দেশে ব্যাপকভাবে করোনা পরীক্ষার উদ্যোগ
উত্তরদক্ষিণ অনলাইন। ২৯ মার্চ ২০২০ । ১৫:৩০
বাংলাদেশে করোনা শনাক্তকরণ পরীক্ষা অতি দ্রুত ব্যাপক হারে করা জরুরি। অন্যথায় যেকোনো মুহূর্তে ভাইরাসটির ব্যাপকতা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) বারবার তাগিদ দিয়ে বলছে, সব দেশের প্রতি আমাদের উপদেশ, ‘পরীক্ষা, পরীক্ষা এবং পরীক্ষা’। মানে করোনা আক্রান্ত হিসেবে কাউকে সন্দেহ হলে প্রথম কাজ হলো পরীক্ষা করানো। ডব্লিউএইচও কোনো দেশের নাম উল্লেখ করেনি। তবে এই বার্তা করোনা আক্রান্ত সব দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, নানা কারণে কিছুটা বিলম্বে হলেও বাংলাদেশে সরকারের পক্ষ থেকে করোনা শনাক্তে ব্যাপক হারে পরীক্ষা করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এখন পর্যন্ত শুধু আইইডিসিআরে এ পরীক্ষা হচ্ছে। তবে স্বল্প সময়ের মধ্যে ঢাকাসহ সারাদেশে সরকারি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালসহ স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্ট একাধিক প্রতিষ্ঠানে করোনাভাইরাস পরীক্ষা করা হবে। কারণ, কভিড-১৯ রোগ বা করোনা নিয়ন্ত্রণের এটিই হচ্ছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি।
আইইডিসিআরের রবিবারের তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ সংখ্যা গত দুদিনে বাড়েনি। কিন্তু দেশের জনঘনত্ব ও মানুষের জীবনযাপনের ধরন বিবেচনায় নিয়ে বিশেষজ্ঞরা বাংলাদেশকে উচ্চ ঝুঁকির দেশ হিসেবে বিবেচনা করছেন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, করোনাভাইরাস মোকাবিলার মূল পথ হচ্ছে সংক্রমণ শনাক্ত করা। আক্রান্তদের বিচ্ছিন্ন করা এবং সংক্রমিতরা যাদের সংস্পর্শে ছিলেন, তাদের খুঁজে বের করে কোয়ারেন্টাইনে রাখা। বাংলাদেশে করোনাভাইরাস পরীক্ষার একক ও একমাত্র কর্তৃত্ব রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর)। ১৭ কোটি লোকের এই দেশে কারো মধ্যে করোনাভাইরাসের লক্ষণ দেখা গেলে এই প্রতিষ্ঠানের দেওয়া কিছু ফোন নম্বরে ফোন করতে হয়। তাদের কিছু প্রশ্নের সন্তোষজনক জবাব পেলে পরীক্ষা করা হয়। সম্প্রতি বিদেশে থেকে দেশে এসেছে ৭ লাখ মানুষ। কিন্তু পরীক্ষার জন্য নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে মাত্র ১ হাজার ৬৮ জনের। এই ৭ লাখ মানুষ সারাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে। তারা কত লাখ মানুষের সংস্পর্শে গেছে তার কোনো হিসাব নেই। এ কারণে সামাজিক সংক্রমণ শুরু হয়ে গেছে। ঢাকায় আন্তর্জাতিকমানের একটি হাসপাতালসহ দুটি হাসপাতালের চিকিত্সক ও স্বাস্থ্য কর্মী করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। যারা বিদেশফেরত নয়, আবার বিদেশফেরতদের সংস্পর্শেও যাননি।
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. খান আবুল কালাম আজাদ জানান, অজ্ঞাত কোনো মানুষ যদি করোনা বহন করে সবার সঙ্গে চলাফেরা ও মেলামেশা করে, তাহলে ভাইরাসটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়বে। দ্রুত শনাক্ত করা গেলে দেশ রক্ষা পাবে, ডাক্তার-নার্স রক্ষা পাবেন, জনগণ রক্ষা পাবে। আমরা কেউই সুরক্ষিত নই। শনাক্তকরণ ব্যবস্থা জোরদার করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন ডা. খান আবুল কালাম আজাদ। তিনি বলেন, ঢাকা মেডিক্যালে পরীক্ষার ল্যাবরেটরি আছে। কিন্তু আনুষঙ্গিক যন্ত্রাংশের অভাব রয়েছে। তবে যন্ত্রপাতি দেওয়া হচ্ছে। দ্রুত ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে করোনাভাইরাসের পরীক্ষা শুরু হচ্ছে।
কারো মধ্যে লক্ষণ দেখা গেলেই তাকে পরীক্ষা করতে হবে এবং নিশ্চিত হতে হবে তিনি সংক্রমিত কি না। এটাই এই ভাইরাসের ব্যাপক সংক্রমণ ঠেকানোর পথ। কারণ, তখনই তাকে বিচ্ছিন্ন করা যাবে, তার সংস্পর্শে আসা লোকজনকে কোয়ারেন্টাইন করা যাবে। বিলম্বে হলেও শনাক্তকরণ কার্যক্রম জোরদার করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) দু-একদিনের মধ্যে করোনা শনাক্তকরণ কার্যক্রম শুরু হবে। আইইডিসিআরে পূর্ণাঙ্গ পরীক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ জানান, ঢাকার বাইরেও শনাক্তকরণ পরীক্ষাগার স্থাপনের কাজ শুরু হয়েছে। ঢাকার মধ্যে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ, ঢাকা শিশু হাসপাতাল ও স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজে শুরু হবে। এরমধ্যে ঢাকা শিশু হাসপাতালে করোনা আক্রান্ত রোগী যেতে পারবে না। শুধু নমুনা পাঠিয়ে পরীক্ষা করা যাবে।
ঢাকার বাইরে চট্টগ্রামের ফৌজদারহাটে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ট্রপিকাল অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিসেস, কক্সবাজার মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আইইডিসিআরের ফিল্ড ল্যাবরেটরি, ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ও বরিশাল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে করোনা শনাক্তকরণ কার্যক্রম শুরুর কাজ চলছে।
আইসিইউ সংকট: করোনা আক্রান্ত রোগীদের অনেকেরই আইসিইউ প্রয়োজন হয়। সরকারি মেডিক্যাল কলেজগুলোতে মাত্র দুই শতাধিক আইসিইউ বেড রয়েছে। এই বেডগুলো অপারেশন কিংবা সংকটাপন্ন রোগীদের জন্য। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের জন্য যে পূর্ণাঙ্গ আইসিইউ প্রয়োজন, সেটা এই আইসিইউ দিয়ে সামাল দেওয়া সম্ভব নয় বলে বিশেষজ্ঞদের মত।
এবিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক জানান, নতুন ৩০০ বেডের আইসিইউ প্রস্তুত করা হচ্ছে। ডিজি অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেন, প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস দেশে আপাতত নিয়ন্ত্রণে থাকলে দুঃচিন্তামুক্ত থাকার সুযোগ নেই। কারণ এই ভাইরাসটি হঠাৎ লাফিয়ে বাড়ে। আমেরিকা ও ইতালিতে একই অবস্থা ছিল। প্রথমে অল্প সংখ্যক মানুষ আক্রান্ত হন।

