বঙ্গবন্ধু হত্যার নেপথ্যে কারা, জানতে তদন্ত ‘কমিশন গঠনের সিদ্ধান্ত’

বঙ্গবন্ধু হত্যার নেপথ্যে কারা, জানতে তদন্ত ‘কমিশন গঠনের সিদ্ধান্ত’

উত্তরদক্ষিণ । সোমবার, ২৪ আগস্ট ২০২০ । আপডেট: ২১:৫০

আইনমন্ত্রী আনিসুল হক জানিয়েছেন, বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পেছনের শক্তি এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চিহ্নিত করার জন্য সরকার একটি কমিশন গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তিনি বলেন, এই হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত সাবেক সেনা সদস্যদের বিচার হলেও এর পেছনের রাজনীতি এবং ষড়যন্ত্রের ব্যাপারে তদন্ত হয়নি। সেজন্য সরকার কমিশন গঠন করছে।

তবে এ নিয়ে বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে বলা হয়- জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যার পর রাজনৈতিক সুবিধাভোগী- বিএনপির নেতারা বলেছেন, তাদের দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানকে টার্গেট করে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এই কমিশন করা হচ্ছে কিনা-এই প্রশ্ন তাদের রয়েছে।

১৯৭৫ সালের ১৫ই অগাস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে সপরিবারে হত্যার পর ৪৫ বছর পূর্ণ হয়েছে। ঘটনার প্রায় ৩৫ বছর পর ২০১০ সালে সেই হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত সাবেক সেনা সদস্যদের মৃত্যুদন্ড হয়। আদালতের রায়ে হত্যাকাণ্ডের পেছনের রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের কথা উল্লেখ ছিল। কিন্তু বিস্তারিত উঠে আসেনি।

কয়েকবছর ধরে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য এবং পেছনের শক্তি চিহ্নিত করার দাবি করে আসছিল আওয়ামী লীগ সমর্থিত পেশাজীবী সংগঠনগুলো। হত্যাকাণ্ড নিয়ে নানা রকম রাজনৈতিক বক্তব্য এবং ষড়যন্ত্রের নানা তত্ত্ব আলোচনায় উঠে আসে। তার প্রেক্ষিতে এবার তদন্তের জন্য একটি কমিশন গঠন করতে যাচ্ছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার।

এ নিয়ে বিবিসিকে দেয়া সাক্ষাৎকারে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, ‘ইতিহাসের স্বার্থে নেপথ্যের শক্তিকে চিহ্নিত করা প্রয়োজন বলে আমরা মনে করি। কমিশন গঠনের চিন্তা ভাবনা শুধু নয়, এখন কমিশন গঠনের সিদ্ধান্ত আমরা নিয়েছি।’

এক প্রশ্নে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘কমিশন হবে এই কারণে যে, এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে কারা ছিল-সমাজে এবং রাষ্ট্রে তাদের মুখোঁশ যদি উন্মোচন করা না হয়, তাদের অনুসারীরা হয়তো ভবিষ্যতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা বিপন্ন করতে পারে এবং বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার যে স্বপ্ন আমাদেরও আছে, সেই স্বপ্নও নষ্ট করতে পারে। সেজন্য বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার বিচার জননেত্রী শেখ হাসিনা করেছেন। এর পরের অধ্যায় হচ্ছে, নেপথ্যে কারা ছিল, এই ষড়যন্ত্রের মধ্যে কারা ছিল-তাদেরকে চিহ্নিত করা। চিহ্নিত করে ইতিহাসটা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে রেখে যাওয়া। সেজন্য কমিশন গঠন করা। এটা কোনও উইচ হান্টিং না।’

হত্যাকাণ্ডের পেছনে সে সময়ের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক রাজনীতিও ছিল বলে আওয়ামী লীগ নেতারা মনে করেন। দলটির নেতারা বিভিন্ন সময় বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের তখনকার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। জাতির পিতার ৪৫তম শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে আগস্ট মাসের আলোচনায় সরকার এবং আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে সেসব প্রশ্ন সামনে এসেছে।

এর মধ্যে গত রবিবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও এক অনুষ্ঠানে জিয়াউর রহমানকে ১৯৭৫ সালে ১৫ই অগাস্ট হত্যাকাণ্ডের ‘আসল খলনায়ক’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। এ অভিযোগের বিরুদ্ধে বিএনপি নেতারাও তাদের বক্তব্য তুলে ধরে আসছেন।

বিএনপির প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রীর বক্তব্য হচ্ছে, রাজনৈতিকভাবে কাউকে টার্গেট করে সরকার এমন পদক্ষেপ নিচ্ছে না এবং কমিশন নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করবে। “যারা এই ষড়যন্ত্রে জড়িত ছিলেন, তারা ভয় পেতে পারেন। যারা জড়িত ছিলেন না, তাদের ভয় পাওয়ার কোনও কারণ নেই।”

তবে ৭৫ এর আগে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের সরকারের বিরুদ্ধে জাসদের আন্দোলন এবং ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। যদিও জাসদের একটা অংশ এখন আওয়ামী লীগের মিত্র হয়েছে। এছাড়া হত্যাকাণ্ডের পর খন্দকার মোশতাক আহমেদ আড়াই মাস ক্ষমতায় থেকে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করে বিচার বন্ধ করে রেখেছিল। সেই সরকারে আওয়ামী লীগেরও অনেকে মন্ত্রী ছিলেন। অবশ্য তাদের অনেকে পরে বলেছিলেন, বন্দুকের নলের মুখে তারা বাধ্য হয়ে তা করেছিলেন। কিন্তু আওয়ামী লীগের ভেতরেও তাদের নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রোববার এক অনুষ্ঠানে সে সময়ের দলের কিছু লোকের ভূমিকার প্রসঙ্গ টেনেছেন। তিনি বলেন, “দুর্ভাগ্য, বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার এই প্রক্রিয়াটা শুরু করার জন্য দেখা গেছে, আমাদের দলের অভ্যন্তরে নানা ধরণের খেলা শুরু হয়। কিছু লোক মুক্তিযুদ্ধ চলাকালেও দালালি করার চেষ্টা চালিয়েছিল।”

অভ্যন্তরীণ এমন সব বিষয়ের প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগের জন্য নেপথ্যের শক্তি চিহ্নিত করা চ্যালেঞ্জ কিনা- এই প্রশ্নে আইনমন্ত্রী বলেছেন, কমিশন নিরপেক্ষভাবে কাজ করবে এবং তদন্তে কোনও কিছুই বাধা হবে না।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক রওনক জাহান বিবিসিকে বলেছেন, “ষড়যন্ত্রের থিওরি যেগুলো আছে, সেগুলো নিয়ে যদি খুব সিরিয়াসলি আরও তথ্য উপাত্ত যোগাড় করা যায়, আর সেগুলো যদি জনসমক্ষে উপস্থাপন করা যায়, তাহলে আমার মনে হয়, সেটা নিশ্চয়ই ভালই হবে।” আইনমন্ত্রী জানিয়েছেন, কমিশন কীভাবে গঠন করা হবে, এর কার্যপরিধি এবং ক্ষমতা কী হবে-এসব বিষয় বিশেষজ্ঞদের সাথে আলোচনা করে তারা অল্প সময়ের মধ্যে ঠিক করবেন।

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading