প্রসেনজিৎ রায়-এর “সমাজ”, “কেদারা” এবং “নিজেদের বাড়ি”
শিল্প-সাহিত্য । উত্তরদক্ষিণ
শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২০ । আপডেট ১১:৫৭
১. সমাজ
গাছটা বিক্রি হয়ে গেছে;
দড়ি;
শাবল;
কুঠার;
দা;
পাতাবাহী ডালগুলো চুমু খাচ্ছে মাটির চিবুক।
শালিকটি উড়ে গেছে;
দোয়েলেরও ভেঙে গেছে ঘর;
ভাঙা দুটো ডিম নিয়ে দুটো কাক উড়ে গেছে ছানাদের কাছে,
আজকে ভোরের মেনু ওঁদের সুখের শিখা- স্বপ্নের স্বর।
গাছটা বিক্রি হয়ে গেছে।
কেটে নিচ্ছে,
অক্সিজেন কমে যাচ্ছে
শালিকের বাসাটাকে নেড়ে দেখছে কুকুরের ঠোঁট,
ছায়ার ঘাসগুলো পুড়ে যাচ্ছে রোদে;
একটা পথিক,
একগাল হাসি দিয়ে পান চুনের প্রেমে রঙের উৎসবে ঢেকে রাখে মুখ।
২. কেদারা
ছেঁড়া শার্টটা শুকাতে দিয়েছি;
সেলাইয়ের মোটা দাগগুলোকে সুখাদ্য পোকা ভেবে ভুল করে ঠোঁট বসিয়েছে আনাড়ি দোয়েল;
একটি ভাঙা কবর দু’হাতে ঝাপটে ধরে পিছু ফিরে গেলাম;
শৈশবে।
আমার আট;
বাবার পোকা চাষের গল্পটা শেখা হয়নি তখনও।
দুয়ার আগলে আমার সন্তানও দাঁড়িয়েছে পৃথিবীর মত;
হাওয়াই বেলুন আর উড়ুক্কু বিমানের হাতে আমিও লুকিয়ে ফেলি সোনামুখি সুঁই-সূতোর গাড়ির প্রেম।
সময়ের হৃদপিণ্ড চিঁড়ে ফিক করে হেসে ওঠে কর্মক্লান্ত চিবুক;
স্পষ্ট; বাবার মত! শুধু ডেকে ওঠা হয় না।
৩. নিজেদের বাড়ি
“নিজেদের বাড়ি” শীর্ষক একটি প্রতিযোগিতার আঙিনায় পথ ভুলে দর্শনার্থীর মত ঢুকে পড়েছি;
যেদিকে তাকাই, বাহারি ছবির পসরা;
একতলা, দোতলায়, এমনকি দশতলা থেকে শুরু করে প্রদর্শিত হচ্ছে সম্ভ্রান্ত সেগুন কাঠের ঘরও;
কারো কারো তো সিঁড়িতেই থাকা যাবে আস্ত একটি ছোট পরিবার!
কারো বাড়ির রাস্তা জোড়া ছায়া দীঘল পাতাবাহারের ছাদ;
কারো নয়নাভিরাম পুকুর, কারো মোজাইক পুল;
কারো সুবিশাল উঠোন, কারো বিস্তর কোর্ট—
দম্ভের এ লড়াইয়ে কেউ কারো কম নয়!
জিততে হবেই! জিতে তো যাবেই কেউ!
কী অদ্ভুত সুন্দর- আমি কাকে রেখে কাকে দেখি!
একগাল হাসি নিয়ে ছবির চিবুক ধরে আঙুলের কলম টেনে একে একে ছুঁয়ে গেলাম সবক’টা ঘর।
পাঁচশো সাতষট্টি আসতেই ক্ষিপ্র হায়নার মত ঘাড়ের উপর থাবা এলো;
থাবার হাতের মুঠির বাধ্য সন্তানের মত গেট টপকে চলে যাবার আগে আঁড়চোখে ঘরগুলো দেখতে দেখতে এলাম।
আজ একটি বাৎসরিক খুশির দিন।
সামনে পা ফেলতে ফেলতে একগাল প্রফুল্ল হাসি নিয়ে অপেক্ষা করছি; রাতের।
আজ খুব ঘুম ভালো হবে।
একটি পা খোঁড়া কুকুরকে কোলে নিয়ে ভাঙা ল্যাম্পপোস্টের নিচে চোখ বন্ধ করে এক একটা ঘর খুলে ঢুকে যাবো, নরম বিছানা পাতা; গা এলিয়ে দেবো।
ক্রয়কৃত স্বপ্নের চেয়ে এই শহরের ওজন বড্ড হালকাই বটে!
তাই,
এই রোজকার ইটের বালিশ, গাড়ির হর্ণ, আর ফুটপাতের শরীর আমাকে কোথাও আটকে দিবে না আজ!

