স্বপ্নের আমেরিকায় অসহায় বাংলাদেশি অভিবাসীরা!

স্বপ্নের আমেরিকায় অসহায় বাংলাদেশি অভিবাসীরা!

উত্তরদক্ষিণ শুক্রবার ১৫ মে ২০২০। ২২:২৫

কাজী জেসিন: দু’মাস হয়ে গেছে নিউইয়র্ক শহর সম্পূর্ণ লকডাউন। আপাত দৃষ্টিতে সময় থমকে থাকলেও কিছু কিছু মানুষের জীবনে বদলে যাচ্ছে খুব দ্রুত। নীরবে নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে বহু পরিবার। কিন্তু কারো কান্নার আওয়াজ পাওয়া যায় না। হয়ত নির্বাক মানুষ চিৎকার জানে না। জীবন এখানে পেন্ডুলামের মতো দুলছে। শহরের যে জায়গাগুলোতে বাঙালিরা বাস করে কোভিড-১৯ আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা সেখানে অনেক বেশি।

এ পর্যন্ত নিউইয়র্কে ২ শতাধিক বাংলাদেশি কোভিড-১৯ আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। মোট আক্রান্ত বাংলাদেশির সঠিক কোনো পরিসংখ্যান পাওয়া যায় না, তবে স্বাভাবিক ভাবে অনুমান করা যায় এই সংখ্যা হবে হাজারেরও উপরে।

মৃতের সংখ্যা কিছু বেশি হতে পারে, কারণ এই তথ্য সরকারি ভাবে প্রদত্ত নয়। এই লক-ডাউনের মধ্যে এখানে স্থানীয় সাংবাদিকরা যে যেভাবে পারছেন নিজেদের সোর্সে মৃত বাংলাদেশিদের তথ্য জানার চেষ্টা করছেন। ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছেন কতো মানুষ তারও কোনো পরিসংখ্যান নেই।

রিশিতার মা। একা সংসার চালান। মেয়ের পড়ার খরচ, খাবার, বাসা ভাড়া সব খরচ তাকেই বহন করতে হয়। গ্রোসারিতে চাকরি করেন, প্রতি ঘণ্টার পারিশ্রমিক পান সর্বনিম্ন মজুরির চেয়ে অনেক কম। বেঁচে থাকার জন্য এই চাকরি করা ছাড়া তার কোনো উপায় নেই। উপায়হীন অবস্থায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন এরকম অনেক বাংলাদেশি।

‘স্বপ্নের আমেরিকা’
যে বাংলাদেশিরা দ্রারিদ্রতা থেকে বাঁচতে, সন্তানদের নিরাপদ ভবিষ্যতের জন্য, অথবা একটা অপেক্ষাকৃত সুন্দর জীবনের জন্য আত্মীয় পরিজন ছেড়ে ”স্বপ্নের আমেরিকায়” পাড়ি দিয়েছেন তারা এখন সময়ের এক গভীর গর্তের ভেতর থেকে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে আছেন।

বাংলাদেশি অভিবাসীরা যুক্তরাষ্ট্রর বিভিন্ন স্থানে স্থায়ী হলেও বেশিরভাগই বসতি স্থাপন করেন নিউ ইয়র্ক, ক্যালিফোর্নিয়া আর নিউ জার্সির শহরগুলোতে। অভিবাসীদের মধ্যে খুব অল্প সংখ্যক মানুষই স্ব স্ব ক্ষেত্রে পেশাদার হিসেবে সফল।

জীবন নির্বাহের জন্য বেশিরভাগ মানুষই এখানে ট্যাক্সি চালান, বিভিন্ন রেস্তোরায় বা অফিসে হাড় ভাঙা পরিশ্রম করেন। এশিয়ান আমেরিকান সোসাইটির ২০১৫ সালের করা একটি গবেষণার তথ্য অনুযায়ী নিউ ইয়র্কে বসবাসরত বাংলাদেশিদের হাউজহোল্ড ও মাথাপিছু গড় আয় নিউ ইয়র্কের অন্যান্য নাগরিকদের গড় মাথাপিছু ও হাউজহোল্ড আয়ের চেয়ে কম।

যেখানে শহরে সকল নাগরিকদের গড় পারিবারিক আয় ৫৯ হাজার ২ শত ৮৫ ডলার, সেখানে বাংলাদেশিদের গড় পারিবারিক আয় ৩৮ হাজার ৮ শত ৬৮ ডলার আর বাংলাদেশিদের মাথাপিছু আয় ১৪ হাজার ৪ শত ৯১ ডলার, শহরে মাথাপিছু আয় ৩৩ হাজার ৩৮ ডলার।

সকল বাংলাদেশির মধ্যে শতকরা ২৮ দশমিক ২ শতাংশ বাস করে দারিদ্র সীমার নিচে এবং বাংলাদেশি প্রবীণদের দারিদ্রসীমাও তুলনামূলক ভাবে অনেক বেশি, শহরের অন্যান্য প্রবীণদের তুলনায়।

‘আমরা অনেক ক্ষুধার্ত!’
নিউইয়র্ক শহরে প্রথম কোভিড-১৯ রোগী ম্যানহ্যাটন এলাকাতে শনাক্ত হলেও, এই ভাইরাসবাহী রোগ সবচেয়ে বেশী জেঁকে বসেছে নিউ ইয়র্কের বাঙালি অধ্যুষিত এলাকা জ্যাকসন হাইটস, এমহার্স্ট, কুইন্স ও ইস্ট এমহার্স্টে।

রাজিয়াহ বেগম, একজন বিধবা। থাকেন জ্যাকসন হাইটসে। এক সাক্ষাৎকারে নিউ ইয়র্ক টাইমসকে তিনি বলেন, তার রুমমেটদের তিনজনের মধ্যে দুইজনের ইতিমধ্যে কোভিড-১৯ এর লক্ষণ দেখা গেছে। ভয় পাচ্ছেন তিনিও দ্রুত অসুস্থ হয়ে যাবেন। এপার্টমেন্টের কারোও চাকরি নেই, সবাই একবেলা খেয়ে থাকছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা অনেক ক্ষুধার্ত, কিন্তু আমি আরও ভয় পাচ্ছি যে আমি অসুস্থ হয়ে যাবো।”

তিনি এখন কেমন আছেন আমরা জানি না। রাজিয়াহ বেগমের মতো আরও অনেক বাংলাদেশি অভিবাসী এইভাবে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছেন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এখানে পরিবারগুলোতে একজন আক্রান্ত হলে, অন্যদের সেখানে নিরাপদ থাকা কঠিন, কারণ এই এলাকাগুলোতে সবাই একটি ছোট বাসার মধ্যে ঘর ও বাথরুম শেয়ার করে বসবাস করেন। অনেককেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে হচ্ছে, নিজেদের কাছে পর্যাপ্ত সঞ্চয় না থাকায়।

যুক্তরাষ্ট্র সরকার ঘোষিত দুই ট্রিলিয়ন ডলারের স্টিমুলাস প্যাকেজের অর্থ অনেকের কাছে পৌঁছলেও এখনও হাজার হাজার মানুষ এই অর্থ সহযোগিতা পাননি।

আকাশচুম্বী বাড়ি ভাড়া
নিউ ইয়র্কের সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের জন্যই এই মুহূর্তে দুর্যোগকালীন এই সহযোগিতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অথচ যাদের খুব কম আয়, যাদের ট্যাক্স ফাইল খোলা নেই বা যারা অবসরে সরকারের পেনশনের টাকায় চলেন তারাই এখনও পর্যন্ত এই প্যাকেজের অর্থ পাননি।

লক-ডাউন থাকার দু’মাস পার হয়ে গেছে। যারা ফুড স্ট্যাম্প, অর্থাৎ সরকারের কাছে থেকে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যের জন্য সহযোগিতা নিচ্ছেন, তারা হয়তো খেয়ে বাঁচছেন, কিন্তু যারা বৈধ কাগজপত্র ছাড়া আছেন এবং এখনও সরকারের কাছ থেকে কোনো অর্থ সহযোগিতা পাননি, তারা কেমন আছেন আমরা জানি না।

নিউইয়র্কে বসবাসকারীদের জন্য একটি বাড়তি দুশ্চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে বাড়ি ভাড়া পরিশোধ করা। শহরে যারা থাকেন তাদের আকাশচুম্বী বাড়ি ভাড়া পরিশোধ করতে হয়।

ন্যাশনাল ল্যান্ডলর্ড গ্রুপের তথ্য অনুযায়ী গত মাসের প্রথম সপ্তাহে নিউ ইয়র্কে ৩১ শতাংশ মানুষ বাড়ি ভাড়া দিতে ব্যর্থ হয়েছে। বলা বাহুল্য এর মধ্যে একটি বড় অংশ বাংলাদেশি নিউ ইয়র্কবাসী, যারা এই স্টেটের তুলনামূলকভাবে দরিদ্রতর জনগোষ্ঠী।

