দ্বিতীয় প্রণোদনা প্যাকেজের ইঙ্গিতে শেয়ারবাজারে প্রাণসঞ্চার

দ্বিতীয় প্রণোদনা প্যাকেজের ইঙ্গিতে শেয়ারবাজারে প্রাণসঞ্চার

উত্তরদক্ষিণ | শুক্রবার, ২৫ ডিসেম্বর, ২০২০ | আপডেট: ১১:৪০

আগে থেকেই ধুঁকছিল দেশের পুঁজিবাজার। ক্রমাগত সূচকের পতনে দিশেহারা হয়ে পড়েছিলেন বিনিয়োগকারীরা। বৈশ্বিক মহামারী কোভিড-১৯ আঘাত হানার পর পুঁজিবাজারে দরপতন আরো তীব্র হয়ে ওঠে। একসময় ৩ হাজার ৬০০ পয়েন্টে গিয়ে ঠেকে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স। তবে সরকার ঘোষিত সাধারণ ছুটি শেষে লেনদেন চালু হলে ধীরে ধীরে প্রাণ ফিরতে শুরু করে পুঁজিবাজারে। এরই ধারাবাহিকতায় গত ছয় মাসে সূচকে ১ হাজার ৬১৪ পয়েন্ট যোগ হয়েছে। এতে দীর্ঘদিন পর বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আশা জাগাতে পেরেছে পুঁজিবাজার।

আজ থেকে আড়াই বছর আগেও পুঁজিবাজারের সূচক ৬ হাজারের ওপরে ছিল। ২০১৮ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ৬ হাজার ৫১ পয়েন্টে অবস্থান করছিল ডিএসইএক্স। এর পর থেকে মাঝে মধ্যে উত্থান হলেও সার্বিকভাবে নিম্নমুখী ছিল সূচক। এ বছরের ১৮ মার্চ সূচক ৩ হাজার ৬০৪ পয়েন্টে নেমে যায়। আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে। বেড়ে যায় শেয়ার বিক্রির চাপ। এ অবস্থায় সূচকের পতন রোধ এবং বিনিয়োগকারীদের আতঙ্ক দূর করতে হস্তক্ষেপ করে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর শেয়ারের সর্বনিম্ন দর নির্ধারণ করে দেয়া হয়। ফলে একটি নির্দিষ্ট পয়েন্টের নিচে সূচকের পতন হওয়ার সুযোগ বন্ধ হয়ে যায়। এরই মধ্যে নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে সরকার ঘোষিত সাধারণ ছুটির কারণে ২৫ মার্চের পর থেকে দুই মাসেরও বেশি সময় বন্ধ ছিল পুঁজিবাজারের লেনদেন। এ সময়ে বিএসইসির শীর্ষ নেতৃত্বেও পরিবর্তন আসে। অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলামের নেতৃত্বে নতুন কমিশন যোগ দেয়ার পর এ বছরের ৩১ মে পুঁজিবাজারে আবারো লেনদেন শুরু হয়। সেদিন ডিএসইএক্সের অবস্থান ছিল ৪ হাজার ৬০ পয়েন্টে। এর পর থেকে মাঝে মধ্যে দর সংশোধন হলে সার্বিক ঊর্ধ্বমুখিতা দেখা যায় পুঁজিবাজারে। সর্বশেষ গতকাল লেনদেন শেষে ডিএসইএক্স ৫ হাজার ২১৮ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে।

গত ছয় মাসে সূচকে যোগ হয়েছে ১ হাজার ৬১৪ পয়েন্ট। সূচকের পাশাপাশি এ সময়ে বাজার মূলধনও বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। এ ছয় মাসে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৪১১ কোটি টাকার বাজার মূলধন বেড়েছে। সূচক ও বাজার মূলধনের পাশাপাশি লেনদেনের পরিমাণও বেড়েছে এ সময়ে। সদ্য সমাপ্ত সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসেও (২৪ ডিসেম্বর) পুঁজিবাজারে ১ হাজার ৪০৫ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে। এর আগে এ বছরের ১৭ আগস্ট ১ হাজার ৪০৮ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছিল।

