কৃষ্ণবর্ণের জন্য নিপীড়িত হে মানব সন্তান!
উত্তরদক্ষিণ । মঙ্গলবার ১৬ জুন ২০২০ । ১৩:৩০
সৈয়দ আবদাল আহমেদ: জর্জ ফ্লয়েড। কৃষ্ণবর্ণের জন্য নিপীড়িত হে মানব সন্তান! অভিশপ্ত বর্ণবাদ তোমাকে এ পৃথিবীতে বাঁচতে দিল না। খুব অসহায়ভাবেই তোমাকে নিতে হলো চিরবিদায়। দুঃখ করো না। এই নরকে বেঁচে থেকেই বা কী লাভ? হে কৃষ্ণবর্ণ ভাই আমার, জানি তোমার আত্মা এখন আছে স্বর্গীয় প্রশান্তিতে। এও জানি, হয়ত তোমার আত্মা আছে সেসব প্রশান্ত আত্মার সাথে,যাঁরা ছিলেন তোমারই পূর্বসূরী কিংবা সুহ্নদ।
কুন্টা কিন্টে, মার্টিন লুথার কিং, ম্যালকম এক্স এবং নেলসন ম্যান্ডেলা। এমনকি আব্রাহাম লিংকনও। সেই আড়াইশ বছর আগে কুন্টা কিন্টেকে সাদা বর্ণের লোকেরা গাম্বিয়ার জংগল থেকে ধরে এনে ক্রীতদাস বানিয়ে নিপীড়ন করেছিল। আর বর্ণবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে সাদা সন্ত্রাসীর হাতে নৃশংস হত্যার শিকার হয়েছিলেন মার্টিন লুথার কিং। কালোবর্ণ মানুষের মানবাধিকার আদায় করতে গিয়ে প্রাণ দিয়েছিলেন ম্যালকম এক্স। মহান প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন, যিনি জঘন্য দাসপ্রথা উচ্ছেদ করেছিলেন। তথাকথিত শ্বেত শ্রেষ্টত্ববাদীরা তাঁকেও বাঁচতে দেয়নি, হত্যা করেছিল!
নেলসন ম্যান্ডেলা, আফ্রিকার সেই মহান নেতা যার সারাটা জীবন কালো মানুষের অধিকার আদায়ে সংগ্রাম করেই কাটাতে হয়েছে। জীবনের মূল্যবান ২৭টি বছর তাঁর কেটেছে জেলের অন্ধকার প্রকোষ্টে। কিন্তু হায়, বর্ণবাদ রয়ে গেছে একইভাবে। মহানবী হযরত মুহাম্মদ সা. সাড়ে ১৪শ বছর আগে বিদায় হজের ভাষনে বলে গেছেন, “মানুষে মানুষে কোনো ভেদাভেদ নাই। সাদার ওপর কালোর বা কালোর ওপর সাদার কোনো শ্রেষ্টত্ব নাই।”
এ উপদেশ সবাই অনুসরণ করলে আমরা আজ পেতাম একটা শান্তির পৃথিবী। কিন্তু সাদারা সবসময় সাদা বর্ণকে শ্রেষ্ট বলে গায়ের জোর খাটিয়ে যাচ্ছে । ফলে পৃথিবীতে বর্ণবাদ এক বিষবাষ্প হয়েই আছে। জর্জ ফ্লয়েড,ভাই আমার। তোমার সাথে আমার কখনো দেখা হয়নি। কিন্তু তুমি যেনো কত পরিচিত আমার। জানো, তোমাকে মেরে ফেলার জীবন্ত সেই ছবি দেখে আমি শিহরিত হয়ে উঠি। মাত্র ৮ মিনিট ৪৬ সেকেন্ডের ভিডিওটা দেখার পর ঠিক থাকতে পারিনি। মূহুর্তেই অনুভব করেছি কে যেনো আমার বুকে খঞ্জর বসিয়ে দিয়েছে। ওহ, কী নির্মম, কী নিষ্ঠুর সেই দৃশ্য! সেই থেকে আমার মনের মধ্যে বইছে বঙ্গোপসাগরের ঝড়।
সিগারেট কেনার জন্য মাত্র ২০ ডলারের একটি জাল নোট দেয়ার অভিযোগে আমেরিকার মিনিসোটার মিনিয়াপোলিস শহর থেকে চার শ্বেতাঙ্গ পুলিশ তোমাকে ধরে হাতকড়া পরালো। গাড়িতে তুলতে গেলে তুমি মাটিতে পড়ে যাও। এমনি ডরিক চৌভিন নামের সাদা পুলিশ কর্তাটি তোমার ঘাড়ের ওপর হাঁটু দিয়ে চেপে ধরে রাখে সড়কে নয় মিনিট। শ্বাস নিতে না পেরে তুমি কাতরাচ্ছিলে এবং পুলিশটিকে বলছিলে “আমি শ্বাস নিতে পারছি না,মরে যাচ্ছি।” কিন্তু নির্দয় পুলিশটির এতটুকু মায়া হয়নি। তুমি “মা, মা” শব্দের শেষ চিৎকার দিয়ে মৃত্যুর কোলো ঢলে পড়লে। দিনটি ছিল ২৫ মে, ২০২০। জানো, তোমার ওপর এই জুলুমের বিরুদ্ধে সেইদিন থেকেই প্রতিবাদ শুরু হয়।
বর্ণবাদ বিরোধী এ বিক্ষোভের ঢেউ এখন দেশে দেশে আচঁড়ে পড়েছে। তিন সপ্তাহেও সেই ক্ষোভ থামছে না। মার্টিন লুথার কিংয়ের মৃত্যুর পর যে বিক্ষোভ হয়েছিল,সে রকমই। এরইমধ্যে শ্বেতাঙ্গ পুলিশ জর্জিয়ার আটলান্টা শহরে রেশারড ব্রুকস নামে আরেক কৃষ্ণাঙ্গ যুবককে হত্যা করেছে। আব্রাহাম লিংকন ১৮৬৩ সালের ১জানুয়ারি ‘ইমানসিপেশন প্রোক্লেমেশন’ জারি করে আমেরিকার জঘন্য দাসপ্রথা বিলুপ্ত করেছিলেন। তিনি তখন ৩৫ লক্ষ ক্রীতদাসকে মুক্তি দিয়েছিলেন । এজন্য অবশ্য তাঁকে চরম মূল্য দিতে হয় গুলিতে প্রাণ বিসর্জনের মাধ্যমে। লিংকন দাসপ্রথা উচ্ছেদ করলেও বর্ণবৈষম্যের অবসান হয়নি। তুচ্ছ ছুতোয় কালোদের ঘায়েল করা চলতেই থাকে। দড়িতে ঝুলিয়ে প্রকাশ্যে ফাঁসি দেয়া বা লিঞ্চিং ছিল নিয়মিত ব্যাপার। ক্লু ক্লাক্স ক্ল্যান নামের শ্বেত শ্রেষ্টত্ববাদীদের উৎপাতে কালোরা ছিল দিশেহারা। এদের কাছে তা ছিল মজার খেলা।
১৮৮২ থেকে ১৯৬৮ পরযন্ত সাদাদের হাতে কালো মানুষের এমন খুনের সংখ্যা ৪,৭৪৩টি। মার্টিন লুথার কিং বর্ণবাদ অবসানে শুরু করলেন সংগ্রাম। এজন্য তাঁকে ২৯ বার জেলে যেতে হয়েছে। তার লড়াইয়ের চূড়ান্ত পর্যায়ে ১৯৬৩ সালের ২৮ আগষ্ট ওয়াশিংটনের লিংকন মেমোরিয়ালে দাঁড়িয়ে মার্টিন লুথার কিং তাঁর বিখ্যাত ‘আই হ্যাভ এ ড্রিম’ বক্তৃতাটি দেন। প্রেসিডেন্ট কেনেডির অনুরোধ উপেক্ষা করে দেয়া অসাধারণ এ ভাষনে তিনি তুলে ধরেন শ্বেতাঙ্গদের বৈষম্যমূলক আচরণ এবং কৃষ্ণাঙ্গদের ওপর নির্যাতন ও বঞ্চনার কথা। তিনি বলেছিলেন, ততক্ষণ পরযন্ত আমাদের কোনো অর্জন নেই, যতক্ষণ পর্যন্ত নিগ্রোরা পুলিশের বর্ণনাতীত নির্যাতনের শিকার হবে। তিনি বলেছিলেন, আমি জানি তোমরা এখানে এসেছো দূরদূরান্ত থেকে,কেউ জেলের কুঠরি থেকে, কেউ পুলিশের টর্চার সেল থেকে। তোমরা যার যার ঘরে ফিরে যাও। কিন্তু কাদাজলে ডুব দিয়ে থেকো না। এই স্বপ্নগাথা আছে আমেরিকার অস্তিত্বে। আমি স্বপ্ন দেখি, একদিন এ জাতি জেগে উঠবে। মূল্যায়ন হবে সব মানুষ জন্মসূত্রে সমান। আড়াই লক্ষ মানুষ মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনেছিলো এ বক্তৃতা। সাদা কালো সবাই ছিলেন এ সবাবেশে।
মার্টিন লুথার কিং বলেছিলেন, আমার একটি স্বপ্ন আছে — “একদিন জর্জিয়ার লাল পাহাড়ে,সাবেক দাসের সন্তান আর সাবেক দাস মালিকের সন্তান একসঙ্গে ভ্রাতৃত্বের আসনে বসতে সক্ষম হবে।” কিন্তু লুথার কিংয়ের সেই স্বপ্ন,স্বপ্নই রয়ে গেলো। তাঁকে নির্মম মৃত্যুকেই বরণ করতে হলো। প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন তাঁর প্রথম অভিষেক ভাষনে বলেছিলেন,”আমরা শত্রুু নই, আমরা বন্ধু।” আর আমেরিকার বর্তমান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কী বলছেন দেখুন। ১৯৬০ সালে আমেরিকার পুলিশ প্রধানের দেয়া বিতর্কিত বক্তব্য ‘লুট শুরু হলে গুলি শুরু হবে’- এমন বক্তব্যও দিয়ে ফেলেছেন। বিক্ষোভ দমনে দেন সেনা ব্যবহারের হুমকি। নৈতিকভাবে ট্রাম্পের জন্য এটা দেউলিয়া হওয়া নয় কী?
করোনাভাইরাসে আমেরিকায় লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু দেখুন মৃতদের স্বজনদের সহানুভূতি জানিয়ে একটি বক্তৃতা করতেও আমরা ট্রাম্পকে দেখিনি। বরং বর্ণবাদকেই উসকে দিচ্ছেন তিনি। আমেরিকার মোট জনসংখ্যার ১৩ শতাংশ কালোরা। অথচ মোট কারাবন্দীর ৩৫ শতাংশ কালো। সাদাদের চেয়ে কালোদের গ্রেফতারের সংখ্যা পাঁচ গুণ বেশি। পুলিশের গুলিতে কালোদের মৃত্যুর ঘটনা ২১ গুণ বেশি।
সাতাশ বছর জেলে বন্দী জীবনের অবসান ঘটিয়ে নেলসন ম্যান্ডেলা ১৯৯৪ সালের ১০ মে বর্ণবাদমুক্ত দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট হন সাদা মানুষ ডি ক্লারকে ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে সাথে নিয়ে। তখন পূর্তি অনুষ্ঠানে আকাশে কালো,লাল,সবুজ,নীলসহ নানা রঙের বর্ণচছটা ছড়িয়ে জেট বিমানগুলো তাক লাগিয়ে দেয়। নেলসন রোলিহলাহলা ম্যান্ডেলা বলেন,আমরা এমন সমাজ গড়ব,যেখানে মানবিকতাই হবে মূখ্য বিষয়। কিন্তু হায়, কী নিদারুন অমানবিকতা আজ সইতে হচ্ছে আমেরিকার কালো মানুষদের! (ফেইসবুক থেকে নেয়া)।
লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক।

