বধির বেটোফেন: বহু প্রেমিকা ও গণিকালয়ের মধ্যেও ছিলেন একাকিত্বের উপাসক
উত্তরদক্ষিণ | বৃহস্পতিবার, ১৭ ডিসেম্বর, ২০২০ | আপডেট: ১৭:১২
জীবনের অর্ধেকের বেশি সময় ছিলেন বধির। লুডউইগ ভ্যান বেটোফেনের জীবনের প্রতি বাঁকের বহুধাপ আজও অজানা।
দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে সঙ্গীত প্রবাহিত ছিল বেটোফেন পরিবারের ধমনীতে। অষ্টাদশ শতকে অস্ট্রিয়ার মেকেলেন থেকে জার্মানির বন শহরে এসে থাকতে শুরু করেন ২১ বছরের মিউজিশিয়ান লুডউইগ ভ্যান বেটোফেন। তার ছেলে জোহান ভ্যান বেটোফেন পেশাও ছিল সঙ্গীত। কিন্তু তিনি ছিলেন বদ্ধ মাতাল।
জোহান এবং মারিয়ার সংসারে ছিল ৭ জন সন্তান। তাদের মধ্যে মেজো এবং ছোট দু’টি ছেলে ছাড়া বাকি ৪ জনেরই মৃত্যু হয়েছিল শৈশবে। মেজো ছেলের নামকরণ করা হয়েছিল দাদার নাম অনুসারেই।

তার জন্মের তারিখ স্পষ্ট করে জানা যায় না। শুধু স্থানীয় গির্জার নথি বলে, বেটোফেন পরিবারের মধ্যম পুত্রটিকে ব্যাপ্টাইজ করা হয়েছিল ১৭৭০ খ্রিস্টাব্দের ১৭ ডিসেম্বর। সে দিক থেকে ধরে নেওয়া হয় তার জন্ম হয়েছিল ১৬ ডিসেম্বর, ১৭৭০। তবে এই তথ্যেরও কোনও প্রামাণ নেই।
বাবার কাছেই সঙ্গীতশিক্ষার হাতেখড়ি। পিতা জোহান নিজেই তাকে শেখাতেন পিয়ানো বাজানো। কিন্তু শৈশবে এই শিক্ষণ পর্ব তার কাছে ছিল যন্ত্রণার। সুর তুলতে সামান্য ভুল করলেই রগচটা বাবার হাতে জুটত বেদম মার। কয়েক বছর যেতে না যেতেই বেটোফেনের স্কুল যাওয়া বন্ধ করে দেন তার বাবা।

৫ বছর বয়স থেকে বেটোফেনের সঙ্গীতশিক্ষা শুরু হয় বাড়ির বাইরে। তার প্রথম সঙ্গীতশিক্ষক ছিলেন অর্গ্যানবাদক গিল ভ্যান ডেন ইডেন। পারিবারিক বন্ধু টোবিয়াস ফ্রেডরিখ ফেইফারের কাছে শিখতেন কি বোর্ড বাজানো। এ ছাড়া আরও ২ জনের কাছে চলত বেহালাবাদন শিক্ষা।
এদের মধ্যে শিক্ষক ফেইফারের ইনসমনিয়া ছিল। তিনি গভীর রাতে এসে ছোট্ট বেটোফেনকে ঘুম থেকে তুলে শেখাতে শুরু করতেন। কারণ বেটোফেনের বাবা পণ করেছিলেন তার ছেলেকেও লিওপোল্ড মোজার্টের মতো বিস্ময়প্রতিভা হিসেবে প্রমাণ করবেন।
মোজার্ট এবং বেটোফেনের বয়সের ব্যবধান ৫৩ বছর। বেটোভেনের ১৫ বছর বয়সে মৃত্যু হয় মোজার্টের। তার কীর্তিকে ছাপিয়ে যাবে বেটোভেন— এটাই ছিল জোহানের স্বপ্ন।
পরবর্তীতে বিখ্যাত জার্মান সুরকার ক্রিস্টিয়ান গোটলব নেফের কাছে সুরসাধনা করেছিলেন তিনি। জীবনের প্রথম চাকরিও শিক্ষক নেফের কাছেই। প্রথমে বিনা পারিশ্রমিকে, তার পর বেতন-সহ।
১৭৮৭ খ্রিস্টাব্দে প্রয়াত হন বেটোফেনের মা। তার ২ বছর পরে অতিরিক্ত নেশার জন্য চাকরি হারান তার বাবা। মাকে হারানোর ৫ বছর পরে বন ছেড়ে অস্ট্রিয়ার ভিয়েনায় ফেরার কয়েক দিন পরে বাবার মৃত্যুসংবাদ পান।
সুরকার হিসেবে কাজ করার দিকে প্রথমে আগ্রহী ছিলেন না বেটোফেন। তবে তার মধ্যে মোজার্টের প্রভাবও ছিল গভীর।
১৭৯৫ খ্রিস্টাব্দে প্রথম নিজের অনুষ্ঠানে আত্মপ্রকাশ করেন বেটোফেন। তার পর একের পর এক মূর্ছনার জন্ম দিতে থাকেন তিনি।

প্রথম জীবনে তিনি সম্রাট নেপোলিয়ন বোনাপার্টের গুণমুগ্ধ ছিলেন। ১৮০৪ খ্রিস্টাব্দে নেপোলিয়ন নিজেকে সম্রাট ঘোষণা করার পরে তার উদ্দেশে ‘সিম্ফনি থ্রি’ রচনা করেছিলেন বেটোফেন। কিন্তু পরে মোহভঙ্গ হওয়ায় তিনি সিম্ফনির নামকরণ করেন ‘এরোইকা’।
তিনি নিজে কোনও দিন বিয়ে করেননি। ছোট ভাই কাসপারের ছেলে কার্ল-কে নিজের উত্তরসূরি বলে মনে করতেন।
তার জীবনের বেশির ভাগ দিকই উন্মোচিত হয়েছে মৃত্যুর পরে। সেগুলির মধ্যে অন্যতম একটি দিক হল তার বধিরতা। ৩০ বছর বয়সের আগে থেকেই শ্রবণক্ষমতা হারাতে থাকেন তিনি। তার নিজের কথায়, এক পিয়োনাবাদকের সঙ্গে বাকবিতণ্ডার জেরে তিনি অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলেন।
তার পর থেকেই একটু একটু করে বধির হয়ে যান তিনি। ‘টিনাইটাস’ রোগের শিকার হন তিনি। অর্থাৎ কানের কাছে ক্রমাগত ঝিঁঝিঁপোকার বাদ্য শুনতে পেতেন । চেষ্টা সত্ত্বেও এই রোগের প্রতিকার হয়নি। বধির অবস্থাতেই শাশ্বত সুরের মূর্ছনা উপহার দিয়ে গিয়েছেন তিনি।
বেটোফেন ছিলেন একাকিত্বের উপাসক। কিন্তু প্রেম তাকে ছেড়ে যায়নি কখনো। বার বার সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছেন। কিন্তু কারও সঙ্গেই নিজের সম্পর্ককে কোনও সংজ্ঞা দিতে চাননি। বেটোফেনের প্রেম ও প্রেয়সীদের নিয়ে জানতে জীবনীকার ও গবেষকদের ভরসা তার লেখা চিঠি। কিন্তু স্কুলের গন্ডিপার না হবার কারণে তার হাতের লেখা ছিল দুর্বোধ্য। অনেক সময় তার স্বাক্ষর বুঝতেই নাকাল হয়ে গিয়েছেন ইতিহাসবিদরা।

১৮১২ খ্রিস্টাব্দে তিনি ১০ পৃষ্ঠার প্রেমপত্র লিখেছিলেন তার ‘শাশ্বত প্রেয়সী’-র উদ্দেশে। কিন্তু কোনও দিন সেই চিঠি প্রেরকের কাছে পৌঁছায়নি। কে ছিলেন তার সেই ‘ইমমর্টাল বিলাভেড’? ভেসে ওঠে অনেক অভিজাত সুন্দরীর নাম। তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন অ্যান্টোনি ব্রেন্টানো, জুলি গুইকিয়ার্ডি, থেরেস ম্যালফাট্টি এবং জোসেফিন ব্রুন্সভিক।
এরা নানা সময়ে এসেছেন বেটোফেনের জীবনে। তাদের মধ্যে গুইকিয়ার্ডির সঙ্গে বেটোফেনের চটুল ফ্লার্টের সম্পর্ক অজানা নয়। তবে বেশি এগোয়নি সেই সম্পর্ক। পরে গুইকিয়ার্ডি বিয়ে করেন আর এক সুরকার ভন গ্যালেনবার্গকে। জীবনীকারকে বেটোফেন বলেছিলেন, তিনি নিজেই প্রত্যাখ্যান করেছিলেন গুইকিয়ার্ডির প্রণয়।
অনেক গবেষকের মত বেঠোভেনের সেই অজ্ঞাতপরিচয় প্রেমিকা ছিলেন অভিজাত ব্রুন্সভিক পরিবারের কন্যা জোসেফিন। সামাজিক পরিচয়ে বিস্তর বৈষম্যের জন্য তাদের বিয়ে হয়নি।
তবে জোসেফিনের জীবনের শেষ দিন অবধি তার সঙ্গে যোগাযোগ ছিল বেটোফেনের। প্রসঙ্গত বেটোফেন ছিলেন তার কিশোরজীবনের পিয়ানো শিক্ষক।
ব্যক্তিগত চিকিৎসকের ভাইঝি মালফাট্টির প্রেমে যখন পড়েছিলেন তখন বেটোফেনের বয়স ৪০ বছর। উল্টো দিকে মালফাট্টি ১৯ বছরের কিশোরী। তিনি অবশ্য পত্রপাঠ প্রত্যাখ্যান করেছিলে সেই প্রেমের প্রস্তাব।

অ্যান্টনি ব্রেন্টানোর সঙ্গে যখন বেটোফেনের আলাপ হয়েছিল, তখন অ্যান্টনি ফ্রানজ ব্রেন্টানোর স্ত্রী। কিন্তু তাতে বেটোফেনের সঙ্গে তার প্রেম বাধা পায়নি। ১৮১১ থেকে ১৮১২ অবধি তিনিই ছিলেন বিটোফেনের ঘনিষ্ঠতম, এ কথা স্বীকার করেছেন বহু গবেষকই। এর পর স্বামীর সঙ্গে ভিয়েনা ছেড়ে চলে যান অ্যান্টনি। আর কোনও দিন দেখা করেননি বেটোফেনের সঙ্গে। তবে পরে বার বার তার স্মৃতিকথায় ফিরে এসেছেন বেটোফেন।
১৮১২ খ্রিস্টাব্দের পর বেটোফেনের জীবনবৃত্তে কোনও নারীর নাম পাওয়া যায় না। তবে তার সৃষ্টিতে প্রভাব ফেলেছেন প্রেয়সীরা। তাদের উদ্দেশেও তিনি সুরসৃষ্টি করেছেন। জীবনের মধ্য পর্বে তিনি গণিকালয়ে মাঝে মাঝে পা রাখতেন, সে তথ্যও পেয়েছেন বেটোফেন-গবেষকরা।
১৮২৬ থেকে ক্রমে তার শরীর ভাঙতে থাকে। বছর খানেক শয্যাশায়ী থাকার পরে প্রয়াত হন ১৮২৭ এর ২৬ মার্চ। মৃত্যুর সময় পাশে ছিলেন শুধু ঘনিষ্ঠ বন্ধু আনসেল্ম হাটেনব্রেনার। পরে তিনি বলেছিলেন, বিকেল ৫টার সময় বাইরে এক বার বাজ পড়ার শব্দে চোখ খুলেছিলেন বেটোফেন। ক্ষণিকের জন্য উপরে উঠেছিল ডান হাত। কিছু মুহূর্ত তাকিয়ে থাকার পরে চোখ বন্ধ করে ফেলেন। আর সেই চোখের পাতা খোলেনি।
ময়নাতদন্তের রিপোর্ট থেকে জানা গিয়েছিল, বিটোভেনের মৃত্যুর কারণ ছিল সিরোসিস অব লিভার। অতিরিক্ত মদ্যপান তাকে তিল তিল করে এগিয়ে দিয়েছিল মৃত্যুর কাছে। তবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিয়ে এখনও ধোয়াঁশা রয়েছে। মৃত্যুর ৩৬ বছর পরে সমাধি থেকে তার দেহাবশেষ তুলে পরীক্ষা করা হয়। আধুনিক গবেষকদের মতে, সিরোসিস অব লিভারের পাশাপাশি তিনি সিফিলিসেরও শিকার ছিলেন।
নিজের তৈরি স্বর্গীয় সুরের বড় অংশ পৌঁছয়নি তার কাছেই। কিন্তু সেই সিম্ফনি মধুবর্ষণ করে চলেছে বিশ্ববাসীর কানে। বিটোফেনের জন্মের ২৫০ বছর পরেও।

