করোনার ভুয়া রিপোর্ট বানাতেন জেকেজি’র হিরু, জালিয়াতির ‘বিশ্ব রেকর্ড’!
উত্তরদক্ষিণ । শুক্রবার ২৬ জুন ২০২০ । আপডেট ২০:৪০
বিশ্বের ২১৫টি দেশে করোনাভাইরাসের (কভিড-১৯) সংক্রমণ হয়েছে। সব দেশেই নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় নমুনা পরীক্ষার মাধ্যমে কোভিড-১৯ শনাক্ত করা হয়, হচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশ ছাড়া পৃথিবীর এমন কোনও দেশ নেই, যেখানে নমুন পরীক্ষা ছাড়াই ইচ্ছে মতো ভুয়া রিপোর্ট তৈরি করে দেয়া হয়েছে। এমন ভয়ানক কেলেঙ্কারিতে জড়িত হয়েছিল দেশের একটি এনজিও। এনজিওটির নাম- জোবেদা খাতুন সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার (জেকেজি) হেলথ কেয়ার। সংস্থাটির সাবেক গ্রাফিক ডিজাইনার হুমায়ুন কবীর হিরুর হাতে তৈরি হতো এসব ভুয়া সনদ। গ্রেপ্তারের পর জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশকে এ তথ্য দিয়েছে হিরু নিজেই।
হুমায়ুন ও তার স্ত্রীর জব্দ করা কম্পিউটার ও ল্যাপটপ এবং পুলিশ হেফাজতের জিজ্ঞাসাবাদ থেকে এসব তথ্য এসেছে বলে তেজগাঁও জোনের সহকারী কমিশনার মোঃ মাহমুদ খান গণমাধ্যমকে জানান। তিনি বলেন, হুমায়ুন কবীর হিরুর নিজস্ব কম্পিউটারে মিলেছে বেশ কিছু ভুয়া সনদের নমুনা।
সহকারী কমিশনার মোঃ মাহমুদ খান জানান, রাজধানীর কল্যাণপুরের একটি বাড়ির কেয়ারটেকার কামাল হোসেনের অভিযোগের প্রেক্ষিতে হুমায়ুন কবীর হিমু ও তার স্ত্রী তানজীন পাটোয়ারীকে গ্রেপ্তারের পর জেকেজি হেলথ কেয়ারের প্রধান নির্বাহী আরিফুল হক চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করা হয়।
কামালের অভিযোগ, তার বাড়ির মালিক ও স্ত্রীর জ্বর, সর্দি হওয়ায় কোভিড-১৯ পরীক্ষার জন্য অনলাইনের মাধ্যমে জেকেজির পক্ষে হুমায়ুনের সাথে যোগাযোগ করা হয়। তারা দু’জন ছাড়াও তাদের ছেলে, গাড়িচালক, গৃহপরিচারিকার নমুনা তিন দফায় বিজয় সরণি মোড়ে কলমিলতা মার্কেটের কাছ থেকে হুমায়ুনের লোক এসে নিয়ে যায়। এজন্য ৪৫ হাজার টাকা দেওয়া হয়।
পুলিশ কর্মকর্তা মাহমুদ বলেন, জেকেজির বিরুদ্ধে বিভিন্নভাবে তাদের কাছে অভিযোগ আসছিল। কামাল হোসেন লিখিত অভিযোগ করলে তা খতিয়ে দেখতে গিয়ে বড় ধরণের তথ্য পাওয়া যায়। তিনি বলেন, হুমায়ুন ও তার স্ত্রী তানজিনা জেকেজিতে চাকরি করত। তানজিনা একটি বেসরকারি ক্লিনিকের নার্স ছিল। মহামারী শুরুর পর ক্লিনিকটি বন্ধ হয়ে গেলে স্বামীর সূত্র ধরে জেকেজি হেলথ কেয়ারে যোগ দেয়। জেকেজির আইটি বিভাগে বসে নিজে ভুয়া সনদ বানানোর বিষয়টি রপ্ত করার পর স্বামী-স্ত্রী চাকরি ছেড়ে দিয়ে অনলাইনে প্রচারণা চালিয়ে নমুনা সংগ্রহ করা শুরু করে।
গত ২২ জুন রাতে হুমায়ুন ও তার স্ত্রীকে রাজধানীর বাসা থেকে গ্রেপ্তারের পর তাদের কম্পিউটার থেকে ৪৩টি সনদ পাওয়া যায়, যার মধ্যে চার জন প্রবাসীও রয়েছেন। তাদেরকে গ্রেপ্তারের পর জেকেজির বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়ায় অরিফুল চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করা হয় জানিয়ে মাহমুদ জানান, অরিফুলকে বুধবার আদালতের মাধ্যমে দু’দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়। জেকেজির নামে যে ভুয়া সনদ হতো তা স্বীকার করে নিজের দায় এড়াতে হুমায়ুনের উপর দোষ চাপিয়ে আরিফুল দাবি করেছেন, এজন্য হুমায়ুন ও তার স্ত্রীকে চাকরিচ্যুৎ করা হয়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, জেকেজি বিনামূল্যে নমুনা সংগ্রহের কাজটি করবে সরকারের কাছ থেকে এমন অনুমতি নেওয়া হলেও পরে বুকিং বিডি ও হেলথকেয়ার নামে দুটি সাইট খুলে টাকা নিয়ে নমুনা সংগ্রেহের কাজ করে এবং ভুয়া সনদ দেয়।
জেকেজির বেশ কিছু স্বাস্থ্যকর্মী তিতুমীর কলেজে অবস্থান করছিল। তারা নমুনা সংগ্রহ করতো বলে জেকেজির পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল। গত ২২ জুন রাতে এই স্বাস্থ্যকর্মীদের সঙ্গে কলেজ কর্মচারীদের সংঘর্ষ হয়। সে সময় জেকেজির পক্ষ হয়ে অন্যতম কর্ণধার আরিফুলের স্ত্রী ডা. সাবরিনা আরিফ সাংবাদিকদের সাথে কথাও বলেছিলেন।
ভুয়া সনদের অভিযোগে তার স্বামী গ্রেপ্তারের পর জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের এই চিকিৎসক বলেন, মতের মিল না হওয়ায় অনেক আগেই জেকেজি ছেড়ে দিয়েছেন তিনি। এই ঘটনার পর ২৪ জুন জেকেজি হেলথ কেয়ারের নমুনা সংগ্রহের যে অনুমোদন ছিল তা বাতিল করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
তবে পুলিশ পুরো বিষয়টি এখনও তদন্ত করছে। এর পেছনে আরও কেউ জাড়িত ছিল কিনা তাও খতিয়ে দেখছে সরকারের বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