২৪ ডিসেম্বর পুঁজিবাজারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের তুলনায় সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ ছিল অনেক বেশি। এদিন বাজারের সূচক বাড়ার পেছনে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে বেক্সিমকো লিমিটেড ও বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস। এছাড়া গত ছয় মাসে পুঁজিবাজারের উত্থানেও ভূমিকা ছিল কোম্পানি দুটির শেয়ারের। তাছাড়া বিএটিবিসি, গ্রামীণফোন, রেনাটা, ব্র্যাক ব্যাংক ও অলিম্পিকের শেয়ারও এ সময়ে সূচকের উত্থানে কম-বেশি ভূমিকা রেখেছে। পুঁজিবাজারে গতিশীলতা ফিরে আসায় বিনিয়োগকারীরা আবারো সক্রিয় হয়ে উঠতে শুরু করেছেন। গত তিন মাসে পুঁজিবাজারে নতুন করে যুক্ত হয়েছেন ২ লাখ ৫৬ হাজার ৮৬৭ জন বিনিয়োগকারী।

বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিএসইসির নতুন কমিশন নেতৃত্বে আসার পর পুঁজিবাজার ও বিনিয়োগকারীবান্ধব বেশকিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পাশাপাশি অনিয়মের বিরুদ্ধেও কঠোর ভূমিকায় দেখা গেছে বিএসইসিকে। এতে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বাজার নিয়ে আস্থা তৈরি হয়েছে। করোনা অতিমারীর প্রভাব মোকাবেলায় সরকারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত সোয়া লাখ কোটি টাকার প্রণোদনা দেয়া হয়েছে, যার সুবিধা পেয়েছে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলো। বর্তমানে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবেলার জন্য আর্থিক প্রণোদনার পরিকল্পনা তৈরি করতে অর্থ মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। ফলে সামনের দিনগুলোতেও কভিডের বৈরী পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য প্রয়োজনীয় তহবিল জোগান পাবে কোম্পানিগুলো। পুঁজিবাজারের উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে ব্যাংকের বিনিয়োগ বৃদ্ধিসহ একগুচ্ছ কার্যক্রম বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে বিএসইসি।

এদিকে করোনার কারণে সারা বিশ্বেই অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দা চলছে। কমে গেছে ব্যাংকের সুদহার। এতে স্বাভাবিকভাবেই বেশি রিটার্নের আশায় পুঁজিবাজারের দিকে ঝুঁকছেন বিনিয়োগকারীরা। বিশ্বের প্রধান পুঁজিবাজারগুলোতে কভিডের সময়েও ঊর্ধ্বমুখিতা দেখা গেছে। ব্যতিক্রম ছিল না দেশের পুঁজিবাজারও। বর্তমানে দেশে ব্যাংকঋণের সুদহার ৬ শতাংশে নেমে এসেছে। ব্যাংক সুদেরও আরো কম রিটার্ন আসছে ট্রেজারি বিল ও বন্ডের। এতে তুলনামূলক বেশি রিটার্নের জন্য পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারীদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, এ বছরের তৃতীয় প্রান্তিক শেষে বিশ্বে সবচেয়ে বেশি ২৪ দশমিক ৪ শতাংশ রিটার্ন এসেছে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে।

করোনার মধ্যেও পুঁজিবাজারের উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতায় সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছে কমিশন। দেশের পুঁজিবাজারের সাম্প্রতিক ঊর্ধ্বমুখিতা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার বিষয়ে জানতে চাইলে বিএসইসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল- ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, আস্থা, নির্ভরতা, সুশাসন, পরিবেশ ও রিটার্ন এসব কারণেই পুঁজিবাজারে গতিশীলতা দেখা যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় আমরা আগামীর পুঁজিবাজার বিনির্মাণে কাজ করে যাচ্ছি। তিনি আমাদের শক্তির মূল উৎস। বর্তমানে দেশের পুঁজিবাজারের মূলধন ৪ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে তুলনা করলে এটি কমপক্ষে ১৫ লাখ কোটি টাকা হওয়ার কথা ছিল। আমাদের পুঁজিবাজারের সম্ভাবনা প্রচুর। এজন্য আমরা সবার আগে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছি। প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়লে তখন আমরা বন্ড, ট্রেজারি বিল, সুকুকের মতো নতুন পণ্য চালু করতে পারব। তাছাড়া তখন বাজারের বাড়তি লেনদেনের চাপ সামলানোর সক্ষমতাও তৈরি হবে। সৌজন্যে: বণিক বার্তা

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading