মিললো পদ্মার দুইকুল: মূর্তমান স্বপ্নের সামনে বাংলাদেশ

মিললো পদ্মার দুইকুল: মূর্তমান স্বপ্নের সামনে বাংলাদেশ

উত্তরদক্ষিণ | বৃহস্পতিবার, ১০ ডিসেম্বর, ২০২০ | আপডেট: ১২:৩৪

বৃহস্পতিবার (১০ ডিসেম্বর) শেষ স্প্যানটি বসানোর মধ্য দিয়ে পুরোপুরি দৃশ্যমান হলো স্বপ্নের পদ্মা সেতু। এতদিনের স্বপ্নে থাকা সেতু এখন যেন বিমূর্ত হয়ে দাঁড়ালো গোটা বাংলাদেশের কাছে। মিলন হলো প্রমত্তা পদ্মার দুই কুলের।

বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টা ২ মিনিটে সেতুর সর্বশেষ এই স্প্যানটি (৪১তম) বসে। ২-এফ আইডির এই স্প্যান বসানোর পরই যুক্ত হলো মুন্সীগঞ্জ ও শরিয়তপুর জেলা। রাজধানী শহর ঢাকার সাথে সংযুক্ত হলো পুরো দক্ষিণবঙ্গ। পদ্মা সেতুর পিয়ার-১২ ও পিয়ার-১৩ নম্বরে শেষ স্প্যানটি বসানো হয়।

পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী শফিকুল ইসলাম এবং পদ্মা সেতুর প্রকল্প ব্যবস্থাপক ও নির্বাহী প্রকৌশলী দেওয়ান মো. আব্দুল কাদের এ খবর নিশ্চিত করেন।

দেওয়ান মো. আব্দুল কাদের জানান, সর্বশেষ স্প্যানটি বসানোর পর সেতুর পুরো ছয় দশমিক ১৫ কিলোমিটার দৃশ্যমান হলো। আর এরই মাধ্যমে যুক্ত হলো মুন্সীগঞ্জ ও শরিয়তপুর জেলা।

২০১৭ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর সেতুর প্রথম স্প্যান বসানো হয়। এর পর একে একে নানা বাধা পেরিয়ে ও নানামুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে তিন বছর দুই মাস ১০ দিনে সেতুর সবগুলো স্প্যান বসানোর কাজ শেষ হয়।

এখনও সেতুর আরও কিছু কাজ বাকি আছে। যেমন- রোডওয়ে স্ল্যাব, রেলওয়ে স্ল্যাব, সুপার-টি গার্ডার বসানো। স্ল্যাবের উপর পীচ ঢালাইয়ের কাজ, আলোকসজ্জা, ল্যাম্পপোস্ট বসানোর কাজ করতে হবে। সব মিলিয়ে যান চলাচলের জন্য সেতু উন্মুক্ত করতে আরও এক বছর লাগতে পারে।

এর আগে বুধবার (৯ ডিসেম্বর) বিকাল সোয়া ৫টার দিকে ১৫০ মিটার দৈর্ঘ্যের স্প্যানটি মুন্সীগঞ্জের লৌহজংয়ের মাওয়ার কুমারভোগ কন্সট্রাকশন ইয়ার্ডের স্টিল ট্রাস জেটি থেকে বহন করে কাঙ্ক্ষিত পিয়ারের উদ্দেশে রওনা দেয় পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ভাসমান ক্রেন তিয়ান-ই। সন্ধ্যা ৬ টার দিকে পিয়ারের কাছে নিয়ে যায় স্প্যানটিকে। তবে, ঘন কুয়াশার কারণে জেটি থেকে স্প্যান রওনা দিতে ঘণ্টা তিনেক অপেক্ষায় থাকতে হয় ক্রেন তিয়ান-ই কে।

পদ্মা সেতু সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, সবগুলো স্প্যান বসাতে তিন বছর দুই মাসের বেশি সময় লাগলেও ২০২০ সালেই ২১টি স্প্যান বসানো হয়। যদিও বন্যার কারণে এ বছরের দীর্ঘ চার মাস স্প্যান বসানোর কাজ করতে পারেনি ঠিকাদার কোম্পানি। এছাড়া করোনাভাইরাসের প্রকোপের কারণেও সেতুর কাজে কিছু ধীরগতি আসে। পরে তা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়।

পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ শুরু হয়েছিল ২০১৪ সালে। আর ২০১৭ সালের ডিসেম্বর মাসে বসানো হয়েছিল প্রথম স্প্যানটি। এরপর ধাপে ধাপে স্প্যান বসিয়ে এ পর্যন্ত ৩৯টি স্প্যান বসানো হয়েছে। সেতুর মোট পিলার ৪২টি এবং এতে স্প্যান বসানো হয় ৪১টি।

ছয় দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই বহুমুখী সেতুর মূল আকৃতি হবে দোতলা। কংক্রিট ও স্টিল দিয়ে নির্মিত হচ্ছে পদ্মা সেতু। সেতুর ওপরের অংশে যানবাহন ও নিচ দিয়ে চলবে ট্রেন। মূল সেতু নির্মাণের জন্য কাজ করছে চীনের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না রেলওয়ে মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি লিমিটেড (এমবিইসি) ও নদী শাসনের কাজ করছে দেশটির আরেকটি প্রতিষ্ঠান সিনো হাইড্রো করপোরেশন। প্রকল্পের সর্বমোট বাজেট ৩০ হাজার ১৯৩ দশমিক ৩৯ কোটি টাকা।

মূল সেতুর দুই হাজার ৯১৭টি রোডওয়ে স্ল্যাবের মধ্যে এক হাজার ২৮৫টি এবং দুই হাজার ৯৫৯টি রেলওয়ে স্ল্যাবের মধ্যে এক হাজার ৯৩০টি স্থাপন করা হয়েছে। মাওয়া ও জাজিরা ভায়াডাক্টে ৪৮৪টি সুপার-টি গার্ডারের মধ্যে ৩১০টি স্থাপন করা হয়েছে।

স্প্যান বসানো শেষে পদ্মা সেতুর বাকি কাজ শেষ হতে আর ১০ মাস সময় লাগবে বলে সম্প্রতি জানান সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, গত ৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত মূল সেতুর বাস্তব কাজের অগ্রগতি ৯১ ভাগ এবং আর্থিক অগ্রগতি ৮৮ দশমিক ৩৮ ভাগ। মূল সেতু কাজের চুক্তিমূল্য ১২ হাজার ১৩৩ দশমিক ৩৯ কোটি টাকা এবং এ পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে ১০ হাজার ৭২৩ দশমিক ৬৩ কোটি টাকা। নদীশাসন কাজের বাস্তব অগ্রগতি ৭৫ দশমিক ৫০ ভাগ এবং আর্থিক অগ্রগতি ৬৫ দশমিক ১৭ ভাগ। নদীশাসন কাজের চুক্তিমূল্য ৮ হাজার ৭০৭ দশমিক ৮১ কোটি টাকা এবং এ পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে ৫ হাজার ৬৭৪ দশমিক ৪৮ কোটি টাকা।

সংযোগ সড়ক ও সার্ভিস এরিয়ার কাজ শেষ হয়েছে অনেক আগেই। সংযোগ সড়ক ও সার্ভিস এরিয়ার খাত, ভূমি অধিগ্রহণ, পুনর্বাসন ও পরিবেশ খাত, পরামর্শক, সেনা নিরাপত্তা, ভ্যাট ও আয়কর, যানবাহন, বেতন ও ভাতাদি এবং অন্যান্য খাতে মোট বরাদ্দ ৭ হাজার ৭১৬ দশমিক ৯১ কোটি টাকা।

প্রকল্পের সর্বমোট বাজেট ৩০ হাজার ১৯৩ দশমিক ৩৯ কোটি টাকা। ৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে ২৪ হাজার ১১৫ দশমিক ০২ কোটি টাকা; অর্থাৎ ৭৯ দশমিক ৮৯ ভাগ। প্রকল্পের সার্বিক অগ্রগতি ৮২ দশমিক ৫০ ভাগ।

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading