বিশ্বকে করোনারোধের সামগ্রী ফ্রি দিলেন: কে এই জ্যাক মা?
উত্তরদক্ষিণ ২৭ এপ্রিল ২০২০ । ১৩:৫০
চীনের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি গত মাসে একটি টুইটার অ্যাকাউন্ট খুলেছিলেন কোভিড নাইনটিন প্রাদুর্ভাবের মধ্যে। এ পর্যন্ত তার প্রত্যেকটা পোস্টে রয়েছে পৃথিবীব্যাপী এই মহামারির প্রকোপে দিশেহারা প্রায় প্রত্যেকটা দেশে চিকিৎসা সামগ্রী পাঠানোর কঠিন লড়াই তিনি কীভাবে লড়ছেন। এ লড়াইয়ে তিনি অপ্রতিদ্বন্দ্বী। তার নাম জ্যাক মা।
প্রথম দিককার একটি মেসেজে জ্যাক মার উৎসাহব্যজ্ঞক মন্তব্য ছিল: একটা বিশ্ব, ‘একটা লড়াই’। আরেকটি মন্তব্য ছিল, ‘একসাথে আমরা সফল হব’! এখন পর্যন্ত বিশ্বের দেড়শোটিরও বেশি দেশে চিকিৎসা সরঞ্জাম পাঠানোর ব্যাপক তৎপরতার পেছনে মূল চালিকাশক্তি চীনের এই ধনকুবের ব্যবসায়ী জ্যাক মা। করোনাভাইরাস মোকাবেলার জন্য ফেস মাস্ক আর ভেন্টিলেটার জোগাড় করার লড়াইয়ে যারা বিশ্বের বড় বড় দেশগুলোর পেছনে রয়েছে তাদের জন্য এসব জীবন বাঁচানোর সামগ্রী সরবরাহের উদ্যোগ তিনিই চালাচ্ছেন। কিন্তু মা’র সমালোচকরা, এমনকী তার কিছু সমর্থকও নিশ্চিত নন ভবিষ্যতে তার জন্য কী অপেক্ষা করছে।

তিনি তার সাহায্যের হাত বিশ্বব্যাপী প্রসারিত করে কি নিজেকে চীনা কম্যুনিস্ট পার্টির বন্ধু হিসেবে তুলে ধরতে চাইছেন? নাকি এটা তিনি করছেন অন্তরের তাগিদ থেকে আর তার এই দরদি উদ্যোগ থেকে একধরনের ফায়দা লুটতে চাইছে চীনা কর্তৃপক্ষ? তার এই উদ্যোগকে চীন কি পার্টির প্রচারণা কাজে ব্যবহার করছে?
জ্যাক মা অবশ্যই চীনের কূটনীতিক বিধান মেনে কাজ করছেন। বিশেষ করে কোন দেশ তার সহায়তা থেকে লাভবান হবে- সেটা নির্ধারণ করার ক্ষেত্রে। কিন্তু এর ফলে তার যে ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা, সেটা চীনের রাজনৈতিক পিরামিডে উপরের স্তরের অনেক নেতাকে ঈর্ষান্বিত করে তুলছে।
পৃথিবীর অন্যান্য দেশের প্রযুক্তি খাতের ধনকুবেরা এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তার থেকেও বেশি অর্থ জোগানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। টুইটারের জ্যাক ডর্সি এজন্য দিচ্ছেন একশো কোটি ডলার। আমেরিকাভিত্তিক একটি দাতব্য সংস্থা ক্যানডিড, যারা ব্যক্তিগত পর্যায়ে দানের অর্থের হিসাবের ওপর নজর রাখে, তারা বলছে কোভিড নাইনটিনের জন্য যারা ব্যক্তিগতভাবে অর্থ দান করছে তাদের তালিকায় চীনের আলিবাবা আছেন ১২ নম্বরে। আর এই আলিবাবার কর্ণধারই হলেন জ্যাক মা।
এই তালিকায় যাদের নাম আছে তারা দিচ্ছেন অর্থ সাহায্য। এরা কেউ জরুরি সরবরাহ পাঠাচ্ছেন না। অথচ অনেক দেশই মনে করছে, বিশ্ব মহামারির এই সময়ে নগদ অর্থের চেয়ে বেশি প্রয়োজন চিকিৎসা সরঞ্জামের।

সবার থেকে আলাদা
করোনাভাইরাস মোকাবেলায় যারা আর্থিক সহায়তা করছে তাদের তালিকায় সবার শীর্ষে টুইটারের নাম। তারপরেই আছে গুগল এবং পঞ্চম স্থানে বিল ও মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন।
তালিকায় বারো নম্বরে জ্যাক মা-র আলিবাবা গ্রুপের নাম থাকলেও একমাত্র জ্যাক মা, যাদের চিকিৎসা সরঞ্জাম প্রয়োজন তাদের কাছে সরাসরি তা পাঠাচ্ছেন। মার্চ মাস থেকে শুরু করে জ্যাক মা ফাউন্ডেশন এবং তার সহযোগী আলিবাবা ফাউন্ডেশন বিমানে করে আফ্রিকা, এশিয়া, ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকার দেশগুলোতে, এমনকী ইরান, ইসরায়েল, রাশিয়া এবং আমেরিকাতেও সরঞ্জাম পাঠিয়েছে।
করোনাভাইরাস টিকা আবিস্কারের গবেষণায় মা লক্ষ লক্ষ ডলার অর্থসাহায্য করেছেন এবং তার নিজের বাড়ি চীনের যে ঝেজিয়াং প্রদেশে সেখানকার ডাক্তারদের লেখা চিকিৎসা পরামর্শের পুস্তিকা চীনা ভাষা থেকে ১৬টি বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদ করা হয়েছে। কিন্তু জ্যাক মা খবরের শিরোনামে উঠে এসেছেন পৃথিবীর নানা দেশে চিকিৎসা সামগ্রী পাঠানোয় তার অবদানের জন্য। আর এ কারণেই তিনি সবার থেকে আলাদা হয়ে উঠেছেন।
“তিনিই একমাত্র মানুষ, চীনের হ্যাংঝু থেকে আফ্রিকার আদ্দিস আবাবায় -এক কথায় পৃথিবীর যে কোন দেশে বিমানে করে চিকিৎসা সরঞ্জাম পাঠিয়ে দেবার ক্ষমতা ও অর্থবল যার আছে,” বলেছেন মা-র জীবনীকার ডানকান ক্লার্ক। “সামগ্রী গন্তব্যে পৌঁছনো, তার আয়োজন, আর ব্যবস্থাপনা নেটওয়ার্ক- এসবই তার প্রতিষ্ঠানের বিশেষত্ব, এসব নিয়েই তার ও তার কর্মীদের কাজ।”

জ্যাক মা’র অজানা গল্প!
জ্যাক মা একজন আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব। ইংরাজির শিক্ষক হিসেবে তিনি ছিলেন সুপরিচিত। তিনি চীনের বৃহত্তম প্রযুক্তি সংস্থা আলিবাবা-র প্রতিষ্ঠাতা। আলিবাবা এখন “পূবের আমাজন” নামে পরিচিত। চীনের বন্দর নগরী হ্যাংঝু-র ছোট্ট একটা অ্যাপার্টমেন্ট ঘর থেকে তিনি এই কোম্পানি গড়ে তোলেন। ১৯৯৯ সালে চীনের কারখানা অধ্যুষিত এলাকার কেন্দ্রে ছিল এই হ্যাংঝু শহর। এরপর ধীরে ধীরে আলিবাবা পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ চীনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অন্যতম প্রভাবশালী একটি সংস্থায় পরিণত হয়। চীনের অনলাইন, ব্যাংকিং এবং বিনোদন জগতে তাদের অবদান হয়ে ওঠে বিশাল।। চার হাজার কোটি ডলারের ব্যবসার মালিক হয়ে ওঠেন জ্যাক মা।
২০১৮ সালে আলিবাবার চেয়ারম্যানের পদ থেকে তিনি সরে দাঁড়ান। তিনি বলেন তিনি দানধ্যান নিয়ে থাকতে চান। কিন্তু আলিবাবা-র পরিচালনা বোর্ডে তার স্থায়ী পদ থেকে যায়। শুধু সম্পদ আর খ্যাতি নয়, মা চীনের অন্যতম প্রভাবশালী একজন ব্যক্তি।
আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে, জ্যাক মা পার্টির নির্দেশাবলী মেনেই অর্থদান করছেন। কারণ চীনের প্রতিবেশী এবং তার কূটনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী তাইওয়ানের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক আছে এমন কোনও দেশকে সাহায্য করেননি জ্যাক মা এবং তার আলিবাবা ফাউন্ডেশন।
মা টুইটারে ঘোষণা করেছেন লাতিন আমেরিকার ২২টি দেশে তিনি দান পাঠাবেন। তাইওয়ানের সমর্থক বেশ কিছু দেশ চিকিৎসা সামগ্রী চেয়েছিল। কিন্তু তাদের নাম ১৫০টি দেশের তালিকায় নেই। কোন কোন দেশ সাহায্য পেয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চাইলেও ফাউন্ডেশন সে তথ্য দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে এই বলে যে, এই মুহূর্তে এত বিস্তারিত তথ্য শেয়ার করা হচ্ছে না।
তবে তার দান যে কৃতজ্ঞতার সঙ্গে গৃহীত হয়েছে সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। কিছু ঝামেলা হয়েছিল কিউবা ও এরিত্রিয়াতে পাঠানো চালান নিয়ে। কিন্তু এর বাইরে তার ফাউন্ডেশন, চীন থেকে যেসব দেশে চিকিৎসা সাহায্য পাঠিয়েছে, সেই সবগুলো দেশই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে। এই সাফল্যের ফলে জ্যাক মা’র নিঃসন্দেহে একটা ইতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি হয়েছে। চীনের রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত সংবাদমাধ্যমে তার নাম দেশটির নেতা শি জিনপিং-এর সঙ্গে একই কাতারে, একই গুরুত্বের সাথে উচ্চারিত হচ্ছে। সূত্র : আলিজিলিয়া ও বিবিসি।

