কৃষকের লোকসান কে ঠেকাবে?

কৃষকের লোকসান কে ঠেকাবে?

উপ-সম্পাদকীয় | উত্তরদক্ষিণ
মুদ্রিত সংস্করণ: রবিবার, ২৪ জানুয়ারি, ২০২১ | আপডেট: ০০:০১

জারিফ রহমান-

প্রাচীন ইতিহাসে পেঁয়াজ ব্যবহার করে পণ্য বিনিময়ে করা হতো। এমনকি একসময় মিশরের রাজা-বাদশাহরা পেঁয়াজের মালা ব্যবহার করতেন। বর্তমান যুগেও পেঁয়াজের বিনিময়ে প্লাস্টিক আর লোহার পুরোনো জিনিস নেওয়ার প্রচলন রয়েছে বিভিন্ন অঞ্চলে। এমনকি সর্দি-কাশিতে পেঁয়াজের ব্যবহারও লক্ষণীয়। এছাড়া খাবারে পেয়াজের ব্যবহার হয় সমগ্র বিশ্বজুড়েই। স্বাদবর্ধক হিসেবে কাঁচা পেঁয়াজের সুনামও রয়েছে। মুড়ি বা চানাচুরের সঙ্গে, কাবাব, মোসাল্লাম, ভাজা মাছ, শিঙাড়া, সমুচা, পুরি, কচুরি, পশ্চিমাদের পিৎজা-বার্গার, বাঙালির ভাজি-ভর্তাতেই পেঁয়াজেই যেন মুখ্য উপাদান। তাহলে নিঃসন্দেহে বলা যায় মানুষের খাদ্যাভাসে পেঁয়াজ জিনিসটাই একরকম অত্যাবশ্যকীয়। আর বাঙালির ক্ষেত্রে তো কথাই নয়। খাবারে পেঁয়াজের ঝাঁঝ না থাকলে যেন ‘স্বাদই তেতো’। কমবেশি ধনী-দরিদ্র সবার রান্নায় পেঁয়াজ চাই।

এক পরিসংখ্যানে জানা যায়, বাংলাদেশের বছরে পেঁয়াজের চাহিদা প্রায় ২২ থেকে ২৪ লাখ টন। দেশীয়ভাবে উৎপাদন হয় ১৬ থেকে ১৭ লাখ টন। পেঁয়াজ সঠিকভাবে সংরক্ষণের অভাবে চার ভাগের এক ভাগ নষ্ট হয়ে যায়। ফলে প্রতি বছরই পেঁয়াজের ঘাটতি থেকে যায়।

দেশে পেঁয়াজের এ ঘাটতি মেটাতে বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করা হয়। তবে প্রতিবেশী ইন্ডিয়ার উপরই সবচেয়ে বেশি নির্ভরশীল থাকা হয়। একসময় বাংলাদেশে পেঁয়াজ বলতে ইন্ডিয়ান পেঁয়াজ আর দেশি পেঁয়াজ ছিল। আর ইন্ডিয়া পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে দিলে তো কথাই নেই বিধিবাম। দেশের বাজারে পেঁয়াজ যেন স্বর্ণে পরিণত হয়। যার বড় প্রমাণ পাওয়া গেছে ২০১৯ সালে। ৩০ টাকার পেঁয়াজের দাম উঠেছিল ৩০০ টাকায়। যা অধিকাংশ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে ছিল। মানুষ এক প্রকার বাধ্য হয়েই খাবারে পেঁয়াজের পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছিল।

২০১৯ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর ইন্ডিয়া পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধের ঘোষণা দেয়। হঠাৎ করেই ইন্ডিয়ার সরকারের এমন সিদ্ধান্তে বাংলাদেশ সরকারও কিছুটা হতভম্ব হয়ে যায়। ভালোই বিপাকে পড়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। পরিস্থিতি জটিল রুপ নেয়। বিকল্প খোঁজার সময়ও কম। তখন মিয়ানমার থেকে, চীন থেকে, তুরস্ক থেকে, পাকিস্তান থেকে পেঁয়াজ আমদানির নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়।

তবে পেঁয়াজের দাম এমন আকাশচুম্বীর পেছনে শুধু ভারতকে দায়ী করলে চলবে না। এখানে কিছু অতি মুনাফালোভি ব্যবসায়ীদের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। এই দেশে পুঁজি কেবল গড়ে উঠছে। মুনাফা দেখলে আমরা হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়ি। আমাদের পুঁজির চরিত্র এখনো লুটেরা চরিত্রই রয়ে গেছে।

এদিকে সারাদেশে পেঁয়াজ সংকটের সময় পেঁয়াজ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার পরিকল্পনার কথা বলেছিল সরকারও। একাধিকবার কৃষককে সুরক্ষা দেওয়ার কথা বলেছিলেন স্বয়ং বাণিজ্যমন্ত্রীও। সেসময় সরকারের আহ্বানে সাড়া দিয়ে জাতির প্রয়োজনে এবং লাভের আশায় বেশি জমিতে পেঁয়াজ লাগিয়েছিলেন কৃষকেরা। যার ফলও পাওয়া গেছে। চলছে ভরা মৌসুম। দেশে উৎপাদিত পেঁয়াজেই অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণ হবে বলে দাবি করছেন কৃষকরা। কিন্তু এমন অবস্থার মধ্যেও বাধ সাধল আরেক জায়গায়। সাড়ে তিন মাস বন্ধ থাকার পর ২০২১ সালের শুরুতেই আবার পেঁয়াজ রপ্তানি শুরু করেছে ইন্ডিয়া। ২ জানুয়ারি বিকাল থেকে দেশের দুই স্থলবন্দর দিনাজপুরের হিলি ও সাতক্ষীরার ভোমরা দিয়ে শত শত টন পেঁয়াজ ঢুকছে। এর ফলে দেশের বাজারে পড়ে গেছে পেয়াজের দাম। যার ফলে লোকসানে পড়েছেন দেশি কৃষকরা। পাইকারি প্রতি কেজিতে ১০ থেকে ১৫ টাকা লোকসান গুণতে হচ্ছে কৃষকদের। ইন্ডিয়া থেকে পেঁয়াজ আমদানি বন্ধের দাবিও জানাচ্ছেন কৃষকেরা।

তবে স্বস্তির বিষয় এই যে, বাজারে দেশি পেঁয়াজের চাহিদা বেশি, দামও কম। তাই ইন্ডিয়ান পেঁয়াজ আমদানি করে স্বস্তিতে নেই ব্যবসায়ীরাও। আর তুলনামূলক বেশি দাম হওয়ায় মানুষ ভারতীয় পেঁয়াজ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।

আমি মনে করি, বর্তমান বাজারে পেঁয়াজের ঘাটতি নেই, দামও সহনীয়। সুতরাং ইন্ডিয়ান পেঁয়াজের সরবরাহ বাড়িয়ে চাষিদের বিপদে ফেলা যাবে না। চলতি অর্থবছরের শুরুতেই ৫ শতাংশ শুল্কের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল সরকার। মার্চ পর্যন্ত অপেক্ষা না করে এখনই তা কার্যকর করা হোক।

সরকারের আহ্বানে সাড়া দিয়ে যেখানে বেশি হারে পেঁয়াজ উৎপাদন করে সমগ্র জাতির প্রয়োজনে সাড়া দিয়েছিলেন কৃষকেরা। কিন্তু আজ যাদের ওপর ভরসা করে বিপদে কৃষকরা। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, তাঁরা কি কৃষকদের পেঁয়াজ উৎপাদন থেকে বিমুখ না করে ক্ষতি পূরণ করতে এগিয়ে আসবে?

mashiurjarif

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading