ট্রাম্পের হাতে আমেরিকার গণতন্ত্রের নাভিশ্বাস
শব্দনীল | উত্তরদক্ষিণ
মুদ্রিত সংস্করণ: মঙ্গলবার, ২৪ | নভেম্বর, ২০২০ | আপডেট: ০০:০০
আমেরিকার নির্বাচন ২০২০ অনুষ্ঠিত হওয়ার পরবর্তি সময়ে ফলাফল নিয়ে অনেক জল ঘোলা করছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এই জল ঘোলার পেছনে তিনি জালিয়াতির অভিযোগ তুলেছেন। যাদিও অনেকের মতো এই অভিযোগ ধোপে টেকার না। তবুও ডোনাল্ড ট্রাম্প একরোখা হয়ে গিয়েছেন আদালতে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আইনজীবী দাবি করছেন, তাদের কাছে এত প্রমাণ আছে, যা একত্র করাই তাদের পক্ষে কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের কাছে নির্বাচন জালিয়াতির অনেক তথ্যপ্রমাণ।
আইনজীবী সিন্ডি পাওয়েল ২১ নভেম্বর রাতে নিউজম্যাক্স টিভিকে বলেন, ভোট জালিয়াতি ও কারচুপির ঠাসা প্রমাণ নিয়ে শিগগিরই তারা সুপ্রিম কোর্টে উপস্থিত হচ্ছেন। এ সপ্তাহের মধ্যেই সব একসঙ্গে করা সম্ভব হবে। জর্জিয়া রাজ্যের নির্বাচনে ভোটার মেশিন দিয়ে কারচুপি থেকে শুরু করে অর্থের লেনদেনের বিস্ময়কর প্রমাণ তারা আদালতে হাজির করবেন।
যদিও নির্বাচনের উত্তাল সময়ে পেনসিলভানিয়া রাজ্যের আদালতে হেরে যান ট্রাম্প। হেড়ে যাওয়ার পর এক টুইট তিনি বলেন, তিনি আপিল করবেন। নির্বাচনে নিজের জয় ঘোষণা করে এখনো অনড় অবস্থানে আছি।’ এর মধ্যেও একের পর এক রিপাবলিকান নেতা এবং ঘনিষ্টজন পরাজয় মেনে নেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন তাকে।
পেনসিলভানিয়ার রিপাবলিকান সিনেটর প্যাট টমি নির্বাচনের ফলাফল মেনে নিতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ট্রাম্প ইতিমধ্যে সব আইনি বিকল্প দেখে নিয়েছেন। সিনেটর টমি এখানেই থেমে থাকেননি। তিনি ডেমোক্র্যাট জো বাইডেন ও কমলা হ্যারিসকে অভিনন্দনও জানিয়েছেন।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এরই মধ্যে এক টুইট বার্তায় বলেন, ‘পেনসিলভানিয়া রাজ্যের বিচারক তার আইনজীবীদের নির্বাচনে কারচুপির তথ্য উপস্থাপনেরও সুযোগ দেননি। সিনেটর প্যাট টমি তার বন্ধু নন।’
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নির্বাচনে হেরে গেছেন এমন কথা তার সমর্থকেরা মানছে না। রিপাবলিকান দলের অধিকাংশ সমর্থক ট্রাম্পের জালিয়াতির অভিযোগ বিশ্বাস করে। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে ট্রাম্প বন্ধুর পথে হাঁটছেন। অবশ্য তার নতুন করে হারানোর কিছু নেই।
কয়েকটি রাজ্যের ভোট সার্টিফিকেশন বন্ধের ওপর আইনগত হস্তাক্ষেপ চেয়ে রাজ্যের আদালতে ট্রাম্প হেরে গেছেন। নতুন করে জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যে ভোট গণনার আবেদন জানানো হয়েছে ট্রাম্প শিবির থেকে। জর্জিয়া, মিশিগান ও পেনসিলভানিয়ার ভোট সার্টিফিকেশন নিয়ে বিরোধ উপস্থাপন করে তিনি সার্কিট কোর্টে যাওয়ার চেষ্টা করছেন।
আমেরিকার আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এখন পর্যন্ত ট্রাম্প শিবির থেকে ভোট পাল্টে দেওয়ার মতো কোন প্রমাণ উপস্থাপন করা সম্ভব হয়নি। তবুও ১৪ ডিসেম্বরের আগে সুপ্রিম কোর্টে গিয়ে ভোটের সার্টিফিকেশনের বিরুদ্ধে রায় পাবেন এমন আশায় এখন ট্রাম্প সমর্থকেরা। এমন রায় পাওয়া সম্ভব হলে রাজ্যের আইন সভা ইলেকটোরাল ভোট কোন প্রার্থীর পক্ষে যাবে, তা নির্ধারণ করতে পারবে।
আইনি পদক্ষেপ হিসেবে এই সম্ভাবনার কথা বলা হলেও যুক্তরাষ্ট্রের কোনো মহলই মনে করেন না, সুপ্রিমকোর্ট এমন কোন সিদ্ধান্ত দিয়ে দেবেন। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এমন কখনো ঘটেনি। যদিও সাংবিধানিকভাবে শপথ নেওয়া মার্কিন সুপ্রিমকোর্টের বিচারকদের মধ্যে এখন রক্ষণশীলদের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে।
অন্যদিকে পরাজয় না মানা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রাজ্যগুলোর ভোট ‘সার্টিফিকেশন’ আগামী ৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত আটকে রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এভাবে নানা উপায়ে দ্বিতীয় দফা ক্ষমতায় থাকার শেষ চেষ্টা করছেন তিনি। ২২ নভেম্বর সিএনএন এ নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সংবাদ বিশ্লেষক লি বø্যাংক তার ‘নির্বাচন এখনো শেষ হয়ে যায়নি’ শিরোনামে এ নিয়ে ব্যাখ্যা দিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ইলেকটোরাল ভোটের ‘সার্টিফিকেশন’ নিয়ে এর আগে কখনো এমন আলোচনা হয়নি।
ফেডারেল আইন অনুযায়ী ‘নিরাপদ সময়কালে’ ৮ ডিসেম্বরের মধ্যে রাজ্যগুলো ভোট ‘সার্টিফাই’ করে কোন প্রার্থী কত ইলেকটোরাল ভোট পেয়েছেন তা জানানোর কথা আছে। ৮ ডিসেম্বরের মধ্যে কোনো রাজ্য ‘সার্টিফাই’ সম্পন্ন করতে ব্যর্থ হলে, কংগ্রেস তখন নির্বাচনের ফলের বিরোধ নিয়ে সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে। যদি অধিকাংশ রাজ্য ৮ ডিসেম্বরের মধ্যে ভোট ‘সার্টিফাই’ করে ফেলে এবং ইলেকটোরাল ভোটের নম্বর ডেমোক্র্যাট প্রার্থীর পক্ষে ২৭০ হয়ে গেলে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে থমকে দাঁড়াতে হবে। এজন্য ট্রাম্প শিবির থেকে বেশ কিছু রাজ্যের ভোটের ‘সার্টিফিকেশন’ বিলম্ব করার সব ধরনের চেষ্টা চলছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে কারচুপি নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতের বিরোধিতা করায় শীর্ষ একজন নির্বাচনী কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করেছেন। এই বিষয়ে তিনি বলেন, নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে ‘অত্যন্ত ভুল’ মন্তব্য করার জন্য সাইবার সিকিউরিটি এবং ইনফ্রাসট্রাকচার সিকিউরিটি এজেন্সি (সিসা) প্রধান ক্রিস ক্রেবসকে বরখাস্ত করেছেন।’
যদিও বরখাস্ত হওয়ার কিছুক্ষণ পরেই ক্রেবস এক টুইটে নিজের পক্ষে নিয়ে ট্রাম্পের অভিযোগ খন্ডন করেছেন। তিনি বলেন, ‘যেখানে ট্রাম্প দাবি করেছেন অনেকগুলো রাজ্যে তার ভোট জো বাইডেনের নামে পাল্টে দিয়েছে। নির্বাচনের এই জালিয়াতির অভিযোগ টিক না। কারণ, ৫৯ জন নির্বাচনী নিরাপত্তা কর্মকর্তারা একমত হয়েছেন আমাদের জানা মতে জালিয়াতির কোন ঘটনা বা অভিযোগ আসেনি এবং এই অভিযোগের ভিত্তি নেই এবং প্রযুক্তিগতভাবেও সেটা সম্ভব নয়।”
যুক্তরাষ্ট্রের আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এখন পর্যন্ত ট্রাম্প শিবির ভোট পাল্টে দেওয়ার মতো কোন প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেনি। ওদিকে ১৪ ডিসেম্বরের আগে সুপ্রিম কোর্টে গিয়ে ভোটের সার্টিফিকেশনের বিরুদ্ধে রায় পাবেন এমন আশায় এখন ট্রাম্প সমর্থকেরা করছেন। এমন রায় পাওয়া সম্ভব হলে রাজ্যের আইন সভা ইলেকটোরাল ভোট কোন প্রার্থীর পক্ষে যাবে, তা নির্ধারণ করবে। তবে আইনি পদক্ষেপ হিসেবে এই সম্ভাবনার কথা থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রের কোনো মহলই মনে করেন না সুপ্রিম কোর্ট এমন কোন সিদ্ধান্ত নিবেন।

