শিপ্রা’র ভূমিকায় অনেকে ‘হতাশ’!
মোহাম্মদ শিহাব, উত্তরদক্ষিণ । শুক্রবাবার, ১৪ আগস্ট ২০২০ । আপডেট: ১৯:৫১
পুলিশের গুলিতে নিহত অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা সিনহা মো. রাশেদ খানের সহযোগী শিপ্রা দেবনাথ ও সাহেদুল ইসলাম সিফাত দেশবাসীর আন্দোলন ও প্রতিবাদের মুখে জামিনে মুক্তি পেয়েছেন ক’দিন আগে। মুক্তির পর তারা সংবাদ সম্মেলনে ওই দিনের ঘটনা প্রসঙ্গে গণমাধ্যমের প্রশ্ন এড়িয়ে যান এবং সব কিছু জানানোর জন্য কিছুটা সময় চেয়ে ছিলেন দেশবাসীর কাছে। কিন্তু হত্যার ঘটনা ও পুলিশের ভূমিকা নিয়ে এ পর্যন্ত তারা কোনও বক্তব্য বা তথ্য না দিয়ে হঠাৎ করে শিপ্রা ‘জাস্ট গো’ নামে ইউটিউব চ্যানেল ওপেন করে ভিডিও আপলোড দেন সেই চ্যানেলে।
এর পর নিজে একটি ভিডিও বার্তায় নিহত সিনহার স্বপ্ন ‘জাস্ট গো’ উল্লেখ করে সেই স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখার ঘোষণা দেন। কিন্তু সিনহা হত্যার বিচারের দাবিতে যখন নিহতের পরিবার, সচেতন দেশবাসী সোচ্চার তখন শিপ্রার এমন আচরণ ও কর্মকাণ্ডে অনেকেই হতাশ হয়েছেন। ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন কেউ কেউ। এমনকি সোশ্যাল মিডিয়ায় পিশ্রার একান্ত মুহূর্তের বেশ কিছু ছবিও এখন ছড়িয়ে গেছে, যা নিয়ে রীতিমতো সমালোচনার ঝড় বয়ে যাচ্ছে।
অনেকেই অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা হত্যার পেছনে শিপ্রার ভূমিকা থাকতে পারে বলেও সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। এমনকি মামলার তদন্তে থাকা র্যাবের প্রতি আহ্বান জানানো হচ্ছে নিরপেক্ষ তদন্তের স্বার্থে শিপ্রাকেও হেফাজতে নেয়ার। সোশ্যাল মিডিয়ায় এমন দাবি উঠছে।
এ নিয়ে কথা বলেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের (ডাাকসু) ভিপি নুরুল হক নুর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আলোচিত শিক্ষক ড. অধ্যাপক আসিফ নজরুলসহ আরও অনেকে। অবশ্য
যারা এ নিয়ে বক্তব্য বা মতামত দিচ্ছেন- তাদের তাদের প্রায় সবাই রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি সরকার বিরোধী বলে মনে হচ্ছে। ফলে বিষয়টি নিয়ে নতুন রহস্য ও কৌতূহল সৃষ্টি হওয়ার অবকাশ রয়েছে। তবে সচেতন মহলের ধারণা, শিপ্রার এ মুহূর্তের ভূমিকা যে কাঙ্খিত নয়, সেটা বলাই যায়। এক্ষেত্রে কারণ যাই হোক না কেন।
‘শুভবুদ্ধির উদয় হোক’ শিরোনামে বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) নিজের ফেইসবুক পেজে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে ডাকসু ভিপি নুরুল হক নুর- শিপ্রা ও সিফাতকে সাহস না হারানোর এবং প্রলোভনে না পড়ার উপদেশ দেন। সিফাতের মুক্তির দাবিতে বরগুনায় মানববন্ধন ও পুলিশের হামলার ঘটনাও স্মরণ করেন ভিপি নুর। তিনি মনে করেন, সাধারণ মানুষ প্রতিবাদ না জানালে জেলেই থাকতে হতো শিপ্রা এবং সিফাতকে।
গত ৩১ জুলাই রাত ১০টার দিকে টেকনাফ উপজেলার বাহারছড়া ইউনিয়নের শামলাপুর পুলিশ চেকপোস্টে পুলিশের গুলিতে নিহত হন অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা সিনহা মো. রাশেদ খান। সে সময় তার সঙ্গী ছিলেন সিফাত। পুলিশ পরে সিফাত এবং শিপ্রার নামে অস্ত্র ও মাদকের মামলা দিয়ে তাদেরকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠায়। গত রবি ও সোমবার যথাক্রমে শিপ্রা ও সিফাত জামিনে মুক্তি পান। সোমবার (৯ আগস্ট) কক্সবাজারে এক সংবাদ সম্মেলনে শিপ্রা ও সিফাত সিনহা নিহতের ঘটনায় যা সত্য তার সবই জানাবেন বলে প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু এর পর ইউটিউব চ্যানেল খোলেন শিপ্রা।

এ প্রেক্ষিতে ভিপি নুর তার ফেইসবুকে লেখেন, ‘শুভবুদ্ধির উদয় হোক’। ‘তোমাদেরকে সেলেব্রিটি বানানোর জন্য আমরা রাজপথে নামিনি, বরগুনায় আমার ভাই-বোনেরা প্রদীপ, লিয়াকতদের উত্তরসূরীদের লাঠিপেটা খায়নি, একজন এসআই চড় খায়নি। নেমেছিলাম সত্য উদঘাটনে। আমাদের মতো প্রতিবাদী মানুষগুলো রাজপথে না নামলে তোমাদেরকে মামলার আসামি হয়েই কারাগারে থাকা লাগতো মাস, বছর, অধিকন্তু হয়রানি। ভেবেছিলাম তোমরা মুক্ত হলে আমরা সত্য উদঘাটনে যে সংগ্রামে নেমেছি সেটি সহজ হবে। কিন্তু তোমাদের ভূমিকা শুধু আমাকে, আমাদেরকে নয়, পুরো জাতিকেই হতাশ করছে।’
নুর আরও বলেন, ‘তোমাদের পাশে পুরো জাতি ছিলো, তোমরা বুঝলে না! তোমরা চাইলে জাতির কাছে সৎ-সাহসী, অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন বীর হিসেবে নিজেদেরকে তুলে ধরে সম্মানিত হতে পারতে। কিন্তু মনে হচ্ছে ওদের ভয়ে তোমরা আত্মকেন্দ্রিক হয়ে যাচ্ছো! যা আমাদেরকে সাময়িক পীড়া দিলেও পরবর্তীতে তোমাদের জন্যই বিপদের কারণ হবে। কারণ ওরা হয়তো এখন ওদের প্রয়োজনে তোমাদেরকে সত্য না বলার জন্য চাপ দিচ্ছে, পাশে থাকবে বলছে, প্রলোভন দেখাচ্ছে। কিন্তু প্রয়োজন শেষে ওরাই তোমাদেরকে বিপদে ফেলবে। তাই সময় থাকতে তোমাদের শুভবুদ্ধির উদয় হোক। কারণ, পরবর্তীতে বিপদে পড়লে কাউকে পাশে নাও পেতে পারো।’
অপরদিকে, ‘শিপ্রা দেবনাথের কান্ড’ শিরোনামে ড. আসিফ নজরুল তার ফেরিভায়েড ফেইসবুক পেইজে শুক্রবার এক পোস্টে লিখেছেন, ‘মেজর সিনহার হত্যাকান্ডের পর শিপ্রা দেবনাথের একটি ভিডিও দেখে হতভম্ব হয়ে গেছি। মনে হয়েছে অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহার হত্যার বিচার না, শিপ্রার আসল চিন্তা ইউটিউব চ্যানেলের উপর নিয়ন্ত্রন নিয়ে। মেয়েটি সেখানে যেভাবে বলল সিনহা ‘মারা গেছে’ মনে হলো যেন তাকে কেউ হত্যা করেনি, পাহাড়-টাহার থেকে দুর্ঘটনাবশত পড়ে মৃত্যুটি ঘটেছে! তার সাথে সিনহার যতো অন্তরঙ্গ সম্পর্ক থাকুক না কেন, পাবলিকলি সে যেভাবে সিনহা, সিনহা বলে তাকে উল্লেখ করেছে তা অত্যন্ত অরুচিকর লেগেছে আমার কাছে। আর এতো ঘনিষ্ঠ যদি হয় তাদের সম্পর্ক, তাহলে তার মর্মান্তিক হত্যাকান্ডের পর শিপ্রার আচার-আচরণ তো সন্দেহজনক বলতে হবে! পুরো ভিডিওটা দেখে আমি এমন বিরক্ত হয়েছি যে তা বলার মতো না। কি দূর্ভাগ্য, মেজর সিনহা এমন একটা আজব সহকর্মী রেখে গেছেন তার সম্পর্কে বলার জন্য।’
অপরদিকে, ছাত্রদলের এক কর্মী তার ফেইসবুক পেইজে শিপ্রার অন্তরঙ্গ মুহূর্তের কিছু ছবি পোস্ট করে তাকে র্যাব হেফাজতে নেয়ার দাবি তুলেছেন। একইভাবে বিএনপি-জামায়াত সমর্থিত হিসেবে পরিচিত সাংবাদিকসহ অনেকে শিপ্রার ছবি পোস্ট ও শেয়ার করে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন।
এমনকি ইউটিউবেও শিপ্রার একান্তে নৃত্যের ভিডিও ও ছবি ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে। এর পেছনে উদ্দেশ্য ও কারণ ভিন্ন হতে পারে। তবে শিপ্রা ও তাদের অভিভাবকদের এ মুহূর্তে আরও দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেয়া উচিত ছিল- এটা বলাই যায়। দেশবাসীর সঙ্গে আমিও মনে করি অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা হত্যার কারণ, এর সঙ্গে জড়িত, ইন্ধনদাতা- সব কিছুই সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে বেড়িয়ে আসবে। এক্ষেত্রে সবার আস্থার পাত্র র্যাবের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা আন্তরিকতার পরিচয় দেবেন এবং তদন্তের প্রয়োজনে যেটা সঠিক ও করণীয় মনে করবেন- তাই করবেন। যাতে দেশবাসীর মনে কোনও সন্দেহ-সংশয় না থাকে। আর তদন্তের পর সব সত্যই জাতির সামনে প্রকাশ করা হবে- সে বিশ্বাস ও প্রত্যাশা রাখতে চাই।
লেখক: সাংবাদিক।

