ইন্ডিয়ার গেরুয়া রাজনীতি: ‘লাভ জিহাদে’র নামে উগ্র ধর্মীয় বিভাজন
শব্দনীল | উত্তরদক্ষিণ
মুদ্রিত সংস্করণ: রবিবার, ০৬ ডিসেম্বর, ২০২০ | আপডেট: ০০:০১
সম্প্রতি ইন্ডিয়ার উত্তর প্রদেশে একজন হিন্দু নারীকে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত করার অভিযোগে পুলিশ একজন মুসলিম পুরুষকে গ্রেপ্তার করে। ‘লাভ-জিহাদ’ নামক আইনে ব্যক্তিটি গ্রেপ্তার হয়েছে। বিয়ের মাধ্যমে হিন্দু মেয়েকে ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত করার চেষ্টার অভিযোগে এই পুরুষটি গ্রেপ্তার হয়। চলতি বছরের নভেম্বরে ‘বলপূর্বক’ বা ‘জালিয়াতি’ করে ধর্মান্তরিত করা বন্ধ করার জন্য ইন্ডিয়ার প্রথম রাজ্য হিসেবে উত্তর প্রদেশ এই আইন পাস করে। যার অন্য নাম ‘লাভ-জিহাদ’। যদিও অনেকের মতে ‘লাভ-জিহাদ’ একটি অলীক-কল্পনা ও নির্বাচন-কালীন আবিষ্কার। এমনকি এটি ধর্মীয়ঘৃণা ও ভুল ধর্মীয় তথ্য ছড়ানোর একটি অভিযান।
‘লাভ-জিহাদ’ ইন্ডিয়ার সাধারণ জনগণের প্রথম নজরে আসে প্রথম ২০০৯ সালে যখন কর্ণাটক ও কেরালায় ব্যাপক হারে ধর্মান্তর ঘটে, ধীরে ধীরে এটি ইন্ডিয়ার বাইরে পাকিস্তান ও যুক্তরাজ্যে ছড়িয়ে পড়ে। ইন্ডিয়ার উত্তর প্রদেশের ডিজিপি জ্যাকব পুন্নজ নভেম্বর ২০০৯ সালে ‘লাভ-জিহাদ’ এর একটি ধারণা দিতে গিয়ে বলেন, ‘এমন কোন দল নেই যারা ধর্মান্তরের জন্য মেয়েদের প্রেমের ধোঁকা দেয়। তিনি কেরালা হাই কোর্টকে জানান তার কাছে আসা ১৮টি ঘটনার ৩টিই সন্দেহযুক্ত। শক্ত প্রমাণ না থাকলেও তদন্ত তখনও চলছিল।’ ডিসেম্বর ২০০৯ সালে, বিচারপতি কে.টি. সঙ্করণ পুন্নজের কথা মানতে নারাজ ছিলেন, তিনি একটি ঘটনার ডাইরি থেকে নিষ্পত্তি করেন এই বিষয়ে কিছু শক্ত তথ্য রয়েছে বলে। তিনি বলেন একটা বিষয়টি পরিষ্কার, পুলিশের রিপোর্ট থেকে পাওয়া যায় মহিলাদের ধর্মান্তরের জন্য কিছু সংযুক্ত দল রয়েছে। প্রেম জিহাদে অভিযুক্ত দু’জনের মামলা চলার সময় জানানো হয় ২০০৯, ২০১০, ২০১১ ও ২০১৪ সালে ৩০০০-৪০০০ ধর্মান্তর ঘটেছে। ডিসেম্বর ২০০৯ সালে কেরালা হাইকোর্ট দু’জন অভিযুক্তকে মুক্তি দিয়ে উক্ত অনুসন্ধান চালিয়ে যেতে থাকে যদিও এতে পুলিশের অনুসন্ধান সমালোচিত হয়। সেই সময় কেরালা হাইকোর্টে বিচারপতি এম. শশীধরন নম্বিয়া দ্বারা ‘লাভ-জিহাদ’ অনুসন্ধানের কাজ বন্ধ হয়ে যায়। কারণ হিসেবে উঠে আসে সে ময়ের উত্তর প্রদেশের ডিজিপি জ্যাকব পুন্নজের মতামতের উপর ভিত্তি করে ‘প্রেম জিহাদ’ এর কোন অকাট্য প্রমাণ না পাওয়ার জন্য অনুসন্ধানের কাজ বন্ধ হয়ে যায়।
প্রসার ও ইতিহাস:
২০০৯ থেকে ২০১৪ সালে ব্যাপক প্রচারণার জন্য প্রেম জিহাদ বিভিন্ন হিন্দু, শিখ ও খ্রিস্টান সংস্থার মাঝে উদ্বেগের সৃষ্টি করে যদিও মুসলিম সংস্থা অভিযোগটিকে অস্বীকার করে। রয়টার্সে ভাষ্যমতে, বিষয়টি অনেকের কাছে একটি সামাজিক উদ্বেগের কারণ হিসেবে বিবেচিত হলেও ইন্ডিয়ান প্রধানদের মতে এটি একটি ষড়যন্ত্রমূলক ঘটনা ছাড়া আর কিছু নয়। আগস্ট ২০১৭-তে, এনআইএ (ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি) জানায় তারা প্রেম জিহাদ সম্পর্কে মামলাগুলোতে কিছু সাধারণ প্রমাণ পেয়েছে। দ্য ইকোনমিস্টের পরবর্তী একটি নিবন্ধে জানানো হয়, পুলিশ বারবার অনুসন্ধান করেও ধর্মান্তর করার কোন প্রমাণ পেতে ব্যার্থ হয়েছে। ‘প্রেম জিহাদের’ দাবীকে সংবাদদাতারা বারবার উচ্চ পর্যায়ের অলীক কল্পনা এবং নিকৃষ্টতম বলে অভিহিত করছেন, এবং নির্বাচনকালীন উদ্ভাবন বলছেন। ইন্ডিয়ার সরকার সেদেশে তিন তালাক নিষিদ্ধ করেছে, যাতে হিন্দু পুরুষরা এটির অপব্যবহার না করতে পারে। দ্রুত বিচ্ছেদ-অনেক সময় দেখা যায় হিন্দু পুরুষরা প্রেম জিহাদের জন্য এটিকে ব্যবহার করে।
২০১৭ সালে, কেরালা হাইকোর্ট প্রেম জিহাদ বন্ধে আইন করে বলে, হিন্দু মেয়েদের মুসলিম ছেলেদের বিয়ে করা অবৈধ। একজন মুসলিম স্বামী এটি পুনর্বিবেচনার জন্য ভারতের সর্বোচ্চ আদালতে আবেদন করেন যেখানে কোর্ট এনআইএ এর কাছ থেকে নিরপেক্ষ প্রমাণ চায় এবং এনআইকে প্রেম জিহাদ সম্পর্কিত সকল ঘটনা অনুসন্ধানের নির্দেশ দেয়। এটা এনআইএ কে বিভিন্ন সন্দেহজনক ঘটনা অনুসন্ধান করার সুযোগ দেয়যার মাধ্যমে তারা খোঁজ করতে পারে কোন নিষিদ্ধ সংস্থা যেমন সিমি হিন্দু মেয়েদের সন্ত্রাসী হিসেবে তৈরি করছে কিনা। এনআইএ পূর্বে আদালতকে জানায় এই মামলা শুধুমাত্র একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, রাজ্যের এধরনের বহু ঘটনা ঘটছে। আরো বলে, সেই মামলার একই ব্যক্তি যে প্ররোচক হিসেবে কাজ করে। তার বিরুদ্ধে এর আগে আরও মামলা হয়েছে।
ধর্মীয় ঐতিহাসিক ঘটনা
দ্য অক্সফোর্ড হ্যান্ডবুক অফ রিলিজিয়াস কনভার্সন গ্রন্থে উল্লেখ আছে মানুষের এক বিশ্বাস থেকে অন্য বিশ্বাসে রূপান্তরের জন্য আবেগের ব্যবহার খুবই জনপ্রিয় এবং মাঝে মাঝেই ধর্মীয় নেতাদের দ্বারা ব্যবহৃত করে। অধিক সংখ্যক মানুষকে আকৃষ্ট করার জন্য ধর্মীয়দলগুলোর কিছু পদ্ধতির আশ্রয়নেয়। তার মধ্যে লাভ বোম্বিং, ফ্লার্টি ফিশিং অন্যতম। ‘প্রেম জিহাদ’ এমন এক কাজ যেখানে মুসলিম যুবকরা আবেগ ও চাকচিক্যের সাহায্যে প্রেমের ধোঁকার মাধ্যমে মেয়েদের ধর্মান্তর করে থাকে– অনেক সময় এগুলো বিভিন্ন সংস্থার দ্বারা বা অর্থ দিয়েও করানো হয়। শিকাগো ট্রিবিউন, ফোরেইন পলিসি সাংবাদিক সিদ্ধার্থ মহন্ত এক প্রতিবেদন করেন, যেখানে তিনি বর্তমান প্রেম জিহাদের মূল ভিত্তি সুচিত হয় ১৯৪৭ সালের ভারত বিভাগের ঘটনায় পর থেকে উল্লেখ করেন। দু’টি দেশের সৃষ্টি ও দেশে বিভিন্ন ধর্মে মানুষ থাকার কারণে বৃহৎ আকারে দেশান্তরতা দেখা দেয় সে সময়ে। যেখানে লাখ লাখ মানুষ এক দেশ থেকে অন্য দেশে গমন করে ও উভয়ধর্মে নারীরা পুরুষদের দ্বারা জোরপূর্বক ধর্মান্তরতার স্বীকার হয়। ১৯৮৭ এ উভয়দেশের নারীরা এই ঘটনায় আক্রান্ত হয়, পাকিস্তানী ও ভারতীয় সরকার পুনরুদ্ধার অপারেশন করে ১৯৪৭-১৯৫৬ সালের মধ্যে ২০০০০ মুসলিম এবং ৯০০০ অমুসলিম নারীকে জোরপূর্বক ধর্মান্তরতা থেকে উদ্ধার করে।
জনসাধারণের প্রতিক্রিয়া:
২০০৯ সালে এই হৃদয়বিদারক বিষয়টির জন্য বিভিন্ন সংগঠন একত্রিত হয়। খ্রিষ্টান দলগুলো যেমন ক্রিসচিয়ান এসোসিয়েশন ফর সোশিয়াল একশন এবং বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (ভিএইচপি) ‘প্রেম জেহাদ’ বন্ধের জন্য বিরোধিতা করে। অন্যদিকে ভিএইচপি একটি হিন্দু হেল্পলাইন তৈরি করে যেটি ৩মাসে প্রেম জিহাদ সম্পর্কে ১৫০০ কলের উত্তর দেয়। দ্য ইউনিয়ন অফ ক্যাথলিক এশিয়ান নিউজ (ইউসিএএন) প্রতিবেদনে জানায়যে ক্যাথলিক চার্চ এই ঘটনার জন্য উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। কেরালা ক্যাথলিক বিশপস কাউন্সিল (কেসিবিসি) ক্যাথলিক স¤প্রদায়কে এই বিষয়ে সতর্ক করে। সেপ্টেম্বরে, কেরালার তিরুবনš Íপুরমে শ্রী রাম সেনা নামে একটি দল প্রেম জিহাদ সম্পর্কে একটি পোস্টার প্রকাশ করে। ডিসেম্বরে দলটি ঘোষণা করে, তারা দেশব্যাপী প্রেম জিহাদ সম্পর্কিত একটি প্রচরণা চালাবে যার নাম সেভ আউর ডটারস, সেভ ইন্ডিয়া।
যদিও কেরালার মুসলিম সংগঠন এটিকে আক্রোশপূর্ণ ও ভুল তথ্য সংবলিত প্রচারণা বলে অভিহিত করে। পপুলার ফ্রন্ট অফ ইন্ডিয়া (পিএফআই) কমিটির সদস্য নাসিরউদ্দিন ইলামারাম অস্বীকার করেন যে পিএফআই প্রেম জিহাদের সাথে যুক্ত ছিল না, তিনি বলেন মানুষ হিন্দু ও খ্রিষ্টান ধর্মেও ধর্মান্তরিত হয়আর সেটি কোন অপরাধ নয়। দক্ষিণা কান্নাডা ও উদুপি জেলার মুসলিম সেন্ট্রাল কমিটির সদস্যরা বলেন, মুসলিম বিশ্বাস ও স¤প্রদায়কে গোপনে ক্ষতিসাধন করার জন্যই হিন্দু ও খ্রিস্টানরা এই ষড়যন্ত্র করেছে। ২০১০ সালের জুলাই মাসে প্রেম জিহাদ বিষয়টি পুনরায় সংবাদে আসে যখন কেরালার মন্ত্রী ভি.এইচ. অচুটন্ডন উদাহরণ হিসেবে বলেন, কেরালাকে মুসলিম প্রধান রাজ্য তৈরি করতেই অমুসলিম মেয়েদের ধর্মান্তর করা হচ্ছে। কেরালায় বিষয়টি তদন্তের জন্য পিএফআই তার বক্তব্যটি অগ্রাহ্য করে, কিন্তু বিজেপি মহিলা মর্চ প্রধান ও ভারতী জনতা পার্টি এনআইএ এর কাছে অনুসন্ধানের আবেদন জানায়। কেরালাতে কংগ্রেস পার্টি সেই মন্ত্রীর মন্তব্যের কঠোর প্রতিবাদ জানায় এবং বর্ণনা করে এটি খুবই খারাপ ও বিপজ্জনক বিষয়।
এই বিষয়ে ২০১১ সালে আলোচনাটি পুনরা কর্ণাটক আইনসভাতে উত্থাপিত হয় যখন ভারতীয় জনতা পার্টি মল্লিকা প্রসাদ বলেন, যে সমস্যাটি গোপনে চলছিল। তার মতে, ৮৪জন মেয়ের ৬৯জন যারা সে বছরের জানুয়ারি ও নভেম্বরে নিখোঁজ হয়েছিল, উদ্ধারের পর জানায়তারা মুসলিম যুবকদের প্রেমে পড়ে প্রতারিত হয়েছে। দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া জানায়, এ বিষয়ে বিভিন্ন প্রতিক্রিয় ছিল, ডেপুটি স্পিকার এন.যোগিস ভাট এবং এস. সুরেশ কুমার সরকারের সাথে সমর্থন করেন, যেখানে কংগ্রেস সদস্য বি. রামানথ রায় এবং অভয়চন্দ্র জাইন বিরোধীতা করেন যে সমাজের একতা নষ্ট করার জন্যই বিষয়টি তুলা হয়েছে। একই মাসে, হিন্দু হীতরক্ষণা ভেদিকে ১৫জন লোকের অ্যারেস্ট নিয়ে আয়োজিত একটি প্রতিবাদে রাষ্ট্রী য়স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের নেতা এই বিষয়টি তুলে ধরেন, যেখানে সংঘ বলে যে পুলিশ মুসলিম যুবকদের ধরতে ভয় পায় যারা প্রেম জিহাদ করে এবং হিন্দু মেয়েদের ফোন ব্যবহার করায় সাবধান হতে বলেন, আরো বলেন যে এগুলো অনেক বড় ভূমিকা রাখবে। চলচ্চিত্র নির্মাতা পরমিতা ভোহরাও বিষয়টি তুলেন যিনি বিষয়টিকে ভিএইচপি এর ষড়যন্ত্র তত্ত্ব হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
কেরালা হাই কোর্ট ২০১৭ সালে একজন ধর্মান্তরিত মেয়ে অখিলার (হাদিয়া) সাথে একজন মুসলিম ছেলে শাফিন জাহানের বিয়ে়কে নাকচ করে দেয়কারণ ধর্মান্তরের সময়কনের পিতামাতা সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। তার বাবা অভিযোগ করেন আইএসআইএসের নির্দেশে এই বিয়ে ও ধর্মান্তর হয়েছে। তারপর কেরালার ডিজিপিকে প্রেম জিহাদ সম্পর্কিত কেস অনুসন্ধান করার জন্য ও জোরপূর্বক ধর্মান্তরের ঘটনা খোঁজ করার আদেশ দেয়া হয়যেটা এই ধরনের সংগঠনের অস্তিত্ত্ব প্রমাণ করবে ও এদের কাজ করার পেছনের ঘটনার ধারণা দিবে। কেরালার অধিকাংশ যুবক আইএসআইএস এর সাথে যুক্ত হওয়ার কারণে এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এটা আরো নজরে আনবে যদি বৃহৎ কোন সংস্থা এর সাথে যুক্ত থাকে। কিন্তু পরিতাপের বিষয় এই প্রশ্নের কোন উত্তর পাওয়া যায়নি। মেয়ের বাবার দাবি ছিল তার মেয়েকে কোন একটি সংস্থা মুসলিম ছেলেকে বিয়ে করতে প্রলুব্ধ করে যার কারণে মেয়েটি পিতামাতার আয়তায় থাকেনা।
মেয়ের বাবা অশোকান মণি ২০১৬ সালে, যখন তার মেয়ে যেখানে পড়ত সেই ক্যাম্পাস থেকে নিখোঁজ হয়ে যায়তখন একটি হ্যাবিয়াস কর্পাস আবেদন লেখেন। তিনি জানান তার মেয়েকে জোর করে ধর্মান্তর করা হয়েছে ও তার মেয়ে অনেক সময়ই পরিবারকে জানাতো যে তাকে তার সহপাঠী জসীনা আবুবকর ও ফসীনা তার ইচ্ছার বাইরে কাজ করতে বাধ্য করত। যদিও অখিলাকে যখন পাওয়া যায় তখন সে জানায়, সে ২০১২ সাল থেকে ইসলাম ধর্ম অনুসরণ করছে ও সে নিজ ইচ্ছায় বাড়ি ছেড়েছে। সে আরও জানায়ে, তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে কেও ছিল না। সে বলে সে তার রুমমেটদের কাছ থেকে এই ধর্মের শিক্ষা সম্পর্কে জানার পর এ ধর্মে আগ্রহী হয়েছে। সে জানায় সে ইসলাম ধর্ম জানার জন্য থারিভাথুল ইসলাম সভা কর্তৃক আয়োজিত একটি কোর্সে যোগ দেয়। সে আরো জানায় ব্রিফের সময় আবুবকরের সাথে ছিল ও মঞ্জেরীর সত্যসরণি হোস্টেলে চলে যায়, যেই প্রতিষ্ঠানটি অভিযুক্তভাবে ইসলাম ধর্মান্তর প্রচার করছিল এবং বলা হয় এটি পিএফআই এর সাথে গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত। সেখানে ইরনাকুলামে সে সৈনাবার সাথে পরিচিত হয়যার সাথে সে তার বাবার আবেদন করার পর থাকে। জুনে সে সত্যসারণীতে ভর্তি হওয়ার প্রমাণ দিলে কোর্ট সৈনাবার সাথে তার থাকা বৈধ করে ও তার বাবার আবেদন খারিজ করে। দুই মাস পর তার বাবা আবার আবেদন করেন ও বলেন তার মেয়ে আইএসআইএস এর নির্দেশে ধর্মান্তর করেছে ও তার শঙ্কা সে আফগানিস্তানে উক্ত দলে যোগ দিবে, তিনি উদ্ধৃত করেন কেরালার দুই নারীর কথা যারা মুসলিম পুরুষদের দ্বারা ধর্মান্তর করেছে ও উক্ত দলে যোগ দিয়েছে। ডিসেম্বরে, অখিলা শাফিনকে বিয়ে করে ও আশোকানের আবেদন মন্জুর করা হয়জানুয়ারি ২০১৭ সালে। আখিলা বিয়ের সার্টিফিকেট কোর্টকে দেখায় কিন্তু এটা নাকোচ করা হয়।
শাফিন জাহান ২০১৭ সালের জুলাইয়ে কোর্টে সিদ্ধান্তকে ভারতের সুপ্রিমকোর্টে চ্যালেঞ্জ করে। শাফিন তার পরিবারের সাথে প্রথম মেয়েকে দেখে আগস্ট ২০১৬-তে একটি বৈবাহিক ওয়েবসাইটের বিজ্ঞাপনে। সুপ্রিমকোর্টে কেসের কাজ শুরু হয় ৪ আগস্ট ২০১৭-এ। মেয়ের বাবা অভিযোগ করে যে তার মেয়েকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করা হয়েছে। সুপ্রিমকোর্ট একই সাথে কেরালা সরকার ও এনআইএ-এর কাছ থেকে তথ্য গ্রহণ করে। প্রাক্তন বিচারক আর.বি. রবীন্দ্রন এনআইএ’কে ১৬আগস্ট বিষয়টি অনুসন্ধান করার নির্দেশ দেন যখন এনআইএ প্রকাশ করে যে, মেয়েটির বিয়ে করা ও ধর্মান্তরের ঘটনা ভিন্ন নয় এবং রাজ্যে এমন ঘটনা দেখা দিয়েছে, আরো বলেন তারা একই লোকের আরো একটি কেস পেয়েছেন। এনআইএ জানায় কেসের স্বামী আরো দুটি ভিন্ন সংস্থা ইসলামিক স্টেট অব ইরাক অ্যান্ড দ্য লেভান্ট-এর সাথে যুক্ত। যাদের যেকান একটি হয়তো এই বিয়ে সম্পাদন করেছে।
২০১৮ সালের ৮ মার্চে সুপ্রিম কোর্ট কেরালা উচ্চ আদালত থেকে হাদিয়ার বিবাহ বাতিল সম্পর্কিত রায়টি তুলে নেয় এবং সেখান থেকে জানানো হয় তিনি তার নিজের স্বাধীন ইচ্ছায় বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছে।
আইন পাস এবং জনসাধারণের প্রতিক্রিয়া:
তবে হিন্দু-মুসলিম বিয়ে ঠকাতে ইন্ডিয়ার উত্তর প্রদেশ সরকার রাতারাতি যে অর্ডিন্যান্সটি এনেছে, সেটিকে ইন্ডিয়ার অনেকেই নাৎসি জার্মানির নেতা হিটলারের আনা ইহুদী-বিরোধী আইনের সঙ্গে তুলনা করছেন। ১৯৩৪ সালে নাৎসি জার্মানিতে ইহুদীদের সঙ্গে তথাকথিত ‘এরিয়ান’ বা আর্য বংশোদ্ভূতদের বিয়ে ও যৌন সম্পর্ক নিষিদ্ধ ঘোষণা করে একটি আইন আনা হয়ে ছিল। ইন্ডিয়ার সুপরিচিত বামপন্থী নেত্রী ও অ্যাক্টিভিস্ট বৃন্দা কারাট বলেন, হিটলারের ওই আইনে দোষী সাব্যস্ত হয়ে অনেক ইহুদীকে জেলে যেতে হয়েছিল, যাদের অনেকে শেষ পর্যন্ত কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে প্রাণ হারান। শুধুমাত্র ভিন্ন ধর্মে বিয়ে করার অপরাধে দশ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান রেখে উত্তরপ্রদেশের বিজেপি সরকার মঙ্গলবার রাতে যে অর্ডিন্যান্স এনেছে, সেটিও ঠিক একই ধরনের পদক্ষেপ বলেই আমরা মনে করি।’
ইন্ডিয়ান সংবিধানের আর্টিকল ২১ যে ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকার দিয়েছে, এই অর্ডিন্যান্স তার গুরুতর লঙ্ঘন বলেও অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করছেন। ভারতের ‘স্পেশাল ম্যারেজ অ্যাক্ট ১৯৫৪’ যে ভিন্ন ধর্মে নারী-পুরুষের মধ্যে বিয়েকে স্বীকৃতি দেয়, সে কথাও মনে করিয়ে দিচ্ছেন বংশজ জৈনের মতো একাধিক সংবিধান বিশেষজ্ঞ। এর আগে হিন্দু ও মুসলিম স¤প্রদায়ের ছেলেমেয়েদের মধ্যে আন্ত-ধর্মীয় বিয়ে ঠেকানোর লক্ষ্য নিয়ে ভারতের উত্তরপ্রদেশ সরকার একটি অর্ডিন্যান্স পাশ করে, যে ধরনের আইনি উদ্যোগ ভারতে প্রথম। মঙ্গলবার (২৪ নভেম্বর) সন্ধ্যায় রাজ্য ক্যাবিনেটের জরুর বৈঠকে এই অর্ডিন্যান্সটি পাস করানো হয়, যাতে বলা হয়েছে শুধুমাত্র একটি মেয়ের ধর্ম পরিবর্তনের উদ্দেশ্য নিয়ে দুই ধর্মের মধ্যে কোনও বিয়ে হলে দোষী ব্যক্তির দশ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারবে। ‘উত্তরপ্রদেশ বিধিবিরুদ্ধ ধর্ম সম্পরিবর্তন প্রতিষেধ অধ্যাদেশ ২০২০’ নামের এই অর্ডিন্যান্সটিতে আরও বলা হয়েছে, এই ধরনের ধর্মান্তরণের প্রমাণ পাওয়া গেলে সেই বিয়ে শূন্য’ বা বাতিল বলে বিবেচিত হবে।

