‘কর্মকর্তাদের পৈশাচিক নির্যাতনেই’ যশোরে উন্নয়ন কেন্দ্রে ৩ শিশু নিহত

‘কর্মকর্তাদের পৈশাচিক নির্যাতনেই’ যশোরে উন্নয়ন কেন্দ্রে ৩ শিশু নিহত

উত্তরদক্ষিণ । শনিবার, ১৫ আগস্ট ২০২০ । আপডেট: ১৮:৫০

যশোর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে সালিশের নামে কর্মকর্তারাই বন্দি কিশোরদের ওপর পৈশাচিক নির্যাতন চালিয়েছেন। একইসঙ্গে তথ্য গোপন ও বিনা চিকিৎসায় আহতদের ফেলে রাখায় তিন জনের মৃত্যু হয়েছে। নির্যাতনের মাত্রা এমন ছিল যে, অচেতন অবস্থায় জ্ঞান ফেরা মাত্রই দফায় দফায় নির্যাতন করা হয়। হত্যাকাণ্ডে কর্মকর্তাদের সহযোগিতা করেন কেন্দ্রে তাদের অনুগত ৭ কিশোর। ভয়ঙ্কর এই তথ্য পেয়েছে পুলিশ।

শনিবার (১৫ আগস্ট) দুপুরে নিজ কার্যালয়ে এক ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য প্রকাশ করেন যশোরের পুলিশ সুপার মুহাম্মদ আশরাফ হোসেন। তিনি বলেন, প্রাথমিক তদন্তে পুলিশ নিশ্চিত হয়েছে পৈশাচিক এই হত্যাকাণ্ডে কেন্দ্রের তত্ত্বাবধায়কসহ ৫ কর্মকর্তা সরাসরি জড়িত। যে কারণে শনিবার সকালে তাদের গ্রেফতার দেখিয়ে দুপুরে আদালতে সোপর্দ করা হয়। পুলিশ তাদের ৭দিনের রিমান্ড আবেদন করেছে।

আটককৃতরা হলেন- তত্ত্বাবধায়ক (সহকারী পরিচালক) আব্দুল্লাহ আল মাসুদ, সহকারী তত্ত্বাবধায়ক (প্রবেশন অফিসার) মাসুম বিল্লাহ, কারিগরি প্রশিক্ষক (ওয়েল্ডিং) মো. ওমর ফারুক, ফিজিক্যাল ইন্সট্রাক্টর একেএম শাহানুর আলম এবং সাইকোসোশ্যাল কাউন্সিলর মুশফিকুর রহমান।

শনিবার (১৫ আগস্ট) নিজ কার্যালয়ে এক ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য প্রকাশ করেন যশোরের পুলিশ সুপার মুহাম্মদ আশরাফ হোসেন

এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে পুলিশ সুপার বলেন, গত ৩ আগস্ট কেন্দ্রের হেড গার্ড নূর ইসলাম বন্দি কিশোর হৃদয়কে তার চুল কেটে দিতে বলেন। ঈদের আগে হৃদয় কেন্দ্রের প্রায় দুইশ’ শিশু-কিশোরের চুল কেটে দেয়। কিন্তু সেদিন সে হাতে ব্যথার কথা বলে চুল পরে কেটে দেওয়ার কথা জানালে হেড গার্ড বিষয়টি অতিরঞ্জিত আকারে সহকারী তত্ত্বাবধায়ক মাসুম বিল্লাহকে অবহিত করেন। ওই সময় তত্ত্বাবধায়ক আব্দুল্লাহ আল মাসুদসহ অন্য কর্মকর্তারা সেখানে ছিলেন। নূর ইসলাম তাদের জানান, হৃদয় ও অপর বন্দি পাভেল নেশা করে অসংলগ্ন অবস্থায় রয়েছে। তাদের দুজনের বিরুদ্ধে সমকামিতার অভিযোগও দেন। সে কারণে চুল কেটে দেয়নি বরং তাকে গালিগালাজও করেছে। ওই সময় সেখানে থাকা আরেক বন্দি নাঈম বিষয়টি পাভেলকে জানায়। এরপর পাভেল ও তার সহযোগীরা হেড গার্ড নূর ইসলামকে মারধর করে তার একটি হাত ভেঙে দেয়।

তিনি জানান, ঘটনারদিন ১৩ আগস্ট, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ জাতীয় শোক দিবস পালনের লক্ষ্যে একটি সভায় মিলিত হন। সভা শেষে উপস্থিত কর্মকর্তারা ৩ আগস্টের ঘটনায় সম্পৃক্তদের ‘শায়েস্তা’ করার সিদ্ধান্ত নেন। এর আগে মারধরের ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ ও সাক্ষীদের মাধ্যমে তাদের শনাক্ত করে তাদের ডরমেটরিতে ডেকে পাঠান। কেন্দ্রের কর্মকর্তারা সেখানে বন্দি তাদের অনুগত সাত কিশোরকে ব্যবহার করেন ১৮ জনকে মারধর করতে। তারা প্রত্যেক কিশোরকে ধরে জানালার গ্রিলের ভেতর দিয়ে দু’হাত ঢুকিয়ে অপরপাশে আরেকজন দিয়ে হাত ধরায়, পা বাঁধে এবং মুখে কাপড় ঢুকিয়ে লাঠি ও লোহার পাইপ দিয়ে কোমর থেকে পা পর্যন্ত ব্যাপক হারে পেটায়।

সংবাদ সম্মেলনে আরও জানানো হয়, অভিযুক্ত ৫ কর্মকর্তা ও কিশোরদের সঙ্গে কথা বলে পুলিশ জানতে পারে- কর্মকর্তারা তাদের নির্দেশ দেন অচেতন না হওয়া পর্যন্ত যেন পেটানো হয়। এর ফলে আঘাতপ্রাপ্ত কিশোররা অচেতন হয়ে পড়ে। তারপর তাদের ফেলে রাখা হয় এবং জ্ঞান ফিরলে আবারও একই কায়দায় মারধর করে ডরমেটরিতে ফেলে রাখা হয়।

যশোরের এসপি বলেন, সেদিন তাপমাত্রাও বেশি ছিল। সারাদিন কিছু খেতে না দেওয়া ও চিকিৎসা না করে ফেলে রাখা হয়। অবস্থা গুরুতর হলে একজন কম্পাউন্ডারকে ডাকা হয়। ব্যর্থ হয়ে সন্ধ্যায় মরণাপন্ন অবস্থায় নাঈম নামে এক কিশোরকে হাসপাতালে পাঠানো হয়। তবে চিকিৎসক জানান- হাসপাতালে আসার আগেই তার মৃত্যু হয়েছে।

পুলিশ প্রায় ৬ ঘণ্টা পর হাসপাতাল সূত্রেই ওই লোমহর্ষক ঘটনার খবর জানতে পারে। এরপর কেন্দ্রে গিয়ে ডরমেটরি থেকে আরও দুই কিশোরকে মৃত অবস্থায় উদ্ধার করে। একইসঙ্গে আহত ১৫ জনকে হাসপাতালে পাঠায়। কেন্দ্র কর্তৃপক্ষ এই ঘটনাটি পুলিশ, জেলা প্রশাসন বা তাদের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাউকেই জানাননি।

লেমহর্ষক ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরতে গিয়ে এসপি আরও বলেন, আমরা প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত সন্দেহে ১০ জনকে হেফাজতে নিই। পরে আরও ৯ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করি। এরপর যাচাই বাছাই করে ৫ জনের সরাসরি সম্পৃক্ততা এবং ৫ জনকে সাক্ষী হিসেবে পেয়েছি।

এদিকে, গ্রেফতার পাঁচ কর্মকর্তাকে দুপুরে যশোরের জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মাহাদি হাসানের আদালতে সোপর্দ করে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করা হয়েছে। ১৭ আগস্ট শুনানির দিন ধার্য হয়েছে বলে আসামিপক্ষের আইনজীবী সালাহউদ্দিন শরীফ শাকিল নিশ্চিত করেছেন।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা নিযুক্ত হয়েছেন ইন্সপেক্টর রকিবুজ্জামান। অধিকতর তদন্ত শেষে খুব শিগগির আমরা পুলিশি তদন্ত প্রতিবেদন উপস্থাপন করবো বলে সংবাদ সম্মেলনে জানান যশোরের এসপি।

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading