কাব্যলক্ষ্মী সিরিজ ।। আল আমীন ।। সংলাপ: ১ থেকে ৩ পর্যন্ত
শিল্প-সাহিত্য । উত্তরদক্ষিণ
শুক্রবার, ২৮ আগস্ট ২০২০ । আপডেট: ০৯:৩০
সংলাপ: ১
-কাব্যলক্ষ্মী! ভালোবাসবে?
-কাকে?
-আমাকে।
-আপনি তো কবি ।
-পুরুষও বটে! রক্তমাংসে পুরুষ!…
-হা হা হা
-ভালোবাসার মতো যথেষ্ঠ মাংসপেশীও আছে; কোথাও নেই এতটুকু ঘাটতি— আর দশজনের চেয়ে! ওই যে, তোমরা যাকে হৃদয় বলে জানো, তাও আছে । তবুও কি আমি ভালোবাসার যোগ্য নই তোমার? সুধুই কি কবিতার চোখে দেখেছ আমায় লক্ষ্মী!
-হুঁ।
-শরীরটাও কিন্তু জানি…
-নির্লজ্জ!
-হুঁ, সেটাও হ’য়ে উঠবো…
-নির্লজ্জ কাব্যকার!
-হা হা হা, পুরনো কথা!
-পারেনও বটে!
-হুঁ, বিশ্বাস হ’লো তবে?
-বিশ্বাসে কী আসে যায় কাব্যকার!
-লক্ষ্মীর হাত চাই!
-বাহ! এত আব্দার?
-হুঁ, লক্ষ্মী বলে কথা।
-তবে কে হবে আপনার ঘরেরজন? আজ আমি আপনার ‘লক্ষ্মী’, কাল আবার কে না জানি হয় ‘কঙ্কাবতী’!
-‘কঙ্কাবতী’ কেন?…
-আপনি তো কবি।
-আবার সেই কথা?
-কবির সৃষ্টিরাজ্যে কার কখন কী বদান্যতা মিলে, সে কি আমি জানি?
-জানতে হবে না। ভালোবাসো…
-কেউ বাসে না বুঝি?
-তুমি কি বাসো?
-এত কবিতা কীভাবে হয়?
-জানি না।
-জেনে আসুন তবে। আমার এখন সংসারের সময়…
-আমিও সংসারী হ’তে চাই…
-হননি এখনো?
-হাত পাইনি তোমার…
-হাতে কাজ নেই।
-তবে রে?…
-কবিতা লিখুন, ওতেই সংসার করুন, জাঁহাপনা ডাকছেন আমায়; যাই আমি…
-যেতে চাইলে বাঁধতে পেলাম কই! জাঁহাপনা? কে সে? কই তার কথা আগে তো বলোনি কখনো।
-যে জন আছেনই, সত্যে ‘সত্য’ ধরে, তারে আর বলার কী বা, আর না বলার কী?…
-কে আছেন?
-শুভ রাত্রি….
সংলাপ: ২
-কেমন আছেন কবি? চিনতে পেরেছেন কি আমায়? আমি আপনার সেই কাশফুল, কাব্যলক্ষ্মী কাশফুল। যার অভিমান ভাঙাতে যেয়ে আপনি নিজেই করেছিলেন অভিমান। তারপর কত কথা…
-কথা কম বলো লক্ষ্মী! এ সব তো কেবল তোমার হেঁয়ালী!
-সে কী কবি! এখনও ভাঙেনি মান?….
-ভেঙেছে রে! মান ভেঙেছে, কবিও ভেঙেছে, ভেঙে-চুরে তোমার কবি এবার পড়েই গেছে।
-এ আবার কেমন কথা?
-প্রেমে পড়েছি লক্ষ্মী!
-ভালো খবর! কার প্রেমে পড়লেন? কোথায় বাড়ি? দেখতে কেমন? কী করে?
-তোমার প্রেমে!
-এভাবেও বলতে হয়? আমার তো মানুষ আছে?
-কে সে তোমার মানুষ হ’লো?
-কে থাকবে আবার? কাব্যকার ছাড়া আর কে থাকে বলুন কাব্যলক্ষ্মীর?
-কে সেই কাব্যকার?
-যিনি পুরুষ হয়ে আমাকে কাশফুল বানাতে পারেন, ভেজাতে পারেন আমাকে, কাঁদিয়ে মাটির তালের মত নরম বানাতে পারেন, তিনিই সেই…
-আষাঢ় কি তবে তোমার এতই পছন্দ?
-নাহ্, কেবলই আষাঢ় হওয়ার সাধ…
-কেন তবে সূর্য-সাধকের প্রেমে পড় বারবার?
-সূর্য? —সে পাথর গলাতে জানে।
-প্রেম কী পারে না তবে? আমিই তোমার সূর্যপুরুষ!
-চাঁদের সাধনা করে সূর্যে কেন পোড়াতে চান হৃদয়? আমি তো বৈশাখের মেঘ; আচমকা জমতে থাকি, ঝরি না সহজে! এ মেঘের ভাষা ‘উদাসী’ কীভাবে বুঝবে বলুন?
-আমি তোমায় সাধন করতে চাই…
-সেই এক কথা হ’লো কবি!
-তবে রে?
-এখন তবে সন্ধ্যেটাকে নামতে দিন!
-তুমি কি যাবে চলে?
-সন্ধ্যে নামলেই কি রাতের কিছু বলার থাকে আর? দিনের তো নেই আপত্তি কোনো…
-আমাকে বঞ্চিত করেই তোমার সুখ…
-‘সুখী’ হয়েছি কি কখনো?
-করতে চাই।
-আপনি জানেনই না তবে….জানতে দাও।
-জেনে আর কী লাভ! পাথর না হ’লে বুঝবেন কীভাবে?
-লক্ষ্মী!
-এখন আবার পাথর হ’তে চাইবেন না প্লীজ! পাথর হ’লে আর বাসতেও পারবেন না আমাকে ভালো…
-ঠিক ভালোবাসাই কি চাও তবে?
-চাই বৈকি! সবাই যেমন চায়… আপনার বাহানা বন্ধ করুন ।
-আমি বরং নীরব যাই!
-ওটাই অনুভব করতে দিন, আমি চিনি আপনার নিঃশ্বাস!
-কবিতা লিখবে কে?
-আপনার নিঃশ্বাসই তো আমার কবিতা, ওটাকে নতুন করে লেখার ভাষা কই আপনার! ডুবে যেতে দিন…
সংলাপ: ৩
-সর্বনাশ হ’য়ে গেল কবি! এই বুঝি ভুল করে ফেললেন! কার নাম শুনি আজ সন্ধ্যা-শয়নে, কার নামে মুখরিত চরাচর? আমি তো মুখ লুকোতেও ঢাকা পড়ে না হাসি…
-কেন লক্ষ্মী! ইমরুল কায়েসের মেয়েরা তো আমারই কবিতা!
-কিন্তু, কে এই ফাতিমা? কে, কবি? কে এই ফাতিমা উনাইজা? যার নাম করছেন আপনি বারবার!
-ওটা তো কায়েসেরই প্রেমিকার নাম!
-তা’তে আপনার যায় আসে কী?
-আমারও তো নাম চাই কারো। মাঝরাতে ভারি গলায় ডাকবার…
-লক্ষ্মী বেঁচে আছে আজও…
-ভালো তো বাসেনি, আমার তো হয়নি সে নাম, যে থাকবে সর্বদা বাম পাশে আমার!…
-তাই ব’লে জনে জনে বলে বেড়াতে হবে সব?…
-হ্যাঁ কাব্যলক্ষ্মী, হ্যাঁ! সমস্যা কোনো তোমার?
-আমি যে লজ্জা পাই!
-তবে কি… বেসেছ ভালো আমায়?
-প্রয়োজন মনে করি না জানতে দেওয়ার!
-শান্ত করো অন্তত!
-কবিতা দিন কবি…
-কথা ঘোরাও কেন? কিছু বলো, আমি যে ভুল বুঝে বে-মানুষ হ’য়ে যাই!
-পুরুষ মানুষের রাগ, বড্ড বেসামাল! আমি বেশ জল ঢালতে পারি সেই রাগে; শীতল করতে জানি ।
-তবে, আমি রাগলে যে চুপ হয়ে যাও তুমি?…
-উপভোগ!…
-অবহেলা!…
-ছিঃ! না কবি, বড় মিষ্টি লাগে আপনার রাগ, তাই…
ভালোবাসায় খাটাবো না অধিকার যদিও নষ্ট হয়ে যায় তা কখনো; তবু অনুরোধটুকু রাখবেন: নষ্ট হ’তে দিয়েন না যত ভালোলাগা আপনার ।
-তোমার জন্যই আমার এ বুকটা করেছি বৃন্দাবন…
-এত প্রেম শুধু? প্রেম প্রেম করে পাগল করে দিলেন যে মাথাটা আমার! কবিতা কি আসে না এখন আর আমায় নিয়ে?
-এত বড় অপবাদ?
-কী ঢুকেছে মাথায়? সত্যি করে বলুন তো! নাম? নাকি শরীর?
-পুরো জিহ্বাশ্বাস, চক্ষুছায়া, চর্মঘাম, কর্পুর জল-আস্বাদ, কৌশিক-সৌরভ, লবঙ্গ-সুষম ছোঁয়া, মেঘাশ্রয়ী নরম অস্তরণ, আভরণ-শিঞ্জিণী, সব…
-সাধেই কি আর নির্লজ্জ বলি!
-ঠিক কী চাও তুমি?
-আমাকে নিয়ে লিখুন…
-লেখিনি কি কখনো?
-খোঁটা ধরলে হবে?
-এ কোন কঠিন শপথে বেঁধে দিলে গো আমারে, লক্ষ্মী! তোমারে ছাড়া আর কারে ভাববো? তুমিই তো বড় কঠিন শপথ! এ সত্য আমি পারি না করতে অস্বীকার! আমি সুধু উজাড়— ভালোবাসে তোমারে। তুমি নিজেরে কেন অমন গুটিয়ে রাখো? যত মিশে যেতে চাই তোমাতে, ততই মুচড়ে কেন অন্যভুবনের মায়ায় টেনে নিয়ে যাও! ওগো, আমি স্বপ্নচারী নই সুধু তোমারে নিয়ে, এ সুধু কবিতা নও তুমি আমার, জ্বলন্ত অগ্নি-শলাকার মত প্রেম জ্বালা তুমি এ বুকের শিরায়, তুমিই তরল-শীতল স্রোত! তোমারই একচ্ছত্র অধিকার আমার মগ্নতায়…