সাহসী আন্দোলন
নিউ ইয়র্ক সেনেট কমিটিতে বাড়ি ভাড়া মৌকুফ এবং বাড়ির মালিকদের মর্টগেজ সংক্রান্ত একটি বিল প্রস্তাবিত হলেও তা আলোর মুখ দেখেনি, গভর্নর এ্যান্ড্রু কুওমোর এই বিষয়ে সম্মতি না থাকায়।

সাময়িকভাবে বাড়ি ভাড়া না দিতে পারলে যেন ভাড়াটিয়াদের বাসা থেকে কেউ উচ্ছেদ করতে না পারে, গভর্নর এই আদেশ দিলেও, অনেকেরই বাড়ির মালিকরা ভাড়ার জন্য তাদের ভাড়াটিয়াদের উপর মানসিক চাপ সৃষ্টি করছেন।

কর্মহীন নাগরিকদের রক্ষায় ইতিমধ্যে ভাড়াটিয়া অধিকার গ্রুপ ও কমিউনিটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠানগুলো একটি সাহসী আন্দোলন ”#CancelRent” শুরু করেছে। বাঙালি অধ্যুষিত এলাকা কুইনস থেকে শুরু হলেও এই আন্দোলন এখন ছড়িয়ে পড়েছে পুরো নিউ ইয়র্ক স্টেট হয়ে লস এঞ্জেলস পর্যন্ত। কিন্তু ”#CancelRent” আন্দোলন সুদূর প্রসারী, এর আশু কোনো ফল এই মহামারির কালে কেউ পাবে কি-না নিশ্চিত না। সুতরাং ভাড়া পরিশোধের জন্য, আগামীতে দেনার দায় পরিশোধের জন্য মানুষকে এই মহামারির মধ্যেও জীবন হাতের মুঠোয় নিয়ে কাজ করতে হচ্ছে, আর যাদের কাজ নেই তাদের শূন্যে তাকিয়ে ভাবতে হচ্ছে ভবিষ্যতের কথা।

ক্যাব চালিয়েও আয় নেই
জামাল, তার পরিবার নিয়ে দেশ ছেড়েছেন প্রায় পাঁচ বছর হলো। তিনি মাস্টার্স করেছেন ঢাকার একটা নামকরা প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি থেকে। দেশে বহু চেষ্টা করেও একটা ভালো চাকরি পান নি। আর্থিক সচ্ছলতা আর ছেলে-মেয়েদের ভালো ইউনিভার্সিটিতে পড়ানোর স্বপ্নে দেশ ছেড়েছেন।

এখন ক্যাব চালান। অনেক ক্যাব চালক কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত। আতঙ্ক নিয়েও তিনি বের হচ্ছেন যদিও তেমন কোনো ইনকাম এখন নেই। একটা প্যাসেঞ্জারের জন্য অপেক্ষা করতে হয় প্রায় ৬ ঘণ্টা। মেয়েও ঝুঁকি নিয়ে রেস্তোরায় কাজ করছে। জামাল চান নি তার টিনএজার ছেলে মেয়েরা কাজ করুক। কিন্তু উপায় নেই। অভাব এখানেও তাকে মুক্তি দেয় নি।

জাঁ পল সার্ত্র যথার্থই বলেছেন, শ্রমিকরা বয়ঃসন্ধি থেকে কোনো ছেদ ছাড়া মনুষ্য জীবনে পৌঁছে যায়। কোনো ভাবধারা নিয়ে ভাবার, কোনটা বেছে নেবে ভবিষ্যতের জন্য সেসবের গভীরে যাবার সময় তাদের নেই।

মোঘল সাম্রাজ্যের পতনের পর দীর্ঘ প্রায় দুইশত বছরের ব্রিটিশ উপনিবেশে, হারিয়ে যাওয়া কোহিনূর হীরার মতো হারিয়ে ফেলা ঐশ্বর্যের জন্য কোন আফসোস আর বাঙালির ভেতর নেই। শ্রমে-ঘামেই বেঁচে থাকার যুদ্ধে লিপ্ত আছে সাধারণ খেটে-খাওয়া বাঙালি।

গুটিকয় মানুষ যারা ভালো আছেন, তারা বেশ ভালো আছেন। যারা ভালো নেই, তারা কোথাও ভালো নেই, না দেশে না বিদেশে।

যে অর্থনৈতিক পদ্ধতি তাদের দেশে অসহায় করে রাখে, সেই একই পদ্ধতি তাদের এই সাত-সমুদ্র তেরো নদী পারেও করে রাখে অসহায়। আর এই কোভিড-১৯ তাদের আরও কতো অসহায় করবে তা কে জানে? (বিবিসি বাংলার সৌজন্যে)
লেখক: সাংবাদিক, নিউইয়র্ক।

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading