অস্থিরতা ও ভারসাম্যহীন সমাজ

অস্থিরতা ও ভারসাম্যহীন সমাজ

উপসম্পাদকীয় | উত্তরদক্ষিণ
মুদ্রিত সংস্করণ: সোমবার, ১১ জানুয়ারি, ২০২১ | আপডেট: ০০:০১

রওশন আরা :: বৈশ্বিক উষ্ণতার পাশাপাশি বৃদ্ধি পাচ্ছে মানুষের মনের অস্থিরতাও। মানুষের ধৈর্য্য ও সহ্যশক্তি কমে যাচ্ছে। বৈষম্য, অসম প্রতিযোগিতা, বস্তুবাদী মনোভাব, নীতিহীনতা অস্থিরতাকে দিন দিন উস্কে দিচ্ছে। বিপদে-আপদে মানুষের অস্থির হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু অস্থিরতা যখন প্রকট আকারে ধারণ করে তখন তা রোগে পরিণত হয়ে সমাজকেও সংক্রমিত করে।

আমেরিকান ম্যাগাজিন ফরেইন অ্যাফেয়াসের্র বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, মেট্রো ভাড়ার হার ৪ শতাংশ বৃদ্ধির প্রতিক্রিয়াতে চিলি উত্তাল হয়ে উঠলেও তা মৌলিক কারণ নয়। কারণ, সেখানকার সাধারণ মানুষ অনেক আগে থেকেই অর্থনৈতিক অসাম্যের কারণে ক্ষোভে ফুঁসছিল। বিশেষজ্ঞরা বলেন, এটি ব্যর্থ ও অকার্যকর পুঁজিবাদী অর্থনীতির বিপরীতে সাধারণ মানুষের বিস্ফোরণ।

বর্তমান মুক্তবাজার শুধু পণ্যকেই অবারিত করেনি, সমস্যা ও সম্ভাবনাকেও অবারিত করেছে। সেহেতু বিদ্যমান ব্যবস্থায় কোনো একটি দেশ বা অঞ্চলের পক্ষে বাকি বিশ্বের সংকটের ছোঁয়া বাঁচিয়ে চলা সম্ভব নয়। ফলে একচেটিয়াপনা, কর্তৃত্ব, দুর্নীতি ইত্যাদি সমস্যারও এক ধরনের বিশ্বায়ন হয়। তাই বর্তমান বিশ্বকাঠামোয় অর্থনীতির শক্তি বিচারে বিভিন্ন দেশ আলাদা কাতারে থাকলেও অসাম্য বিবেচনায় সবাই একই কেন্দ্রের সঙ্গেই যুক্ত। তাই এক দেশে শুরু হওয়া গণ-আন্দোলন অন্য দেশগুলোতেও সঞ্চারিত হচ্ছে।

সমাজ যখন সুযোগ সৃষ্টিতে বৈষম্য তৈরী করে, তখন মানুষের মন অস্থির হয়। এক দল শোষিত হয়, অপর পক্ষে কেউ প্রশাসন বা শক্তিধর কারোর আনূকুল্য নিয়ে তরতর করে উপরওয়ালা বনে যায়।

মামা , চাচার জোরে অযোগ্যরা যখন এগিয়ে যায় এবং যোগ্য মানুষেরা পিছিয়ে পড়ে, তখন সমাজে অস্থিরতা তৈরী হয়। দুর্নীতি ও অনিয়মের মাধ্যমে এক শ্রেণির মানুষ আঙ্গুল ফুলে কলা গাছ হয়, অপর পক্ষ নিয়ম নীতির মধ্যে থেকে আপ্রাণ চেষ্টা করেও কাঙি্ক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পাড়েনা। এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় সমাজে নানামুখী অস্থিরতার সৃষ্টি হয়।

বাজারে পণ্যের অতিমাত্রায় নিয়ন্ত্রণ হীনতাও সমাজে অস্থিরতা বাড়ায়। এককভাবে কোন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান যদি অপ্রতিরোধ্য ক্ষমতা ও শক্তির ধারক হয়, তবে সমাজে অস্থিরতা তৈরী হবেই। সে তখন অন্যদের হেয়জ্ঞান করে। এতে অপর পক্ষ নিজেকে নিতান্ত অপাংতেও ভেবে প্রতিরোধহীন ও দুর্বল হয়ে পড়ে। এভাবে তার মধ্যে অস্থিরতা তৈরী হয়। সমাজ যখন কোন পক্ষকে উপায়হীনতার দিকে ঠেলে দেয়,তখন সমাজও ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ে।

মানুষের মধ্যে অস্থিরতা বিরাজ করার অন্যতম আরেকটি কারণ হচ্ছে বেকারত্ব। অতি দারিদ্র্যতা যেমন মান্যষকে অস্থির করে,অধিক প্রাচুর্য আরো প্রাপ্তির নেশা সৃষ্টি করে অস্থিরতা বাড়িয়ে দেয়। মাত্রাগত পার্থক্য থাকলেও এই দুই অবস্থাই সামাজিক বিপত্তি এবং অনেক সময় সমাজকে ধ্বংস করার জন্য সমান নেতিবাচক ভূমিকা রাখে।

সমাজের বিভিন্ন পরিবেশ ও পরিস্থিতিও অস্থিরতার জন্য দায়ী। সামান্য বিষয় নিয়ে যাত্রীর সাথে চালকের সহকারী অথবা এক যাত্রীর সাথে অন্য যাত্রীর কথা কাটাকাটি, রাস্তায় রিক্সা ও সিএনজি চালকের সঙ্গে যাত্রী, দোকানীর সঙ্গে ক্রেতার সামান্য কারণে প্রায়ই ঝগড়া দেখা যায়। এগুলোও এক ধরনের অস্থিরতা। জীবনের কোন বিরূপ স্মৃতি, রাজনৈতিক ও সামাজিক বৈপরিত্য এবং অসামঞ্জস্যতা প্রভৃতি নেতিবাচক ঘটনা অনেকের মধ্যে চাঁপা ক্ষোভ, হতাশা ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরী করে। ফলে মানুষ হয়ে উঠে খিটখিটে, অসহিষ্ণু ও অস্থির।

বিচারহীনতার সংস্কৃতি, সামাজিক অনাস্থা ও অসন্তোষ থেকে জনমনে বিশৃংখলা ও বিক্ষোভের জন্ম হয়, অসন্তোষকে উস্কে দেয়। নাগরিক সুবিধা বঞ্চিত সাধারণ জনগোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের ক্ষোভ দূর করতে না পারলে বিক্ষোভ, অস্থিরতা থামানো অসম্ভব হয়ে পড়ে। সমাজের দায়িত্বশীল ও কর্তা ব্যক্তিদের অতিকথন,অপকথনও অস্থিরতা সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখে।

বিশ্বাস মানুষের মধ্যে উদারতা ও আশার জন্ম দেয়। নৈতিক মানুষ শুধু লোভের তাড়নায় বস্তু স্বাথের্র ক্ষুদ্র গন্ডির মধ্যে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেনা। বরং মানুষের ও সমাজের কিসে উপকার হয়, দেশের কি কল্যাণ হয় এ বিষয়গুলোকেই জীবনের লক্ষ্য বানায়।

সবার উচিত্ নিজ নিজ জায়গায় দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখা। দৃষ্টিভঙ্গি বদলালে জীবন বদলে যাবে। মনের শক্তি অনেক বড় শক্তি। নৈতিক শক্তি তার চেয়েও শক্তিশালী। ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে জনশুদ্ধির চেষ্টা করলে দেশে স্থিরতা ফিরে আসবে।

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading