বাঁহাতি জাদুকর হেডলি ভ্যারিটি, একজন হার না মানা যোদ্ধা
উত্তরদক্ষিণ: সোমবার, ১১ জানুয়ারি, ২০২১ | আপডেট: ১১:০৯
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ময়দান। মাথার ওপর ফাটছে মর্টার শেল। ইতালির সিসিলি। সময়টা ১৯৪৩ সালের ১৯ জুলাই। এক শস্যক্ষেতে আটকা পড়েছে ব্রিটিশ আর্মির গোটা এক ব্যাটালিয়ন, নাম গ্রিন হাওয়ার্ডস। তুমুল গোলাবর্ষণে আগুন লেগে গেল শস্যক্ষেত আর গাছগুলোতে। প্রতিপক্ষের কাছে একদম উন্মুক্ত ব্রিটিশ সৈন্যদের অবস্থান। কিন্তু ফার্স্ট প্লাটুনের অধিনায়ক সাহস হারালেন না। পেছনে একটা ফার্মহাউজে ছিল ব্যাটালিয়নের এক প্লাটুন সৈন্য। তাদের কভারিং ফায়ারের আদেশ দিয়ে এগিয়ে চললেন ৩৮ বছর বয়সী টগবগে অধিনায়ক। অ্যাটাকিং লাইনের একদম সামনে তিনি। একটা শেল এসে বিঁধল বুকে, মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন তিনি। প্রচণ্ড জখম হলো শরীরে। তবুও চিৎকার করে প্লাটুনের সৈন্যদের বললেন, ‘কিপ গোয়িং!’

অসম সাহসী সেই অধিনায়কের নাম হেডলি ভ্যারিটি। টানা ১২ দিন সেই জখমের সাথে লড়াই করে, মারা যান ইতালির ক্যাসের্টায় এক হাসপাতালে।
ইংলিশ ক্রিকেটের বিশাল ইতিহাসে সবচেয়ে প্রভাবশালী ও সফল বাঁহাতি স্পিনারদের একজন ভ্যারিটি। ৪০ টেস্টে নিয়েছেন ১৪৪ উইকেট। আর কাউন্টিতে ৩৭৮ ম্যাচে ১,৯৫৬ উইকেট। গড়টাও চোখ কপালে তোলার মতো ১৪.৯০! সেরা বোলিং ফিগারটা আরো চমকপ্রদ। ১৯৩২ মৌসুমে কাউন্টি চ্যাম্পিয়নশিপের ম্যাচে নটিংহ্যামকে উড়িয়ে দিয়েছিলেন একাই, এক ইনিংসেই দশ রানে দশ উইকেট নিয়েছিলেন।

অভিষেক হয়েছিল ১৯৩১ সালে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে। আট বছরের জাতীয় দলের ক্যারিয়ারে খেলেছেন চারটি অ্যাশেজ, যার মধ্যে আছে বহুল সমালোচিত বডিলাইন অ্যাশেজ সিরিজও। সেই সিরিজে চার ম্যাচে নেন ১১ উইকেট। তবে মঞ্চটা নিজের করে নিতে সময় নেন আরো এক বছর।
১৯৩৪ সালে ঘরের মাঠে ফিরতি অ্যাশেজে বাঁহাতি স্পিনে ভেলকি দেখান ভ্যারিটি। সিরিজের দ্বিতীয় টেস্ট ছিল লর্ডসে। প্রথম ইনিংসে ইংল্যান্ড করে ৪৪০। জবাবে ব্যাট করতে নেমে ভ্যারিটির ঘূর্ণিজাদুতে ২৮৪’তে আটকে যায় অস্ট্রেলিয়া। ৬১ রানে নেন সাত উইকেট, একাই ধ্বসিয়ে দেন অজিদের।
বল করতেন প্রায় মিডিয়াম পেসারের গতিতে। যে রানআপ নিতেন, তা স্পিনারদের জন্য অনেক বড়ই ছিল। উচ্চতাও ছিল ভালো, ফিটনেসও দারুণ। প্রতিটা ডেলিভারিতেই তাই পেতেন আলাদা সুবিধা। সোজা কথায় একজন আদর্শ পেসারের যে ক’টা গুণ থাকা দরকার, সবই ছিল ভ্যারিটির। অথচ তিনি করতেন বাঁহাতি স্পিন।
ভ্যারিটির বোলিংয়ের বিশেষত্ব ছিল টানা এক জায়গায় বল করতে পারার সক্ষমতা। একই লেংথে সারাদিন ক্লান্তিহীনভাবে বল করে যাওয়ার মতো জীবনীশক্তি আর ধৈর্য্য ছিল তার।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে গ্রিন হাওয়ার্ডস ব্যাটালিয়নের ক্যাপ্টেন ছিলেন ভ্যারিটি। যুদ্ধ শুরু হবার আগে তিনি যোগ দেন ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে। ছিলেন বইয়ের পোকা। ভ্যারিটির বইপ্রেম নিয়ে মজার তথ্য দিয়েছিলেন নেভিল কার্ডাস। অস্ট্রেলিয়া সফরে যাওয়ার সময় জাহাজে একই কেবিনে ছিলেন কিম বার্নেট ও ভ্যারিটি। তখন একজন আরেকজনকে ‘The Seven Pillars of Wisdom’ বইটি পড়ে শোনাচ্ছিলেন।
১৯৪৩ সালে ব্যাটালিয়ন নিয়ে পৌঁছান মিশরে। সেই মিশরেই জীবনের শেষ ম্যাচটা খেলেছিলেন, সেখান থেকে ইতালিতে যাওয়ার আগে।
পৃথিবীতে মাত্র ৩৮ বছর ৭০ দিনে বেঁচে ছিলেন হ্যাডলি ভ্যারিটি। ক্রিকেট মাঠে কাটিয়েছেন মাত্র দশ বছর, খুব অল্প সময়ই বলা চলে। তবুও তার কী দারুণ প্রভাব! ছোট্ট সময়, কিন্তু যে কীর্তিগুলো রেখে গেছেন, তা এখনো উজ্জ্বল।

