‘মাফিয়াদের গুলির মুখে চোখে ভাসছিল শুধু মা-বাবার মুখ’

‘মাফিয়াদের গুলির মুখে চোখে ভাসছিল শুধু মা-বাবার মুখ’

উত্তরদক্ষিণ | সোমবার, ০৫ অক্টোবর, ২০২০ | আপডেট: ১২:৫৫

লিবিয়ার মাফিয়ারা মেশিনগান থেকে গুলি করলে আমরা কয়েকজন মৃত্যুর ভান করে পড়ে থাকি। তখন শুধু দেশে থাকা মা-বাবার মুখই মনে পড়ছিল। এভাবেই ভাল উপার্জনের আশায় বিদেশ বিভুঁইয়ে গিয়ে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণের রুদ্ধশ্বাস অভিজ্ঞতার কথা শোনালেন মানবপাচারের শিকার লিবিয়াফেরত চুয়াডাঙ্গার বাসিন্দা বকুল মিয়া।

লিবিয়ার ত্রিপলি থেকে ১৮০ কিলোমিটার দক্ষিণের শহর মিজদাহতে গত ২৮ মে যে ২৬ বাংলাদেশি গুলিতে নিহত হন, সে ঘটনায় বেঁচে যান বকুল মিয়ার মতো ১২ জন। তাদের নয় জনকে দেশে ফিরিয়ে এনেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।

গতকাল রবিবার (৪ অক্টোবর) সিআইডির কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তাদের সাংবাদিকদের সামনে হাজির করা হয়। এরা হলেন- ফিরোজ বেপারী, জানু মিয়া, ওমর শেখ, সজল মিয়া, তারিকুল ইসলাম, বকুল হোসেন, মোহাম্মদ আলী, সোহাগ আহমেদ ও সাইদুল ইসলাম।

সিআইডির অর্গানাইজড ক্রাইমের ডিআইজি আবদুল্লাহেল বাকী সাংবাদিকদের বলেন, ৩০ সেপ্টেম্বর তারা দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। বিদেশে অবস্থানরত দালাল ও অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারের জন্য ইন্টারপোলের সাহায্য নেওয়া হবে।

২৬ বাংলাদেশি নিহত হওয়ার পর বিভিন্ন ঘটনায় বেশ কিছু মানবপাচারকারীকে গ্রেপ্তার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এরই মধ্যে ২৬টি মামলা হয়েছে, যার ১৫টির তদন্ত করছে সিআইডি। কয়েকজন আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছে।

সিআইডি কর্মকর্তা জানান, ফিরে আসা ব্যাক্তিদের মুখ থেকে মানবপাচারকারীদের কর্মকাণ্ড নিয়ে বিশদ বর্ণনা পাওয়া যায়। এই মানবপাচারকারীদের আইনের আওতায় আনার চেষ্টা অব্যাহত আছে।

গত বছর অগাস্টে দালালের মাধ্যমে দেশ ছাড়েন বকুল মিয়া। পেপসিকোলা কোম্পানিতে চাকরি দেওয়ার নাম করে লিবিয়ায় নিয়ে দালালদের হাতে তুলে দেওয়া হয় তাদের ৩৮ জনকে। দুবাই, মিশর হয়ে তারা লিবিয়ায় পৌঁছার পর সেখানকার একটি চক্রের হাতে পড়ে যান।

বকুল মিয়া বলেন, পেপসিকোলা কোম্পানিতে কাজ দেওয়ার নাম করে তাদের বাড়ি নির্মাণ শ্রমিক হিসাবে অত্যন্ত কম বেতনে কাজ করার সুযোগ দেওয়া হয়। “আমার কাজ ছিল ২০ কেজি ওজনের এক একটি ইট বহন করে মিস্ত্রির কাছে নিয়ে যাওয়া।”

অন্য এক শহরে বেশি বেতনের কাজ পাইয়ে দেওয়ার জন্য এক দালাল তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে। সেখানে যাওয়ার পর তারা মাফিয়াচক্রের খপ্পড়ে পড়েন। বকুল বলেন, “আমাদের একটি ঘরে বন্দি করে রাখে এবং ম্যাসেঞ্জার, ইমো, ওয়াটসঅ্যাপ আছে কি না জানতে চায়। যাদের নাই তদের উপর নেমে আসে অমানবিক নির্যাতন। হাতে সব সময় হ্যান্ডকাফ পরিয়ে রাখা হত।

“সেখানে বাংলাদেশি ছাড়াও সুদান, অফ্রিকা, নাইজেরিয়ার লোকজনকেও জিম্মি অবস্থায় দেখা যায়। জিম্মি প্রত্যেকের কাছে ১২ হাজার ডলার দাবি করে তারা ম্যাসেঞ্জার, ইমো ও হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে স্বজনের কাছে তাদের নির্যাতনের চিত্র পাঠায়।”

২৬ বাংলাদেশি নিহত হওয়ার ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে বকুল বলেন, হঠাৎ করে অপর একটি ‘মাফিয়াচক্র’ আমাদের উপর এলোপাতাড়ি গুলি চালায়। তখন আমরা কয়েকজন মৃত্যুর ভান করে মাটিতে পড়ে থাকি। তখন দেশে থাকা মা-বাবার মুখই মনে পড়ছিল শুধু।

“অনেক পরে আরেকটি গ্রুপ এসে পানি এবং বালি ছিটিয়ে দেখে কে কে বেঁচে আছেন। যারা বেঁচে আছেন তাদের টেনে হিঁচড়ে গাড়িতে তুলে একটি হাসপাতালে নিয়ে যায়। কিন্তু সেখানে কোনো চিকিৎসা দেয় না। আবার গাড়িতে তুলে বেশ কিছু দূর ময়লার স্তুপের কাছে ফেলে রেখে যায়।”

সেখানে তারা ১২ বাংলাদেশি ছিলেন জানিয়ে বকুল বলেন, তাদের কেউ কেউ গুলিবিদ্ধ, কারো পেটের ভুড়ি বের হয়ে গেছে। তারা সেখান থেকে প্রায় দুই কিলেমিটার হেটে একটি বাজারের কাছে যান। সেখানে যাওয়ার পর এক সেনা কর্মকর্তার নজরে আসে। তিনি বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ করে গাড়ি এনে তাদের উদ্ধার করে ত্রিপলির নিয়ে একটি হাসপাতালে ভর্তি করান।

সেই হাসপাতালও চিকিৎসা দিতে অস্বীকার করার পর ওই সেনা কর্মকর্তার সহায়তায় তারা বাংলাদেশ দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। বকুল মিয়া বলেন, “এরপরেই আমাদের দূতাবাসের পক্ষ থেকে চিকিৎসাসহ প্রযোজনীয় সব ধরণের ব্যবস্থা নেওয়া হয়।”

বকুল মিয়া শুধু নয় ফিরে আসা অন্যদেরও অভিন্ন কথা ছিল। তাদের সবার আকুতি, মানবপাচারকারীদের যেন শাস্তি হয়। তারা বিদেশে যেতে তারা যে ঋণ করেছেন সেটার ব্যাপারে সরকার যেন সুনজর দেয়।

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading