রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে মিয়ানমারকে আন্তর্জাতিকভাবে চাপ দেয়া উচিৎ

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে মিয়ানমারকে আন্তর্জাতিকভাবে চাপ দেয়া উচিৎ

সম্পাদকীয় | উত্তরদক্ষিণ
মুদ্রিত সংস্করণ: রবিবার, ০৬ ডিসেম্বর, ২০২০ | আপডেট: ০০:০১

তিন বছর পূর্ণ হয়ে চতুর্থ বছরে পদার্পণ করেছে রোহিঙ্গা সংকট। ২৫ আগস্ট ২০১৭-এর পর থেকে আজ পর্যন্ত রোহিঙ্গারা বাংলাদেশেই বসবাস করে আসছে। নির্যাতিত রোহিঙ্গাদেরকে বাংলাদেশে আশ্রয় দিয়ে সারা বিশ্বে অনন্য নজির স্থাপন করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে সফলতার সঙ্গে বিশ্ব সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে বাংলাদেশ। তিন বছরের বেশি সময় ধরে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী বাংলাদেশে মানবিক সহযোগিতা পেয়ে আসছে। রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও নানাভাবে তাদের কার্যক্রম চালু রেখেছে। জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বাংলাদেশকে সহায়তা প্রদানের পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের তাদের নিজ দেশে ফেরত যাওয়া নিশ্চিত করতে গৃহীত পদক্ষেপগুলোতে তাদের সমর্থন ব্যক্ত করেছে। কিন্তু এত কিছুর পরও রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন এখনও শুরু হয়নি। একাধিকবার রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরুর তারিখ ঘোষণা করা হলেও তা ব্যর্থ হয়েছে।

কারণ, যেটি সবচেয়ে বেশি জরুরি, রোহিঙ্গাদের বিষয়ে সেখানকার স্থানীয় জনগণ ও বৌদ্ধ সংগঠনগুলোর মধ্যে ইতিবাচক মনোভাব সৃষ্টি বা বর্তমান মনোভাবের পরিবর্তন ঘটানো, তা সম্ভব হয়নি এবং এ ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও জানা যায়নি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চীন, জাপান, ইন্ডিয়া, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুরের সঙ্গে মিয়ানমারের বাণিজ্য সম্পর্ক এবং বিনিয়োগ রয়েছে। এই দেশগুলো মিয়ানমারের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে এই দেশগুলোর ভূমিকা আরো জোরালো হলে সমস্যার সমাধান দ্রুত ও টেকসই হবে। যেহেতু প্রত্যাবাসনের উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করতে হলে রাখাইন প্রদেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নয়ন প্রয়োজন তাই সেখানে চলমান সহিংসতা বন্ধের জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। সে বিষয়ে আঞ্চলিক দেশ ও জোটগুলোরও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ গ্রহণ করা দরকার । অর্থাৎ রোহিঙ্গাদের জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করা এবং সে জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে মিয়ানমারের ওপর চাপ অব্যাহত রাখাটাই জরুরি।

সম্প্রতি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আবদুল মোমেনও বলেছেন, রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জরুরি পদক্ষেপ নেয়া দরকার। সুইডেনের রাষ্ট্রদূত আলেকজান্দ্রা বার্গ ফন লিনদে, স্পেনের রাষ্ট্রদূত ফ্রান্সিসকো দি ওসিস বেনেতিজ সালাস ও নরওয়ের রাষ্ট্রদূত অ্যাসপেন রিকতার সেভেন্দসেনের সাথে এক বৈঠকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ বিষয়গুলো উত্থাপন করেন। ড. মোমেন বলেন, “বাংলাদেশে রোহিঙ্গা যাত্রার তিন বছরের বেশি সময় অতিবাহিত হয়ে গেছে। কিন্তু মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ অনুকূল পরিবেশ তৈরি না করায় একজন রোহিঙ্গাকেও মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন করা সম্ভব হয়নি।”

এদিকে এই অবস্থার মধ্য দিয়ে ভাসানচরে পৌঁছেছে রোহিঙ্গাদের প্রথম দল। নৌবাহিনীর মোট আটটি জাহাজে করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে মালামালসহ তাদের। সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, ০৪ ডিসেম্বর সকালে ১ হাজার ৬৪২ জন রোহিঙ্গাকে নিয়ে ভাসানচরের উদ্দেশে জাহাজগুলো রওনা দেয়।

এর আগে ‘কক্সবাজার থেকে রোহিঙ্গাদের প্রথম দলকে খুব শিঘ্রই ভাসান চরে নেওয়ার’ বিষয়টি জানান, সরকারের শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কার্যালয়ের অতিরিক্ত কমিশনার মোহাম্মদ সামছুদ্দৌজা। তিনি জানান, বাংলাদেশ সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে ২৩১২ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৩ হাজার একর আয়তনের ওই চরে ১২০টি গুচ্ছগ্রামের অবকাঠামো তৈরি করে এক লাখের বেশি মানুষের বসবাসের ব্যবস্থাসহ তাদের জন্য রান্নার ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ, পানি আর পয়ঃনিষ্কাশন, খেলার মাঠ আর ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রের সঙ্গে জীবিকা নির্বাহের সুযোগও তৈরি করা হয়েছে।

এদিকে ‘শিঘ্রই রোহিঙ্গাদেরকে ভাসান চরে নেওয়ার’ খবরে (২ ডিসেম্বর এক বিবৃতিতে) ‘ভাসানচরে স্থানান্তরের ক্ষেত্রে রোহিঙ্গা শরণার্থীরা যেন প্রাসঙ্গিক, নির্ভুল এবং হালনাগাদ তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তথ্যসমৃদ্ধ এবং স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিতে পারে তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানায় জাতিসংঘ।

অন্যদিকে বাংলাদেশে নিযুক্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) রাষ্ট্রদূত রেনসে তেরিঙ্কও (০২ ডিসেম্বর) বলেন, রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছায় ও টেকসই প্রত্যাবাসনের ওপর জোর দিয়ে তাদের সংকটের একটি স্থায়ী সমাধান খুঁজে বের করতে পুরো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের এক হওয়া উচিৎ। তিনি বলেন, ‘তারা নিজ দেশে (মিয়ানমার) ফিরে যেতে চায়। আমাদের উচিৎ এতে সমর্থন দেয়া।’

ভাসানচরে স্থানান্তর একটি সাময়িক ব্যবস্থা। এটা কোন স্থায়ী সমাধান নয়। মানবিকতার জায়গা থেকে বাংলাদেশ সরকার হয়তো তাদেরকে আশ্রয় প্রদানের সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছে। কিন্ত রোহিঙ্গাদেরকে তাদের নিজদেশে প্রত্যাবাসন ও নিরাপদ জীবনের কোন বিকল্প নেই। এজন্য অবশ্যই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের একজোট হয়ে চাপ অব্যাহত রাখা উচিৎ যেন দ্রুত রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান করতে মিয়ানমার বাধ্য হয়।

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading