করোনা মহামারি: বাংলাদেশ পরিস্থিতি কোন পথে?

করোনা মহামারি: বাংলাদেশ পরিস্থিতি কোন পথে?

উত্তরদক্ষিণ ২৩ এপ্রিল ২০২০ । ১০:১১

বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে যাওয়া নভেল করোনাভাইরাস সংক্রমণের বিস্তার বাংলাদেশে বেড়েই চলছে। গত মাসের ২৬ তারিখ থেকে দেশে অঘোষিত লকডাউনের মধ্যেও দ্রুত গতিতে বাড়ছে করোনা বা কভিড-১৯ সংক্রমণ ও মৃতের সংখ্যা। দিন যত বাড়ছে, পরিস্তিতি ততই অবনতির দিকে যাচ্ছে। ফলে আবারও সাধারণ ছুটি ৫ মে পর্যন্ত বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

কিন্তু সাধারণ ছুটি বাড়িয়েই কি করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা যাবে? সামনের দিনগুলো বাংলাদেশের জন্য কেমন হতে পারে? এ নিয়ে বিশ্লেষক আর বিশেষজ্ঞদের ধারণাই বা কী? বিবিসি বাংলায় প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন অবলম্বনে তুলে ধরা হলো করোনা নিয়ে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি-

প্রশ্ন হলো সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার বেড়ে শেষ পর্যন্ত কোথায় দাঁড়াবে? এবং কোন পর্যায়ে এসে এই হার কমতে শুরু করবে? এসম্পর্কিত একটি মডেল রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইন্সটিটিউট – আইইডিসিআর-এর হাতে রয়েছে। কিন্তু জনমনে আতঙ্ক ছড়াতে পারে সেই বিবেচনায় এই মডেলটি সরকার বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রকাশ্যে আনতে চাইছে না।

এমনটাই বলছেন ভাইরোলজিস্ট ড. নজরুল ইসলাম। তার মতে, একদিক থেকে ঠিক কাজটিই করা হয়েছে। কারণ, এই মুহূর্তে প্রজেকশন (পূর্বাভাস) করার মতো যথেষ্ট ডেটা (উপাত্ত) পাওয়া যাচ্ছে না। তিনি বলছেন, করোনাভাইরাস রোগীদের কাছ থেকে নমুনা-রস সংগ্রহের কাজে নানা ধরনের সমস্যা রয়েছে। একদিন নমুনা সংগ্রহ করে আরেকদিন তা পরীক্ষা করা হচ্ছে। সেই তথ্য প্রকাশ করা হচ্ছে অন্য একদিন। ফলে এর থেকে এখনই কোনও সুনির্দিষ্ট মডেল তৈরি করা কঠিন। এর পাশাপাশি মাঠ পর্যায়ে আসা অনেক উপাত্ত ‘সিস্টেম লস’-এর শিকার হচ্ছে বলে ড. ইসলাম সন্দেহ করেন।

বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ এবং সম্ভাব্য মৃত্যুর হার নিয়ে গত ২৬ মার্চে তৈরি জাতিসংঘের একটি ইন্টার-ডিপার্টমেন্টাল রিপোর্ট বাংলাদেশের গণমাধ্যমে ফাঁস হয়ে যায়। এতে পূর্বাভাস করা হয়, বাংলাদেশে জনঘনত্বের বিবেচনায় করোনাভাইরাসে অনেক মানুষের জীবনহানি ঘটতে পারে। কিন্তু এই পূর্বাভাসে একটি শর্ত ছিল। আর সেটি হলো করোনাভাইরাসের বিস্তার, প্রশমন এবং অবদমনে সরকারের তরফে একেবারেই যদি কোন ধরনের জরুরি পদক্ষেপ নেয়া না হয় তাহলেই শুধুমাত্র এই পরিস্থিতি তৈরির আশঙ্কা রয়েছে।

রোগতত্ত্ববিদ ড. এ. এম. জাকির হোসেন বলেন, এই ধরনের পূর্বাভাসের কিছু সমস্যা রয়েছে। তিনি জানান, সংক্রমণ বিস্তারের কিছু শর্ত রয়েছে। এগুলো হলো- রোগাক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি, সংক্রমণের হার, আরোগ্যের হার, মৃত্যুর হার এবং রোগাক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনায় রয়েছেন এমন জনসংখ্যা। চীনের এক হিসাব মতে, করোনাভাইরাসে যারা মারা যাবেন তাদের মধ্যে ৭১% থেকে ৭৯% মারা যাবেন অন্য কোনও রোগে, যাকে ‘কো-মরবিডিটি’ বলা হয়। যেমন, হার্টের সমস্যা, ব্যাখ্যা করেন ড. জাকির হোসেন। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে চীনা হিসাবটিকে ব্যবহার করে আমরা ধরে নিতে পারি করোনাভাইরাসের আক্রান্ত হওয়ার পর যাদের বয়স ৬০ বছর বা তার ঊর্ধ্বে, এমন ৬০ হাজার থেকে ৭০ হাজার মানুষ কোমরবিডিটিতে মৃত্যুবরণ করতে পারেন। ড. হোসেন বলছেন, আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। বাংলাদেশে মৃত্যুহার হচ্ছে প্রতি ১০০০ জনে পাঁচ জন। অর্থাৎ প্রতিবছর নানা কারণে ৯ লক্ষ মানুষের মৃত্যু ঘটে থাকে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এক্ষেত্রে একটি চিত্র পাওয়া যাবে সংক্রমণের হার-এর দিকে নজর রাখলে। বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের বিস্তার যদি ‘এক্সপোনেনশিয়াল’ হয় তাহলে সেটা পরিস্থিতিকে আরও বিপজ্জনক করে তুলবে বলে তারা স্বীকার করছেন। এক্সপোনেনশিয়াল গ্রোথের একটি চিত্র পাওয়া যায় সেন্টার ফর ইনকুয়ারি-তে প্রকাশিত ভিনোদ ভরদ্বাজের একটি নিবন্ধ থেকে।

এখানে তিনি লিখছেন, আমেরিকায় ২৬ মার্চ স্থানীয়ভাবে করোনাভাইরাসে সংক্রমিত মানুষের সংখ্যা ছিল ১৫। কিন্তু সারাদেশে লকডাউন থাকার পরও পরবর্তী ছয় সপ্তাহের মধ্যে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৪ লাখ ৬০ হাজার।

বাংলাদেশে সংক্রমণের বিস্তার এক্সপোনেনশিয়াল হচ্ছে কিনা তার চিত্রটি এখনও পরিষ্কার না। প্রথম দিকের বৃদ্ধি এক্সপোনেনশিয়াল বলে মনে হলেও কয়েকদিন দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। তবে সংক্রমণের বিস্তার নিয়ে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের জেমস পি গ্র্যান্ট স্কুল অব পাবলিক হেলথ-এর গবেষক ড. মলয় মৃধা ও রিনা রানী পাল, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক দীপক কে. মিত্র এবং মার্কিন আমেরিকার জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের জনস্বাস্থ্য বিষয়ক দু’জন গবেষক মিলে যে রিপোর্টটি তৈরি করেন, তাতে বলা হয় ১০ কোটির বেশি মানুষের মধ্যে করোনাভাইরাস সংক্রমিত হতে পারে। জাতিসংঘের নথির মতোই এই রিপোর্টে ধরে নেয়া হয়, এই হারে সংক্রমণ ঘটবে যদি এই ভাইরাস মোকাবিলায় ২৮ মে’র মধ্যে একেবারেই কোনও উদ্যোগ নেয়া না হয়। তবে এই রিপোর্টটি প্রকাশিত হওয়ার পর এ নিয়ে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের জেমস পি গ্র্যান্ট স্কুল অব পাবলিক হেলথ বিবৃতি দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে জানায় যে, এটি তাদের কোনও গবেষণা নয়।

সারাদেশ ঝুঁকিপূর্ণ
বাংলাদেশে সংক্রমণ বিস্তারের এই পটভূমিতে সরকার গত ১৬ এপ্রিল সারাদেশকে ঝুঁকিপূর্ণ বলে ঘোষণা করেছে। সংক্রমণ রোধে একমাত্র কার্যকর পন্থা: জনসাধারণের নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রাখা ও সামাজিক দূরত্ব বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কিছু নতুন বিধিনিষেধও আরোপ করা হয়েছে। এতে জরুরি কারণ ছাড়া ঘর থেকে বের হওয়া এবং সন্ধ্যা ছটা থেকে ভোর ছ’টা পর্যন্ত ঘর থেকে বের হওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।

বাংলাদেশে সংক্রমণের হার যে বাড়ছে তাতে কোনও সন্দেহ নেই, বলছেন রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইন্সটিটিউট, আইইডিসিআর-এর উপদেষ্টা ড. মুশতাক হোসেন। তিনি আরও বলেন, নানা ধরনের পদক্ষেপ দিয়ে এই সংখ্যাকে কীভাবে নামিয়ে আনা যায় তা নিয়ে জনস্বাস্থ্য বিভাগের এখন চরম পরীক্ষা চলছে। তিনি বলেছেন, সংক্রমণের বিস্তার ঠেকাতে আরও অনেক বেশি কমিউনিটি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

গ্রামীণ এলাকায় সরকারের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা এখনও বেশ কার্যকর, বলছেন তিনি। কিন্তু শহরাঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা মূলত বেসরকারি খাতে। ফলে সেখানে জরুরি ভিত্তিকে তৎপরতা বাড়াতে হবে বলেও মত দেন এই বিশেষজ্ঞ। ড. মুশতাক হোসেন বলেন, করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বৃদ্ধি সম্পর্কে গাণিতিক পূর্বাভাসের সুযোগ এখনও বেশ সীমিত। কারণ এবিষয়ে আমাদের কোনও পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই। আর একেক দেশে এই ভাইরাস একেকভাবে ছড়াচ্ছে। ফলে এক দেশের মডেল অন্য দেশে প্রয়োগ করা কঠিন।

অবশ্য ভাইরোলজিস্ট ড. নজরুল ইসলাম মনে করেন, সংক্রমণের বিস্তার সম্পর্কে জানতে হলে করোনাভাইরাস পরীক্ষার পরিধিকে আরো বাড়াতে হবে। একইসঙ্গে তিনি বলেন, করোনাভাইরাস শিগগিরই কমে যাবে একথা মনে করার কোনও কারণ নেই। এটা অবশ্যই বাড়বে। কিন্তু প্রশ্ন হলো- আমরা এটাকে ঠিক কতখানি বাড়তে দেব!

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading