১৭০ বছর পর ফিরে এলো ঐতিহ্যবাহী ঢাকাই মসলিন
উপ-সম্পাদকীয়| উত্তরদক্ষিণ
মুদ্রিত সংস্করণ: রবিবার, ৩১ জানুয়ারি ২০২১ | আপডেট : ০০:০১
সালমা শিমু:: গত পৌনে দুই শ’ বছরে জাদুঘর ছাড়া এর অস্তিত্ব কোথাও পাওয়া যায়নি। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে একদল গবেষক ছয় বছর প্রচেষ্টা চালিয়ে ঢাকাই মসলিনকে ফিরিয়ে এনেছেন।
ঢাকাই মসলিন এতটাই মিহি কাপড় ছিল যে, দিয়াশলাইয়ের বাক্সের ভেতর একটি পুরো শাড়ি রাখা যেত। একটি আংটির ভেতর দিয়ে মসলিনের শাড়ি বের করা যেত। পলাশীর যুদ্ধের পর শিল্প বিপ্লবের ফলে এবং ইংরেজদের চক্রান্তে মসলিন শিল্প ধ্বংস হয়ে যায়। মসলিন যাতে বুনতে না পারে, এ জন্য ইংরেজরা কারিগরদের আঙুল কেটে দেয়ার মতো ঘটনাও ঘটায়। তখন নকশা করা মসলিনকে বলা হতো জামদানি। বর্তমানে নারীদের কাছে জামদানির খুব কদর। তবে আগের মসলিন জামদানির সাথে এর কোনো তুলনাই হয় না।
প্রকল্পের প্রধান বৈজ্ঞানিক অধ্যাপক মনজুর হোসেন জানান, তারা মসলিনের ছয়টি শাড়ি তৈরি করেছেন। এর একটি প্রধানমন্ত্রীকে উপহার দিয়েছেন। কিন্তু শুরুতে এক টুকরা মসলিন কাপড় জোগাড় করতে কলকাতা থেকে লন্ডন পর্যন্ত তাদের ছুটতে হয়েছে। মসলিন বোনার সুতা ‘ফুটি কার্পাস’ তুলার গাছ থেকে তৈরি হয়। সেই গাছও খুঁজে বের করতে হয়েছে। মসলিনের জিআই বা স্বত্বের ভৌগোলিক সূচকের অনুমোদন পাওয়া গেছে গত ২৮ ডিসেম্বর। ঢাকাই মসলিনের শেষ প্রদর্শনী হয়েছিল ১৮৫১ সালে লন্ডনে। এর ১৭০ বছর পর বাংলাদেশে আবার বোনা হলো ঐতিহ্যের ঢাকাই মসলিন শাড়ি।
মুঘল আমলে ঢাকাই মসলিনের খ্যাতি পৃথিবীময় ছড়িয়ে পড়েছিল। সেই মসলিন বিশ্বের বড় বড় মিউজিয়ামে এখনো সংরক্ষিত আছে।
ইতিহাসে আছে, মুঘল আমলে তৈরি করা ঢাকাই মসলিন ঘাসের ওপর রাখলে এবং তার ওপর শিশির পড়লে কাপড় দেখাই যেত না। কয়েক গজ মসলিন কাপড় ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দেয়া যেত বলে জনসাধারণ একে ‘হাওয়ার কাপড়’ বলতো। এমনকি একটি আংটির ভেতর দিয়ে এক থান কাপড় অনায়াসে টেনে বের করা যেত।
‘ফুটি কার্পাস’ নামক তুলা থেকে প্রস্তুত অতি চিকন সুতা দিয়ে মসলিন তৈরি করা হতো। চরকা দিয়ে কাটা, হাতে বোনা মসলিনের জন্য ৩০০ কাউন্টের সুতা ব্যবহার করা হতো। ফলে মসলিন হতো কাচের মতো স্বচ্ছ। এই মসলিন রাজকীয় পোশাক তৈরিতে ব্যবহার করা হতো। মসলিন প্রায় ২৮ রকম হতো যার মধ্যে জামদানি এখনো ব্যাপকভাবে প্রচলিত।
মসলিন বোনার জন্য অতি সূক্ষ্ম সুতা তৈরি করতে পারত কুমারী মেয়েরা। ভোরের সূর্য ওঠার আগেই সুতা কাটার কাজ তারা শেষ করত। দিয়াশলাইয়ের বাক্সে ওই সূক্ষ্ম মসলিন রাখা যেত। তখন তাঁতে নকশা করা মসলিনকে ‘জামদানি’ বলা হতো।
এ সম্পর্কে আরো জানা যায়, এক পাউন্ড মসলিন সুতা দৈর্ঘ্যে হতো ২৫০ মাইল। সম্রাট আকবর বাংলায় নিযুক্ত সুবাদারের সাথে এ বন্দোবস্ত করেন যে, দিল্লির দরবারে যত টাকার মসলিন দরকার হবে, তা জোগাতে হবে। মুঘল সম্রাজ্ঞী নূরজাহান মসলিনের অতি অনুরাগী ছিলেন। নূরজাহান যে মসলিন ব্যবহার করতেন, তার নাম ছিল ‘মলবুস খাস’। রোমে প্রাচীন সমৃদ্ধির দিনে সেখানকার নারীদের প্রিয় বিলাসসামগ্রী ছিল এই মসলিন। মিসরের মমি আবৃত হতো মসলিনে।
এশিয়া ছাড়াও ইউরোপের বিভিন্ন ব্যবসা কেন্দ্র-লন্ডন, প্যারিস ও আমস্টারডামে মসলিন একচেটিয়া অধিকার বিস্তারে সমর্থ হয়। এমনকি আরব বণিকদের মারফত উত্তর আফ্রিকাতেও তা প্রভাব বিস্তার করে। ১৮৫১ সালে লন্ডনের বিশাল প্রদর্শনীতে ঢাকাই মসলিন বিশেষ প্রাধান্য পেয়েছিল।
জেমস টেলরের লেখায় জানা যায়, ১৭৮৭ সালে ঢাকা থেকে যে পরিমাণ মসলিন ইংল্যান্ডে রফতানি করা হয়েছিল, তার মূল্য ছিল ৩০ লাখ টাকা। ১৮১৭ সালে এই রফতানি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।
প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ অধ্যাপক আবদুল করিমের লেখা থেকে জানা যায়, ব্রহ্মপুত্র নদের তীরবর্তী কোনো কোনো এলাকায় ‘ফুটি’ নামে এক প্রকার তুলা জন্মাত। এর সুতা থেকে তৈরি হতো সবচেয়ে সূক্ষ্ম মসলিন বস্ত্র। এ সুতিবস্ত্রই বিশ্বব্যাপী ‘ঢাকাই মসলিন’ নামে খ্যাত ছিল। বৃহত্তর ঢাকা জেলার প্রায় সব গ্রামেই তাঁতশিল্প ছিল।
ঐতিহ্যবাহী এই সম্পদ পুণরায় ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজন যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা। সরকার যদি উদ্যোগ নেয় এবং পর্যাপ্ত বিনিয়োগ করে তাহলে মসলিন হয়তো আবারো ফিরে আসবে তার পুরোনো ঐশ্বর্য নিয়ে।

