদৌ পারবেন কিনা সেই আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে কোথাও কোথাও। আর এ সমস্য শুধু যে বাংলাদেশে তা নয়। বিশ্বের অনেক দেশেই কর্মীদের চাকরিচ্যুৎ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এমনকি করোনাভাইরাসের কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অন্তত আড়াই কোটি মানুষ চাকরি হারাবে! বিষয়টি শিউরে ওঠার মতো মনে হলেও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা- আইএলও-এর একটি গবেষণায় এই তথ্য উঠে এসেছে। এ খবর বিবিসির।
বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী ব্রিটিশ গণমাধ্যমটি বলছে, করোনাভাইরাস শুধু জীবন ও স্বাস্থ্যেই প্রভাব ফেলছে না, এই ভাইরাস সংক্রমণের প্রভাব পড়েছে অর্থনীতিতেও। যার ফলে ব্যবসা বাণিজ্য নিম্নমুখী এবং কর্মীরা বেশ বাজেভাবে আতঙ্কে ভুগছে। ব্রিটেনে জীবন এখন স্থবির। ফার্মগুলো ইতোমধ্যে আশঙ্কা জানিয়েছে- হাজারো মানুষের চাকরি চলে যেতে পারে।
বাবা-মাকে সাথে নিয়ে ইংল্যান্ডের নিউক্যাসল থেকে লিডসে ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছেন হলি ইয়েরি। ২৮ বছর বয়সী ওই নারীর স্বপ্নের চাকরি ছিল রেস্তোরা ও বারের ব্যবস্থাপক হিসেবে কাজ করা। করোনার কারণে তার চাকরি চলে গেছে। তিনি বলেছেন, এই ব্যাপারে তার কোনো রাগ নেই। তিনি কাউকে দোষ দিচ্ছেন না।
ভাইরাসের কারণে অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণ বাতিল করার যে পরার্মশ ব্রিটিশ সরকার দিয়েছে তার পরপরই প্রচুর অর্ডার ক্যানসেল হতে থাকে একে একে। তখন রেস্তোরাঁ কর্তৃপক্ষ অর্ধেকের মতো কর্মী ছাঁটাই করে। তবে ইয়েরি একজন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ইংরেজি শিক্ষকও বটে।
তিনি মনে করছেন, বেশ কয়েক মাসে রেস্তোরাঁ, ভ্রমণ বা এই সংক্রান্ত যেসব চাকরি আছে সেগুলো টিকবে না। ব্রিটেনজুড়ে এমন অনেক উদাহরণ আছে, যারা জানেন না পরবর্তী চার থেকে পাঁচ মাস কীভাবে চলবে।
দক্ষিণ পশ্চিম লন্ডনে বাস করা টম ডানোসিয়াস নামে এক ব্যক্তি চাকরি হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। তিনি মাসে ৮০০ পাউন্ড ভাড়া ও নানাবিধ বিল দেন। তিনি বলেন, আমার কিছু জমা টাকা আছে। কিন্তু সর্বোচ্চ দুই মাস চলতে পারবো সে টাকা দিয়ে’।
ব্যবসা বিষয়ক উপদেষ্টা বব ডোনেলান আরো ৬ মাসের জন্য চাকরিচ্যুত হয়েছেন। তার মন্তব্য, মার্চের শেষেই আমার চুক্তি শেষ হয়ে যাবে। এরই মধ্যে করোনাভাইরাস এলো এবং কোম্পানিও কর্মী ছাঁটাই করছে। অতএব আমার এই চুক্তি সামনে এগোনোর কোনো সম্ভাবনা নেই।
ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন যদিও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, আপনারা কর্মীদের পাশে থাকুন। কিন্তু বাস্তবতা কঠিন। প্রায় ৩৫০ বিলিয়ন ডলারের একটি প্যাকেজও করেছেন চ্যান্সেলর রিশি সুনাক। এই প্যাকেজের লক্ষ্য হবে মানুষের চাকরি বাঁচানো। পাঁচ ভাগের চার ভাগ বেতন দেবে ব্রিটিশ সরকার। মাসে ২৫০০ পাউন্ড বেতন দেওয়ার পরিকল্পনা আছে ওই প্যাকেজে।
বাংলাদেশের একজন গার্মেন্টস কর্মীর সঙ্গে কথা বলেছে বিবিসির সাংবাদিক। যদিও তিনি এখনো কাজ করছেন। তবে তিনি শঙ্কায় আছেন যেকোনো সময় চাকরি চলে যেতে পারে তার। তার ভাষায়, গত বছর এই সময় ৩০০ কোটি টাকার অর্ডার ছিল। এ বছর একই সময়ে একশো কোটি টাকায় নেমে আসে। তিনি যোগ করেন, যে এলাকায় তিনি কাজ করছেন আসেপাশের পোশাক কারখানায় চাকরি যাওয়ার খবর তিনি পাননি। এখনো বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শুরুর দিকে এবং খুব বড় সংখ্যায় না। ব্যক্তিগত কারণে তিনি নাম ও পরিচয় প্রকাশ করেননি।
এদিকে ক্রেতা সংকটের কারণে খরচ না আসায় বাংলাদেশের সব বিপণি বিতান বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিপণি মালিক সমিতি। এতে হাজার হাজার কর্মী কর্মহীন হয়ে পড়বেন। আর মালিকদের আয়ের পথ বন্ধ থাকায় কর্মীদের এসময় বেতন দেয়া সম্ভব হবে না বলেই জানিয়েছেন অনেকে। ফলে এসব কর্মহীন কর্মীদের জীবনযাপন দুর্বিসহ হয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এক্ষেত্রে সরকারের কাছ থেকে পদক্ষেপ প্রত্যাশা করছেন কর্মহীন হতে চলা কর্মীরা।

