বিএসএমএমইউ’র চিকিৎসক বাসায় থেকেই যেভাবে সুস্থ হলেন
উত্তরদক্ষিণ ২৩ এপ্রিল ২০২০ । ১৭:৪০
দেশে প্রতিদিন যেমন নতুন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ও মুত্যু সংখ্যা বাড়ছে। পাশাপাশি বাড়ছে করোনা থেকে সুস্থ হয়ে উঠা মানুষের সংখ্যাও। সুস্থ হওয়াদের একজন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) সাবেক উপ উপাচার্য অধ্যাপক ডা. শহীদুল্লাহ সিকদার। করোনা বা কভিড-১৯ আক্রান্ত হওয়ার পর তিনি হাসপাতালে ভর্তি না হয়েই সম্পূর্ণ সুস্থ হয়েছেন।
জানা গেছে, করোনা পজিটিভ হওয়ার পর নিজের বাসায় থেকে চিকিৎসা নিয়ে দুই সপ্তাহের মধ্যে সুস্থ হয়ে উঠেছেন ডা. শহীদুল্লাহ সিকদার। সুস্থ হওয়ার সেই গল্প তিনি জানিয়েছেন গণমাধ্যমকে। তাহলে জেনে নেয়া যাক এই চিকিৎসকের সুস্থ হওয়ার গল্প-
ডা. শহীদুল্লাহ সিকদার বলেছেন, উপসর্গ কম হলে এবং নিয়ম মেনে চলতে পারলে ৮০ শতাংশ ক্ষেত্রেই ঘরে থেকে সুস্থ হওয়া সম্ভব। সেজন্য নিয়মিত পুষ্টিকর খাবার, বিশ্রামের সঙ্গে কিছুটা শরীরচর্চা, প্রচুর পরিমাণে গরম পানি পান করতে হবে। আর বাড়ির অন্যদের সুরক্ষার স্বার্থে একটি ঘরে থাকতে হবে, সম্পূর্ণ আলাদা। তবে আগে থেকেই যারা অন্য কোনো জটিল রোগে আক্রান্ত, তাদের ক্ষেত্রে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া লাগতে পারে।
ডা. শহীদুল্লাহ আক্রান্ত হন যেভাবে
বঙ্গবন্ধু মেডিকেলের চর্ম ও যৌনরোগ বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. শহীদুল্লাহ সিকদার আক্রান্ত হন এক রোগীর সংস্পর্শ থেকে। ওই রোগী নিজের উপসর্গের কথা গোপন রেখে চিকিৎসা নিতে এসেছিলেন। অধ্যাপক শহীদুল্লাহ বলেন, আমি বেশকিছু রোগী দেখছিলাম। একজন রোগীকে দেখে জ্বর.. টক্সিস, টক্সিস মনে হচ্ছিল। আমি বললাম, আপনার কি করোনাভাইরাস আছে নাকি? উনি বললেন ‘না, আমার নেই।’ এই বলে চিকিৎসা নিয়ে চলে গেলেন। তারপর নিজে থেকে উনি পরীক্ষা করালেন। পরদিন সম্ভবত পরীক্ষা করেছেন। তার পরের দিন আইইডিসিআর থেকে আমাকে জানানো হলো- ‘স্যার আপনার রোগীর করোনাভাইরাস পজিটিভ। আপনি একটু সাবধানে চলেন’।

ডা. শহীদুল্লাহ সিকদার বলেন, আমারও কিন্তু কোনো উপসর্গ ছিল না। তারপরও আমি পরীক্ষা করালাম এবং বিকালে জানালো হলো- আমারও করোনাভাইরাস পজিটিভ। তখন আমি নিজের বাসায় একেবারে কন্টাক্টলেস হয়ে গেলাম।
জানা গেছে, ৯ এপ্রিল বিএসএমএমইউর এই অধ্যাপকের সংক্রমণ ধরা পড়ে। এরপর পরীক্ষায় তার মেয়েরও করোনাভাইরাস পজিটিভ আসে।
আইসোলেশনের শুরু যেভাবে
প্রথম দিকে অধ্যাপক ডা. শহীদুল্লাহ’র তেমন কোনো উপসর্গ ছিল না। এরপর একদিন সামান্য কাশি, সর্দি, সামান্য মাথাব্যথা। শহীদুল্লাহ সিকদার বলেন, তবে তাপমাত্রা তত বেশি ছিল না। সামান্য শরীর ব্যথা হয়েছিল। সেটা খুবই কম। আমার মেয়ের একটু জ্বর হয়েছিল, পাতলা পায়খানা হয়েছিল। তবে কীভাবে থাকবেন, কোথায় চিকিৎসা নেবেন, সে বিষয়ে প্রথমে নিজেও দ্বিধায় ছিলেন বলে জানালেন এই চিকিৎসক। তিনি বলেন, আসলে করোনাভাইরাসের আতঙ্ক তো সারা দুনিয়ায় আছে। আমি যখন আক্রান্ত হলাম, টেস্ট করে যখন আমি নিজেই পজিটিভ দেখলাম, তখন আমি আসলেই একটু চিন্তিত হয়ে গেলাম যে আমি হাসপাতালে যাব না বাসায় থাকব।
পরে ভেবে তার মনে হয়, যেহেতু বড় কোনো শারীরিক সমস্যা নেই, নিজের সঠিক পরিচর্যা করতে পারলে এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে পারলে তিনি হয়ত বাসায় থেকেও হাসপাতালের চেয়ে কম সেবা পাবেন না। সেই ভাবনা থেকেই তিনি বাসায় থেকে চিকিৎসা নেন এবং মেয়ের জন্যও একই ব্যবস্থা করেন বলে জানান অধ্যাপক শহীদুল্লাহ সিকদার।
যেভাবে কেটেছে আইসোলেশনের পুরো সময়
অধ্যাপক ডা. শহীদুল্লাহ সিকদারের দুই সন্তানের মধ্যে ছেলে আছেন আমেরিকায়। স্ত্রী এবং ২০ বছর বয়সী মেয়েকে নিয়ে তিনি থাকেন ঢাকার গ্রিন রোডের বাসায়। মেয়ে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হলেও এই সময়ে স্ত্রী পুরোপুরি সুস্থ ছিলেন বলে জানান বঙ্গবন্ধু মেডিকেলের সাবেক এই উপ উপাচার্য। তিনি বলেন, আমি, আমার স্ত্রী ও মেয়ে আলাদা আলাদা ঘরে থেকে পুষ্টিকর খাবার খাওয়ার চেষ্টা করেছি। প্রচুর পরিমাণে তরল খাবার, বিশেষ করে স্যুপ, জুস আর গরম পানি পান করেছি সবসময়; আদা চা খেয়েছি। সবসময় চেষ্টা করেছি ভিটামিন সি ও মিনারেল সমৃদ্ধ খাবার খেতে। পেয়ারা, কমলা, লেবু, মাল্টা- এগুলো খেয়েছি প্রচুর পরিমাণে। তার সাথে কালোজিরা এবং মধু সকাল বিকাল খেয়েছি। প্রয়োজনে কিছু ওষুধও সেবন করেছি।
অসুস্থতার দিনগুলোতে অন্য সময়ের তুলনায় দ্বিগুণ পানি পান করেছেন জানিয়ে এই চিকিৎসক বলেন, সব সময় গরম পানি পান করছি। আর সেটা পরিবারের সবাই। বেশি বেশি পানি পান জরুরি। কারণ টক্সিস পানির সাথে বা প্রসাবের সাথে বেরিয়ে যেতে পারে।
ডা. শহীদুল্লাহ সিকদার বলেন, অসুস্থ হলে বিশ্রাম নিতেই হয়। তাই বলে তিনি সবসময় শুয়ে থাকেননি। কিছু হালকা ব্যায়াম করেছেন, যাতে শরীর সচল থাকে। এ সময় রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে পুষ্টিকর খাবারে জোর দিয়ে তিনি বলেন, সাধারণভাবে আমি সপ্তাহে একটা করে ডিম খেতাম। কিন্তু কোভিড-১৯ পজিটিভ আসার পর সপ্তাহে ৪টা করে ডিম খেয়েছি। কারণ রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে পারলে মানুষের সংক্রমণের শারীরিক ক্ষতি কমিয়ে আনা যায়। তাতে দ্রুত সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে।
আন্তর্জাতিকভাবে বলা হচ্ছে, কোভিড-১৯ হলে সুস্থ হতে দুই থেকে ছয় সপ্তাহ সময় লাগতে পারে। ডা. শহীদুল্লাহ জানান, তার ও তার মেয়ের নমুনা পরীক্ষায় দুই সপ্তাহের মধ্যেই করোনাভাইরাস নেগেটিভ এসেছে।
জটিলতা থাকলে হাসপাতালে যেতে হবে
নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে সবার উদ্দেশ্যে ডা. শহীদুল্লাহ সিকদারের উপদেশ হচ্ছে, তার ক্ষেত্রে যেহেতু শারীরিক জটিলতা ছিল না, বাসায় থেকে পুষ্টিকর খাবার পাওয়া, নিজের মতো করে পরিচ্ছন্ন থাকা এবং পরিচর্যার বিষয়টি সহজ ছিল, সেজন্য তিনি বাসায় থেকে চিকিৎসা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অধ্যাপকের অভিমত, হাসপাতালে গেলে কিছু পরিবেশগত রোগও অনেক সময় চলে আসে। অযথা হাসপাতালে গিয়ে বেশি ঝামেলা করাও বোধহয় ঠিক নয়। কারণ, যার হাসাপাতালের সেবা প্রয়োজন, জরুরি, তিনিই হাসপাতালে যাবেন। যদি কারো আগে থেকেই ফুসফুস, হৃদযন্ত্র বা কিডনিতে জটিলতা থাকে অথবা চিকিৎসার কোনো পর্যায়ে অন্য কোনো অসুস্থতা দেখা দেয়, তাহলে তাকে হাসপাতালে যাওয়ার পারামর্শ দিচ্ছেন এই চিকিৎসক।
তার ভাষায়, আমি আবারও বলছি, যদি নিয়মিত খাবার, স্বাস্থ্য পরিচর্যা এবং অন্যান্য বিষয়ে লক্ষ্য রাখা যায় তাহলে দ্রুত সুস্থ হওয়া যায়। গরম পানির ভাপ নেওয়ার (স্টিম ইনহেলেশন) একটা বিষয় আছে। সেটাও আমরা করেছি। তবে বাসায় থাকলে প্রত্যেকের আলাদা আলাদা কক্ষে থাকার ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, এক ঘর থেকে রোগী যদি আরেক ঘরে না যায় তাহলে ভাইরাস ছড়ানোর সুযোগ কমে যায়। কারণ, এটা ছড়ায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কন্টাক্টে। বিডিনিউজ।

