আম্পানের ক্ষত: উপকূলবাসীর সীমাহীন ভোগান্তি
উত্তরদক্ষিণ শনিবার ২৩ মে ২০২০। ১২:২০
মোহাম্মদ শিহাব: ঘূর্ণিঝড় আম্পান এখন শুধুই অতীত। কিন্তু আম্পানের আঘাতে সৃষ্ট ক্ষতে উপকূলবাসীর ভোগান্তি নিত্যদিনের। ঝড়ের সময় তীব্র স্রোতে ভেঙে যায় উপকূলের বিভিন্ন জেলার বেড়িবাঁধ। আম্পান অস্তিত্বহীন হয়ে বিদায় নিয়েছে। তবে এর তাণ্ডবে ভেঙে যাওয়া বেড়িবাঁধ দিয়ে এখন প্রতিদিনই জোয়ারের পানি ঢুকে প্লাবিত হচ্ছে বিস্তির্ণ এলাকা।
একদিকে করোনা মহামারিতে কর্মহীন পরিবারগুলো প্রায় নিঃস্ব। তার ওপর আম্পানের প্লাবনে অনেকের বসত ঘরটুকুও ভেঙে গেছে। কারো ঘরের চালা নেই। কারো আবার ঘর ঠিক থাকলেও পানি ঢুকে সব ভিজিয়ে দিয়ে গেছে আম্পান। আর এখন প্রতিদিন দুবার জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হয় বাড়িঘরসহ পুরো জনপদ। রমজানের শেষ দিনগুলোতে উপকূলবাসীর ঠিক মতো ইফতার আর সাহরি করারও সুযোগ নেই। সব মিলিয়ে পুরো পরিস্থিতি মরার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়ে সাতক্ষীরা, পটুয়াখালী, বরগুনা, ভোলা, যশোর ও বাগেরহাটসহ উপকূলীয় উঞ্চলের মানুষের জন্য।
পটুয়াখালী সদর উপজেলার বড়বিঘাই ইউনিয়নের দক্ষিণ তিতকাটা থেকে সৈয়দা সায়লা আক্তার জানান, তাদের বাড়ি পায়রা নদীর তীরে। নদী ও তাদের বসত ঘরের মাঝে একটি পুরোনো বেড়িবাঁধ আছে। ২০০৭ সালের সিডর ও পরে আইলার আঘাতে সেই বেড়িবাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এরপর দায় সারাভাবে সেটি মেরামত হলেও তা আম্পান রোধে যথেষ্ট শক্তিশালী ছিল না। ফলে আম্পান আঘাত হানার সাথে সাথে নদীর পানির প্রবল স্রোতে তা মুহূর্তেই ভেঙে যায়। বুধবার রাতে ঝড়ের সময় পানি প্রবেশ করে তাদের বাড়িঘরসহ আশপাশের পুরো এলাকা তলিয়ে যায়।
সৈয়দা সায়লা বলেন, সিডরের চেয়ে বাতাসের গতি কম ছিল আম্পানের। কিন্তু বুধবার পুরো রাতই চলে ঝড়ের তাণ্ডব। আমরা প্রাণে বেঁচে গেছি আম্পানের আঘাত থেকে। কিন্তু এলাকার প্রায় প্রতিটি ঘরে পানি ঢুকে বিছানা ও আসবাবপত্রের সঙ্গে চাল, ডাল- যা কিছু ছিল সব ভিজে গেছে। আম্পান চলে গেলেও আমাদের ভোগান্তি বিন্দুমাত্র কমেনি। কারণ, এখন ভেঙে যাওয়া বেড়িবাঁধের অংশ দিনে প্রতিদিন দুবার জোয়ারের পানিতে সব প্লাবিত হচ্ছে।

একই এলাকার বাসিন্দা বিউটি বেগম বলেন, ঘূর্ণিঝড় আম্পানে জলোচ্ছ্বাসে পুকুরের মাছ ভেসে গেছে। ঘরের ভেতর পানি ঢুকে সব নষ্ট হয়ে গেছে। গাছপালাতো নষ্ট হয়েছেই। বড় সমস্যা হচ্ছে দিনে ও রাতে এখন দুবার ঘরে পানি ঢোকে। এতে ঘরে থাকা সব কিছু শেষ হয়ে যাচ্ছে।
এ সমস্যা পোহাতে হচ্ছে ওই গ্রামের প্রত্যেককে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, পটুয়াখালী সদর উপজেলার তিতকাটাসহ জেলার বিভিন্ন এলাকার বেড়িবাঁধ ভেঙে অন্তত ১৭টি গ্রামের হাজার হাজার মানুষ একই ভোগান্তি সহ্য করছেন এখন।
এদিকে, সাতক্ষীরা জেলার সুন্দরবন সংলগ্ন শ্যামনগরের লোকজন বুধবার রাতভর আম্পানের তান্ডবের দুঃস্বপ্ন কাটিয়ে এখন ক্ষয়-ক্ষতির হিসাব করছেন। শ্যামনগরের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত প্রত্যন্ত গাবুরা ইউনিয়নের নয়টি গ্রামের প্রায় দেড় হাজার পরিবারের সবাই কম-বেশি বিপর্যস্ত।
গাবুরার বাসিন্দা মানিক হোসেন, যিনি নিজে সরকারের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমে একজন স্বেচ্ছসেবি হিসাবে কাজ করেন, মোবাইল ফোনে বিবিসি বাংলাকে বলেন, আম্পানের তান্ডবে তিনি নিজেও চরম দুর্দশায় পড়েছেন। আম, জাম, জামরুল, পেয়ারার বড় বাগান রয়েছে তাদের। ঝড়ে ভরন্ত এসব মৌসুমি ফলগাছের সব ফল ঝরে গেছে। সত্তর-আশিটি আমের গাছ আমাদের। দু-একটি গাছে চার-পাঁচটি আম আছে। আর সব মাটিতে। পেয়ারা গাছেগুলোর একই অবস্থা, জামরুল গাছের একই অবস্থা। কিছু গাছ পড়ে গেছে, আনেক গাছের গোড়া নড়ে গেছে। বাঁচবে কীনা জানি না।
তিনি বলেন, গাবুরার নয়টি গ্রামের সবাইর একই অবস্থা। তবে গাবুরার মানুষের প্রধান চিন্তা ভেঙ্গে যাওয়া বাঁধ নিয়ে। মানিক হোসেন জানান, অনেকগুলো জায়গায় বাঁধ ভেঙ্গে যাওয়ায় জোয়ারের সময় খোলপেটুয়া নদী থেকে হুহু করে পানি ঢুকছে। “পানি ঢুকে গ্রামগুলোকে একেকটি দ্বীপের মত লাগছে,” তিনি বলেন।
ঘরের চালে মানুষ
দু-তিনটি গ্রামে মানুষের ঘরে-উঠোনে পানি ঢুকেছে। “কিছু মানুষ ঘরের চালে উঠে থাকছে। ঘর ভেঙ্গে যাওয়ায় বা পানি ওঠায় কিছু মানুষ এখনও সাইক্লোন শেলটার রয়ে গেছেন,” তিনি জানান। গাবুরা থেকে ঝড়ের আগের দিনই প্রশাসনের পক্ষ থেকে হাজার দুয়ের মানুষকে নদী পার করে শ্যামনগর উপজেলা সদরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। তাদের অনেকে এখনও ফেরেননি।
শ্যামনগরের পদমপুকুর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য স্বপন মন্ডল বলেন, ঝড়ে তার এলাকার “ধাপা সাইক্লোন শেলটারের কাছ থেকে শুরু করে পাতাখালি স্লুইস গেঠ পর্যন্ত” পুরো বাঁধ ধসে গেছে।
প্রশাসনের অপেক্ষায় না থেকে এলাকার কয়েকশ লোক নিজেরাই বাঁধা মেরামতের চেষ্টা করছেন। স্বপন মন্ডল বলেন, গত দুদিনে তেমন কোনো ত্রাণ তার এলাকায় আসেনি। “প্রথম দিন ৩০ কেজি চাল ও ডাল পাওয়া গিয়েছিল, তা দিয়ে খিচুড়ি রেঁধে আশ্রয় কেন্দ্রের মানুষকে খাওয়ানো হয়েছিল,” তিনি বলেন।
সমুদ্রে ফিরে গেছে জাহাজ
আম্পানে আরেকটি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা বাগেরহাট জেলার মঙলা থেকে স্থানীয় সাংবাদিক আবু হোসেইন সুমন জানান, সুন্দরবন সংলগ্ন জয়মনি, চিলা, বৈদ্যমারি এলাকায় শতিনেক বাড়ি ধসে পড়ায় অনেক মানুষ গতকাল খোলা আকাশের নীচে রাত কাটিয়েছেন। উপজেলার পক্ষ থেকে দুহাজারেরও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে ১০ কেজি করে চাল দেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান।
এছাড়া, মঙলায় কোস্ট গার্ডের এক কর্মকর্তার সূত্রে আবু হোসেইন সুমন জানান, বাহিনীর পক্ষ থেকে বাগেরহাট, খুলনা এবং সাক্ষীরার সুন্দরবন সংলগ্ন গ্রামগুলোর সাড়ে তিন হাজার পরিবারকে খাদ্য সাহায্য দেওয়া হয়েছে। উপজেলা প্রশাসনকে উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, বাঁধ ভেঙ্গে দু হাজারের মত চিংড়ি ঘের ভেসে গেছে। ঝড়ের দুদিন পরও মঙলা উপজেলার সব মানুষের ঘরে এখনও বিদ্যুৎ আসেনি। তবে, ওই সাংবাদিক জানান, মোংলা বন্দরে জাহাজ চলাচল শুক্রবার সকাল থেকেই শুরু হয়ে গেছে। নৌবাহিনী এবং কোস্ট গার্ডের যে আটটি জাহাজ সমুদ্র থেকে মোংলা বন্দর এলাকায় এসে আশ্রয় নিয়েছিল সেগুলো সকালেই সাগরে ফিরে গেছে। তথ্য সহায়তা বিবিসি।

